আজও মনে পড়ে মক্তবের সেই স্মৃতি

প্রকাশিত: ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৫, ২০১৯

রাকিবুল ইসলাম

১. শৈশবে মক্তব থেকে পড়ালেখার হাতেখড়ি। প্রতিদিন সাত সকালে পাখির গুঞ্জরণ। ফজরের পর মসজিদে যাওয়া। আম্মুর ভয়ে মক্তবে না গিয়ে কোনও উপায় ছিল না।  আমি তখন লালসেপাড়া পড়তাম। হুজুর প্রতিদিন আমাদের সুরা মুখস্ত করাতেন।

কুরআন শিক্ষার মাধ্যমে শুরু হতো আমাদের দিন। সেপাড়া আর চক-স্লে বুকে নিয়ে মসজিদে যাওয়ার সেই দিনগুলো এখনও ভাসে চোখের পাতায়। মনে হয়, এই বুঝি মাত্র কয়েক দিন আগের কথা। আহা, সময় কতো দ্রুত ফুরিয়ে যায়!

একটু বড় হতেই মাদরাসায় ভর্তির জন্য আম্মু আমাকে প্রস্তুত করা শুরু করল। প্রতিদিন মাদরাসার বিভিন্ন কথা বলে মন ভোলায়। অবশেষে এক বছর রমজানের পর আংগারিয়া সদরের কাঁশাভোগ গ্রামে অবস্থিত শরীয়তপুরের ঐতিহাসিক উসমানিয়া মাদরাসায় আমাকে ভর্তি করা হয়। সুন্দর- পরিপাটি, সবুজ- শ্যামল এক মনোরম পরিবেশে আবৃত এই মাদরাসা।

২. আল্লাহর রহমতে দাখেলা হয়ে গেল। ক্লাস চালু হতেই কখন যে কুরবানি ঘনিয়ে এল টেরই পেলাম না। তখন কুরবানির পূর্বে মাসিক পরীক্ষা হতো।  অনেক কষ্ট-মেহনতের পরও বাড়ির নাম নিতে পারলাম না মুখে।

পরীক্ষা শেষ হতেই কুরবানির চামড়া কালেকশনের প্রস্ততি শুরু হল। কাজ বণ্টনের দায়িত্বরত উস্তাদ মাও. আবু বকর সাহেব। তিনি উস্তাদ- ছাত্র সকলকেই মসজিদে যেতে বললেন৷ বড় হুজুর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- রাকিব! তুমি কোন এলাকায় কাজ করবে? নির্বিঘ্নে স্বরটা নীচু করে বললাম, ‘হুজুর আপনার সঙ্গে কাজ করবো। আমার কথা শুনে হুজুরে মুচকি হেসে বললেন- ঠিক আছে তুমি আমার সঙ্গেই থাকবে৷

৩. সেবার জীবনের প্রথম মাদরাসায় ঈদ করলাম। পরিবারহীন ঈদ করাটা অনেক কঠিন মনে হয়েছিল। আমি পরিবারের ছোট ছেলে। আদর থেকে বঞ্চিত হওয়া মেনে নিতে খুব কষ্ট হয়েছিল। শত বিপত্তি ঝেড়ে ফেলে অবশেষে থেকে গিয়েছিলাম। সহপাঠিদের সঙ্গে ঈদের নামাজের প্রস্ততি নিলাম। আমার সঙ্গে ভাগিনে ফয়সাল ইকবালও ছিল।

নামাজের পর মানুষেরা একে অন্যের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুআনাকা করছে। ছোট্ট- ছোট্ট শিশুরা নতুন কাপড় পরে দৌঁড়-ঝাঁপ করছে৷ কেউবা নিজ বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর খেলাধুলায় মেতে উঠছে। কেউবা বাবার হাত ধরে বাড়ির পথে চলছে। পরিবারের লোকেরা দল বেঁদে আনন্দ-স্ফুর্তিতে মেতে উঠেছে। আর আমরা গরু জবাই ও চামড়া আদায় করতে ময়দানে নামছি।

৪. ভাগিনা ফয়সাল ইকবাল মুফতি যোবায়ের আহমাদ কাসেমি (চাটগামি হুজুর)’র সঙ্গে কাজ করত। কাসেমী হুজুর মাদরাসার মসজিদের খতিব ছিলেন বিধায় তিনি মাদরাসার এলাকায় কাজ করতেন। তিনি আমাদের দু’জনকে খুবই মুহাব্বাত করতেন। যেন আমরা তার পরিবারের সদস্য। দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে হুজুর এলাকার কাজ সমাপ্ত করে মাদরাসায় চলে আসলেন। হুজুরের খালাতো ভাই ছিলেন হেফজ খানার উস্তাদ।  নদীরপাড় এলাকায় চামড়া আদায় করতেন। আমরা মামা-ভাগিনা সব সময় এক সঙ্গে থাকায় ছাত্ররা আমাকে মামা বলে ডাকতো৷ দুষ্টমি করে হুজুরও আমাকে বললেন- “মামা! আমি খালাতো ভাইয়ের ওখানে যাচ্ছি৷ দুপুর ২টার দিকে চলে আসবো৷ আমি আসার পরেই তোমরা বাড়িতে যাবে।

