গর্ভধারিণীর ২৮ গুলিতে রাজাকার ছেলের বুক ঝাঁঝরা

প্রকাশিত: ১১:১৩ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১, ২০১৯

দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ এর আজকের এই দিনে উদিত হয়েছিলো স্বাধীনতার বিজয় সূর্য। একাত্তরের ১৬ ই ডিসেম্বরে রণক্লান্ত পাকি হায়েনার দল আত্মসমর্পণ করে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব স্বীকার করে নেয়।

পৃথিবীর মানচিত্রে লাল-সবুজের পতাকা হাতে স্ব-গৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ নামক এক ভুখন্ড। স্বাধীন বাংলাদেশের অলিতে গলিতে আজো হাতড়ে বেড়ায় বীর সেনাদের আত্মত্যাগের স্মৃতি।

যার কিছু হারিয়ে গেছে, কিছু হারিয়ে ফেলেছি। কিছু আবার হারানো হয়েছে। হারানো বা চেপে যাওয়া ইতিহাসের এমন একটি অধ্যায়ের গল্প শুনবো যা সত্যিই বিস্ময়কর।

বিস্ময়কর সেই গল্পের রুপকার একজন মাওলানা। যিনি ছিলেন একাত্তরের সম্মুখ সমরের একজন বীর সেনানী। ছিলেন একজন সেকশন কমান্ডার। তিনি ছিলেন মুক্তি ফৌজের ৫০৩১০ নস্বর সদস্য।

কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরীরর মাওলানা শামসুল হুদা রচনা করেছেন এমনই এক বিস্ময়কর গল্প যা শুনলে গা শিউরে উঠে। কমান্ডার মাওলানার বিস্ময়কর গল্পটি যখন লিখছিলাম চোখ দুটো ছলছল করে উঠছিলো। কল্পনা করতেও গা শিউরে উঠছিলো।

কতোটা ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। পেয়েছি রক্তাক্ত পতাক। প্রতিটি রক্তের বিন্দু কণায় এমনই কতো হাজারো অজানা গল্পইনা লুকিয়ে আছে। এমন এক একটা গল্প এক একটা পৃথিবী সৃষ্টির সমান।

মাওলানা শামসুল হুদা ৭১-এর এপ্রিলে ট্রেনিং ক্যাম্পে নাম লেখান। বয়স তখন ২০। ৬৮’ সালে সাত দরগাহ মাদরাসা থেকে আলিম পাস করেছিলেন। ট্রেনিং শেষে প্রথম ডিফেন্স তৈরি করেন সীমান্তবর্তী ফুলকুমার নদীর তীরে। এদিকে কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে ধরিয়ে দিতে পারলে ১০ হাজার টাকার পুরস্কারের ঘোষণা দেয় শান্তিবাহীনি প্রধান আতাউল্লাহ।

ডিফেন্স থেকে ফেরার পথে ধরে পড়ে যান মাওলানা হুদা। সঙ্গে ছিলো ১০/১২ বছরের এক শিশু। একটি বাড়িতে আটকে রাখা হয় তাকে। শিশুটি গিয়ে খবর দেয় মুক্তিযোদ্ধাদের। খবর পেয়ে সঙ্গীরা এসে মুক্ত করে মাওলানা শামসুল হুদাকে। পাহাড়াদার বাড়ির মালিকের এক কানে ১৮টি গুলি করে ১০ হাজার টাকার স্বাদ মিটিয়ে দেন মাওলানা হুদা। এরপর এই মাওলানাই কমান্ডার হয়ে সৃষ্টি করেন বিস্ময়কর সব গল্প।

তিনি তখন সেকশন কমান্ডার। দলবল নিয়ে যুদ্ধ করছিলেন লালমনিরহাটে। গল্পের শুরুটা এখান থেকেই। দিনটি ছিলো কুরবানির ঈদের পরেরদিন। সেদিন রাতে মাওলানার কমান্ডিং বাহিনী তিস্তা ব্যারেজে আক্রমণ করে। রাত ৯টা থেকে সারা রাত সম্মুখ যুদ্ধে তিস্তা ব্যারেজ দখল করে।

ভোর না হতেই হানাদার বাহিনী ক্যাম্প গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হয়। সাথে সাথে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় লম্পট হায়েনাদের এদেশিয় দোসররা। দিনের আলো ফুটতেই সতর্কতার সাথে হুদা বাহিনী গ্রামে ঢুকে কোনো রাজাকারের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় কিনা তাই ভেবে।

চলতে চলতে তারা এসে পৌছঁলেন এলাকার শান্তি বাহিনীর চেয়ারম্যানের বাড়ি। বাড়িতে কেউ নেই। খালি বাড়িতে সাময়িক ঠিকানা নির্ধারণ করলো মাওলানা হুদার কমান্ডিং বাহিনী। ঘটনার দ্বিতীয় দিন হঠাৎ এক বুড়ি এসে হাজির। খুঁজতে লাগলেন মুক্তি সেনাদের সরদারকে। মাওলানা হুদা এগিয়ে গেলেন।

জানতে পারলেন এটা এই বুড়িরই বাড়ি। শান্তি বাহিনীর চেয়ারম্যান এই বুড়িরই বখে যাওয়া এক সন্তান। বুড়ি মা বলতে লাগলেন তার অন্য সন্তানদের ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছেন কিন্তু এই ছেলেকে পারেননি। সে এলাকার শান্তি বাহিনীর চেয়ারম্যান। বুড়ির আবেদন তাকে যেন খুঁজেন বের করে হত্যা করা হয়। তাকে হত্যা করলে বুড়ির কোনে আফসোস থাকবে না।

