ফিরে দেখা স্পেনের মুসলিম শাসন

প্রকাশিত: ৭:৩৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১, ২০১৯

৭১১ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের মাটিতে পা রাখে মুসলিম বাহিনী। মুসলিম সেনাপতি তারিক ইবনে জিয়াদের নেতৃত্বে স্পেনের অত্যাচারী রাজা রডারিককে পরাজিত করে তারা ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করে। মুসলিম আগমনের এক দশকের মধ্যে আইবেরীয় উপদ্বীপের (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) বেশির ভাগ ভূখণ্ডই মুসলিম শাসনাধীন হয়। এরপর ৭০০ বছরের বেশি সময় মুসলমানরা তা শাসন করে।

উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদের নির্দেশ মোতাবেক উত্তর আফ্রিকান কমান্ডের অধিনায়ক মুসা বিন নুসাইর সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদকে স্পেন অভিযানের দায়িত্ব দেন। অভিযানের দায়িত্ব লাভের পর তিনি মহানবী (সা.)-কে স্বপ্ন দেখেন। ঐতিহাসিক ইবনে বাশকাওয়ালের বর্ণনায়, ‘তিনি দেখলেন, আনসার ও মুহাজির সাহাবিগণ রাসুল (সা.)-এর চারপাশে বসে আছেন। তাঁদের গলায় কোষবদ্ধ তলোয়ার আর কাঁধে ঝুলন্ত ধনুক। আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁকে বললেন, হে তারিক! তুমি তোমার কাজে এগিয়ে চলো। অতঃপর তিনি নিজেকে ও তাঁর সঙ্গীদের স্পেনে প্রবেশ করতে দেখলেন।’ (ড. মুহাম্মদ ফরিদুদ্দিন ফারুক, স্পেনে মুসলিম ইতিহাস ও কীর্তি, পৃষ্ঠা. ২৫)

৭১১ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে মরক্কো থেকে জাহাজে জিব্রাল্টার প্রণালি পার হন এবং জাবালে তারিকের পাদদেশে নোঙর করেন। সেখান থেকে তিনি স্পেনের মূল ভূখণ্ডের দিকে অগ্রসর হন। স্পেনের কাদেজ শহরের লাজান্দ্রা উপত্যকার সিনেদিয়া নামক প্রান্তরে রাজা রডারিকের বাহিনীর সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয় মুসলিম বাহিনীর। যুদ্ধের প্রাক্কালে সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ রণোদীপ্ত ভাষণ দেন। যার শুরু হয়েছিল এভাবে, ‘হে আমার সহযোদ্ধারা! কোথায় পালাবে? তোমাদের পেছনে বিশাল সমুদ্র আর সামনে শত্রুদল। ধৈর্যসহ সত্যের লড়াই করা ছাড়া তোমাদের আর কোনো পথ খোলা নেই।’ (আবুল আব্বাস আহমদ আল-মাক্কারি, আল-মুনজিদ ফিল আলম, পৃষ্ঠা. ২৬১)

স্বপ্নে প্রাপ্ত রাসুল (সা.)-এর সুসংবাদ ও সেনাপতির ভাষণ মুসলিম বাহিনীকে দারুণভাবে উদ্দীপ্ত করে। এই যুদ্ধে সাত হাজার, মতান্তরে ১২ হাজারের মুসলিম বাহিনীর বিপরীতে লক্ষাধিক বাহিনীর নেতৃত্ব দেন রডারিক। সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বিজয় নিশ্চিত হলে রডারিক পালিয়ে যাওয়ার সময় নৌকাডুবিতে মারা যান। (ড. আহমাদ হায়কাল, আল-আদবুল আন্দালুসি মিনাল ফাতহি ইলা সুকুতিল খিলাফাহ, পৃষ্ঠা. ২৬)

মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর নবম শতকে আন্দালুস হয়ে ওঠে ইউরোপের সবচেয়ে অগ্রসর অঞ্চল। মুসলিম স্পেনের রাজধানী কর্ডোভা ছিল মুসলিম বিশ্ব ও ইউরোপের জ্ঞানপিপাসুদের তীর্থস্থান।

মুসলিম স্পেন অনগ্রসর ইউরোপে সভ্যতার আলো পৌঁছে দেয়। ইউরোপের ভাষা-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সমাজ ও রাজনীতিকে মুসলিমরা নানাভাবে প্রভাবিত করে। ঐতিহাসিক পি কে হিট্টি বলেন, ‘মুসলিম স্পেন মধ্যযুগীয় ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলো লিখেছে।’ (ড. মুহাম্মদ ফরিদুদ্দিন ফারুক, স্পেনে মুসলিম ইতিহাস ও কীর্তি, পৃষ্ঠা. ৩১৩)

স্পেনে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর সেখানে সাহাবি ও তাবেয়িদের একটি দল আগমন করেন। তাঁদের হাতেই স্পেনে ইসলামী জ্ঞানের চর্চা শুরু হয়। আরবি ভাষা-সাহিত্য ও ধর্মীয় জ্ঞানের মাধ্যমে তার যাত্রা শুরু হলেও ক্রমেই তার পরিধি বিস্তৃত হয়। আধুনিক দর্শন, ভূগোল, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, উদ্ভিদ ও প্রাণিবিজ্ঞান, রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে মুসলিমরা। স্পেনের মুসলিম পণ্ডিতদের ভেতর ইবনে বাজ্জাহ, ইবনে রুশদ ও ইবনে তোফায়েল দর্শনশাস্ত্রে; ইবনুল খাতির ও ইবনে খালদুন ইতিহাসশাস্ত্রে; আল বাকরি, আল মাজিনি ও ইবনে জোবায়ের ভূগোলশাস্ত্রে; ইবনে মায়মুন, গারিব ইবনে সাঈদ ও ইবনে আব্বাস জাহরাভি চিকিৎসাশাস্ত্রে; আব্বাস ইবনে ফিরনাস ও জাবির রসায়নশাস্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

মুসলিম জাতির উন্নত সভ্যতা শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞান নয়; বরং সমগ্র ইউরোপের জীবনব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। রেইনোল্ড এ নিকেলসন বলেন, ‘এটি স্পষ্ট যে স্প্যানিশ খ্রিস্টানদের কাছে ইসলামী সংস্কৃতির প্রচণ্ড আকর্ষণ ছিল। যার প্রমাণ ইউরোপীয় সমাজে প্রচলিত ভাষাগুলোতে এখনো পাওয়া যায়।’ (এ লিটারারি হিস্টোরি অব আরবস, পৃষ্ঠা. ৪১৫)

আরববিশ্বের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ আব্বাস মাহমুদ আক্কাদের মতে, স্পেনের মুসলিম শাসন ইউরোপের গতিধারায় পরিবর্তন করে দেয়। তিনি বলেন, ‘সুস্পষ্টভাবে এ কথা বলা যায় যে গির্জা থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে ইসলামী সভ্যতার বিশাল প্রভাব ছিল।’ (আসরুল আরব ফি হাদারাতিল উরুবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা. ৮৯)

১০৩১ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া শাসনের পতন হলে আল-আন্দালুস অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো তাইফা নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু রাজ্যগুলো দুর্বল এবং একতাবদ্ধ না থাকার কারণে ধীরে ধীরে উত্তরের খ্রিস্টান রাজ্যগুলোর আগ্রাসনের শিকার হতে থাকে। পরবর্তী ২০০ বছরের মধ্যে খ্রিস্টান আগ্রাসনে একে একে এই রাজ্যগুলোর পতন ঘটে। ১২৪০ সালের মধ্যে দক্ষিণের একমাত্র গ্রানাডা ছাড়া বাকি সব রাজ্য মুসলিমদের হাতছাড়া হয়ে যায়। ১৪৯১ সালের শেষে গ্রানাডা ফার্ডিন্যান্ড ও ইসাবেলার সম্মিলিত বাহিনীর অবরোধের শিকার হয়। ১৪৯১ সালের নভেম্বরে মুহাম্মদ গ্রানাডার শাসন খ্রিস্টান অধিকারে প্রদানের চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি, স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুসারে স্পেনীয় সেনাবাহিনী শহরে প্রবেশ করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিম আন্দালুস রাষ্ট্রের পতন হয়। (ড. মুহাম্মদ ফরিদুদ্দিন ফারুক, স্পেনে মুসলিম ইতিহাস ও কীর্তি, পৃষ্ঠা. ১৬২)

এমএম/

মন্তব্য করুন