কোন কাজ-কর্ম না থাকায় যতো দ্রুত সম্ভব; বাড়িতে যাওয়ার পায়তারা করছিলাম। সারাদিন কাজ করে ক্ষুধায় পেটটা ধুকধুক করছিল। যোহর নামাজ পড়ে মাদরাসার কুরবানির গোশত দিয়ে কোনও রকম দুপুরের খাবার খেলাম। হুজুরের আসতে দেরি হচ্ছিল। কখন ফিরবো মায়ের কোলে? কখন দেখবো প্রিয়জনদের প্রিয় মুখগু? হুজুরের অপেক্ষা করতে করতে আড়াইটা বেজে গেল। তবুও কোনো খোঁজ মিললো না।

দুপুর তিনটা বেজে গেল। মামা- ভাগিনে মিলে পরামর্শ করলাম, কী করা যায়? হুজুর তো আসছে না। ফয়সাল বলল, আমরা বাড়িতে চলে যাই। পুরো মাদরাসায় কতোগুলো পাখি ও প্রাণির সঙ্গে শুধু বুঝশক্তিহীন আমরা দুই কচিকাচা বালকই রয়ে গেছি। মাদরাসার এই নিরিবিলি পরিবেশে পায়চারি করে পায়ের তলা দু’টো ব্যথা না করে বাড়িতে চলে যাওয়ায় তো ভাল। অবশেষে ঘরের পথে পা বাড়ালাম।

৫. কতো দিন হলো, মায়ের মায়াবি মুখটি দেখিনি৷ কী মায়াময় আমার মা! কতো দরদি তিনি! মায়ের আদরে ছুটির দিনগুলো অতিদ্রুত ফুরিয়ে গেল। আচ্ছা, পৃথিবীর সব মায়েরাই কি এমন দরদি হয়?

দীর্ঘ ছুটি এখন প্রায় শেষ কিন্তু বাড়ির এক কঠিন কাজের চাপে পড়ে গেলাম আমি। বাধ্য হয়ে তিন দিন পর মাদরাসায় উপস্থিত হতে হলাম।

মাদরাসার একটি সুন্দর নিয়ম ছিল। বাদ জোহর উস্তাদ-ছাত্ররা মসজিদে সম্মিলিত দুআতে শরিক হতো। দোয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী কিতাব বিভাগ ও হেফজ খানার ছাত্রদের হাজিরা নেয়া হতো। ঘটনাক্রমে ওই দিন হাজিরা নিলেন আমাদের হুজুর মুফতি যোবায়ের আহমাদ কাসেমি। তিন দিন পরে আসায় সকল ছাত্রদের সামনে আমাকে আসামি হিসেবে দাঁড় করানো হল। হাজিরা শেষ না হতেই লাঠি আনার নির্দেশ। তবে, আমার ভেতর ভয়-ভীতির কোনো চিহ্ন নেই।

আমাল নামা ডাকার আগেই দু’ হাতের দপদপ করে বাড়ি পড়ল। বাড়ি খেয়ে মনে হল কতোগুলো মরিচের গুঁড়ো হাতে ঢেলে দেওয়া হয়েছে। মুহূর্তেই তালু দু’টো লালচে হয়ে গেল। মারত্মক আঘাতে চামড়া ভেদ করে শরীরের রক্তও বের হবার উপক্রম।

৬. মাদরাসায় সাধারণত ভাল খাবার দেওয়া হয় না। কিন্তু ওই দিনই দুপুর বিরানি দেওয়া হল। এক দিকে দুঃখি মন। হুজুর কি আমাকে সত্যিই মুহাব্বাত করেন? তাহলে কেন ওজর না শুনেই এমন শাস্তি দিলেন! অন্যদিকে বিরানির সুন্দর গন্ধ। খাবারের মুহূর্তে সহপাঠিরা আমাকে ডাকতে এলো। আমার যেন কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। রুমের এক কোণে বসে কাদঁছি আর কাঁদছি।

হঠাৎ হুজুজর আমাকে ডাকলেন। দেরি না করেই চলে গেলাম। তখনও কাঁদো কাদোঁ অবস্থা। হুজুর একটু হেসে রসিকতা করেই বললেন- ‘কেমন লাগছে?’ হুজুরের মুচকি হাসিতে মন কিছুটা শান্ত হল। তিনি আমাকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন- রাকিব, মারটা একটু বেশী হয়ে গেলো?

এরপর পাশের একজনকে বললেন, রুম থেকে মলমটি নিয়ে আসো। নিজ হাতে তিনি আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে বুলিয়ে দিলেন৷। আমাকে বললেন, এত কাদঁছো কেন! তোমাকে আমি খুবই মুহাব্বাত করি। তুমিও আমাকে খুব মুহাব্বাত করো। আর ভালোবাসার দাবি হল প্রেমাষ্পদের প্রতি বেশি খেয়াল রাখা। এরপর নিজের জীবনের একটি কাহিনী শুনালেন। কতো কষ্ট করে তিনি এ পর্যন্ত এসেছেন সেই কাহিনী। আল্লাহ, আমার শিক্ষককে আপনার পছন্দ অনুযায়ী প্রতিদান দিন। আমিন।

হুজুরের এতোটুকু শাসন আমার ওপর এতোটা প্রভাব ফেলে যে, এরপর পুরো শিক্ষা-জীবনে মাদরাসার নিয়মের বাইরে ওজরহীন, অযথা ছুটি বাসায় থাকিনি। এমনকি আমার ছোটো আপা ও সেজো ভাইয়ের বিবাহেও অনুপস্থিত ছিলাম। আর হ্যাঁ, একজন দরদি উস্তাদই পারেন এভাবে ছাত্রের জীবনটা গড়তে।

আই.এ/

মন্তব্য করুন