যেন কোনো সিনেমার গল্প। খুঁজতে হলো না তাকে। নিজেই যমের ঘরে এসে হাজির। হঠাৎ একটি গুলির শব্দে শামসুল হুদা সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিলেন। অপেক্ষার পালা শেষে বুড়ি মা’র অভিশপ্ত সন্তান বাড়িতে প্রবেশ করে। অমনিই তাকে জাপটে ধরে হাত পা বেঁধে ফেলা হলো। বাঁধা হলো বারান্দার একটি খুঁটির সাথে।

গর্ভধারিণী মা ছেলের মৃত্যু দেখার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। কিছুটা দূরে একটি এলএমজি সেট করা হলো যার ভেতরে ছিলো ২৮টি গুলি। সবগুলো গুলি দিয়ে ঝাঁঝরা করে দিতে চাইলেন মাওলানা শামসুল হুদা। কিন্তু না! সবাইকে অবাক বুড়ি এসে সামনে দাঁড়ালেন। বললেন, নিজ হাতে মারবেন ছেলেকে। বিস্ময়ভরা নয়নে সবাই তাকিয়ে আছে। কি বলছেন আপনি? পারবেন না আপনি। নিজের সন্তানের বুকে গুলি চালাতে পারবেন না। এতটা সাহস আপনার হবে না।

বুড়ি তাতে থমকে যাওয়ার পাত্র নন। নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইলেন ক্ষুব্ধ বুড়ি। মাওলানা হুদা বুড়িকে দেখিয়ে দিলেন কিভাবে ট্রিগার চালাতে হবে। ততক্ষণে বাকরুদ্ধ হয়েছে অভিশপ্ত পাপিষ্ঠ সন্তান। যে কিনা আপন মায়ের হাতে মৃত্যুবরণ করতে চলেছে। ট্রিগার চেপে ধরলেন মা। একে একে ২৮টি গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেলো নরাধমের পাপে বোঝাই বুক।

কতোটা ক্ষুব্ধ হলে মা তার সন্তানের বুকে এভাবে ক্রোধের সাথে স্ব-জ্ঞানে এতোগুলো গুলি চালাতে পারে তা ভাবতেই উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের দু’গাল ভিজে গেছে। কেন এতোটা ক্ষুব্ধ এই জননী তা জানতে বেশি সময় লাগেনি। ওই এলাকাতেই এমন একটি বাড়ি পাওয়া গেলো যেখানে অনাহারে নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়ে বস্ত্রহীনা ১০ নারী কেউ অজ্ঞান কেউ স্বজ্ঞান; নির্জীব হয়ে পড়ে আছে। এদেরকে এই শান্তিবাহিনীর চেয়ারম্যানের নেতৃত্বেই এখানে আনা হয়েছিলো।

এই নারীদের শরীরের এমন কোনো অংশ নেই যা পাষণ্ড হায়েনাগুলোর হিংস্র আঁচর থেকে রেহাই পেয়েছে। পাশবিকতার চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে হানাদারবাহিনী। এমন নৃশংসতা নিজের চোখে দেখে সহ্য করতে পারেননি জন্মধাত্রী ‘মা’।

এমন বিস্ময়কর গল্পের রুপকার মাওলানা শামসুল হুদার বয়ানে জানা যায় আরো এক বিস্ময়কর গল্প। ভুরঙ্গামারী বাজারের প্রিন্সিপাল কমরুদ্দিন রাজাকার ঘটিয়েছে এক হৃদয় বিদারক দুঃসহ স্মৃতির গল্প। তার নির্দেশে ৪০ জন যুবককে সোজা লাইনে দাঁড় করিয়ে একে একে গুলি করে হত্যা করার হয় ৩৯ জন যুবক।

চোখের সামনে এমন নৃশংস খুনের মহড়া দেখে লাইনের ৪০ তম যুবক জ্ঞান হারিয়ে ফেলায় তখন আর তাকে হত্যা করা হয়নি। পরবর্তীতে মরে যাওয়ার ভান করে এক রাতে ফিরে আসে প্রাণ নিয়ে সেই যুবক।

না জানি মাওলানা শামসুল হুদার মতো এরকম হাজারো গল্পের ফুলঝুড়ি নিয়ে এখনো বেঁচে আছেন আরো কতজন বীর যোদ্ধা মাওলানা। যাদের ইতিহাস চাপা পড়ে আছে অদৃশ্য কালো পাতার আড়ালে। আমরা স্মরণীয় করে রাখতে চাই জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর যোদ্ধাদের। শ্রদ্ধা করতে চাই হাজার বছর। বেঁচে থাকুক এরা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণালি অধ্যায়ে।

(তথ্যসূত্র: শাকের হোসাইন শিবলি রচিত ‘আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে’, উইকিপিয়া)।

বি.দ্র: বিজয়ের মাসজুড়ে প্রতি দুইদিনে ‘৭১ এর মাওলানা’ সিরিজের একটি করে নতুন নতুন প্রবন্ধ প্রকাশিত হবে পাবলিক ভয়েসে। যার প্রতিটিতে থাকবে কোনো না কোনো এক আলেম মুক্তিযোদ্ধার গল্প।

শাহনূর শাহীন
কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
যুগ্ম সম্পাদক, পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন