একটি পথশিশুর জীবনবৃত্তান্ত

প্রকাশিত: ৭:৫৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৩, ২০১৯

রায়হান। বয়স তেরো কিংবা বারো। হাস্যোজ্জ্বল চেহারা।অমায়িক আচার-ব্যবহার। পরনে হাফপ্যান্ট আর কমলা রঙের গেঞ্জি। হাতে মাঝারি সাইজের লাল-রঙের একটি বালতি। উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে কী যেন বলছিলো। সে কি বলছিলোসেটা স্পষ্ট ভাবে শোনা যাচ্ছিলো না। একদিকে উত্তাল সাগরের গর্জন, অন্যদিকে কোলাহল। কক্সবাজার সৈকত মানেই তো লোকারণ্য। সবমিলিয়ে ওই বালতি বালকের উচ্চ ডাকের ভাবার্থ আমার কানের দরজায় এসে কড়া নাড়লেও দরজাটা খুলে ঠিক বরণ করে নিতে পারছিলাম না! যাক, আমিও আর ইচ্ছে করে শুনতে চাইলাম না। কেননা, এমন হাজারো বালতি বালকের চিত্র তো হরহামেশাই দেখা যায় সৈকতে।

আস্তে-ধীরে সাগরপাড়ের দিকে চলে আসতে লাগলাম। ততক্ষণে ওই বালতি বালকও খুব কাছাকাছি চলে আসলো, প্রায় ছুঁইছুঁই। আবারও চিৎকার দিয়ে ওঠলো। এবার তার চিৎকারের ভাবার্থ অবশ্যই বুঝতে কষ্ট হয়নি। খুব কাছেই সে। অকপটে বুঝে গেলাম। ‘এই ঠান্ডা পানি আছে, ঠান্ডা পানি, নিবেন?’ অবাক করা বিষয় হচ্ছে বালতি বালক আমার সামনে আসতে না আসতেই তার ওই উচ্চস্বর মিইয়ে গেল। এবার আমাকেই টার্গেট করে বললো— ‘ভায়া, ঠান্ডা পানি আছে, নিবেন?’

মনেমনে ভাবতে লাগলাম—’আমি বাপু কিপ্টে মানুষ, মিনিট-পাঁচেক পর রুমে গেলেই স্বচ্ছ পানি তো পাচ্ছিই। আর মিনারেল ওয়াটার পান করার খাহেশ আমার নেই। তা-ও আবার দ্বিগুণ দামে!’

তবে, ছেলেটার কপোলে অভাক করা এক মায়া ভাসছিলো। তার অমায়িক আচরণে রীতিমতো মুগ্ধ হচ্ছিই তো হচ্ছি। বিক্রির পদ্ধতি দেখেও বিস্মিত হলাম। তার মধুমাখা ‘ভায়া’ ডাকটা যেন ক্রমশ আঘাত করছিলো আমার হৃদয়ে। অতপর ‘হুম, নেবো’ বলতেই হলো। এক প্রকার বাধ্য হয়েছি।

আঙ্গুলে ইশারায় কাছে আসতে বললাম। বললাম আরও কাছে আসো। আপত্তি না থাকলে পাশে এসে বসো। সে-ও খুব সহজেই পাশে বসে গেলো। আচমকা তার জীবনের সূত্র খোঁজার ইচ্ছে হলো! বললাম— ‘ছোট ভাই, তোমার কাছ থেকে কিছু জানার ছিলো! বলবা?’

জ্বি ভায়া, অবশ্যই। কেনো নয়…

নাম-ঠিকানা জিঙ্গাসা করলাম। এরপর বললাম— এ পেশায় ক’দিন ধরে আছো? এই তো ভায়া, গতবছর ক্লাস ফোরের বার্ষিক পরীক্ষার পর থেকেই। এবার নড়েচড়ে বসলাম! ক্লাস ফোর অবধি পড়েও ফাইভের সমাপনী পরীক্ষা দাওনি ক্যান? বেচারা মাথাটা নিচু করে ভাবতে লাগলো। মনে হচ্ছে আমার এ প্রশ্নে সে খুব হতাশ। যেনো বিষাদময় এক প্রশ্ন করে বসেছি তাকে।

রায়হান, এদিকে তাকাও। সমস্যা হচ্ছে তোমার?

না ভায়া, সমস্যা হচ্ছে না। তবে,কষ্ট হচ্ছে বেশ!

আচ্ছা, কেনোই বা কষ্ট হচ্ছে বলো…? রায়হান আমতাআমতা করতে লাগলো। সে যেনো চাচ্ছে কষ্ট গুলো নিজের ভেতর সীমাবদ্ধ করে রাখতে। এ পৃথিবী না জানুক/ না দেখুক তার লুকায়িত চাপা কষ্ট! রায়হান মনেমনে বোধহয় এ কথাটায় চিন্তা করতেছিলো।

তবে, মায়াভরা সূরে বললাম—রায়হান: বলো,আমি শুনতে চাই তোমার জীবনবৃত্তান্ত। রায়হান হয়তো খুব আপন ভেবে নিলো আমাকে। যেনো বিশ্বস্ত কেউ। এবার রায়হান রাজি হলো; জ্বী ভায়া,শুনেন তাহলে,বলছি।

রায়হানের বলল, আমার বাবা ছিলেন জেলে। জীবিকার তাগিদে বেশিরভাগ সময়ই কাটাতেন সাগরে।
আমার বয়স তখন নয় বছর। ছোটবোন রাবেয়ার বয়স পাঁচ। তখনকার ঘটনা গুলো একটুআধটু মনে আছে আমার। সপ্তাহে একবার বাড়ি আসতেন বাবা। মাঝেমধ্যে পনেরো দিন পরেও আসতেন।
বলতে গেলে দিব্যি চলছিলো পরিবার।

এরপর প্রায় কুড়ি-দিন হয়ে গেলো, তবুও দেখা নেই বাবার। যাবার সময় বলে গিয়েছিলো সাত-আঠ দিন বাদেই চলে আসবে৷ কিন্তু বাবা আসার নামনিশানা নেই। এদিকে কোনো হদিশও পাচ্ছিলাম না বাবার৷ পুরো পরিবারে থমথমে এক পরিস্থিতি বিরাজ করতেছিলো। আতংকে সবাই। কী করবে? কী হবে? কোথায় যাবে? কাকে বলবে?

আম্মা উঠানে হামাগুড়ি দিতে দিতে বিলাপ ধরে কান্না করতেছিলো। ক্রন্দনের সুরে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে যাচ্ছিলো রীতিমতো। আমি অবশ্যই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কিইবা হচ্ছে আদৌ! এভাবে দিনের পর সপ্তাহ, সপ্তাহর পর মাস,মাসের পর বছর অতিবাহিত হতে লাগলো। দেখা নেই বাবার। তারপর আমরা আন্দাজ করে নিলাম— হয়তো বাবা আর বেঁচে নেই! কিছু না বলেই বোধহয় চলে গেলেন তিনি আপন পারে। আল্লাহ মাফ করুক আমার আব্বাকে।

রায়হান! তারপর কী হলো?

এরপর ছোট বোনটাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন আম্মায়। বাবা থাকাকালীন অবস্থায় কিছু টাকা জমিয়ে রেখেছিলো, যা দিয়ে বছর-দেড়বছর স্বাভাবিক ভাবেই চলছিলো সংসার। ডিজিটাল বাংলাদেশে অল্প টাকা দিয়ে ক’দিনই বা চলবে!

তারপর সংসারে নেমে এলো অশান্তির মহা প্লাবন। নেমে এলো অভাব-অনটন। এই প্লাবন আমাদের সব সুখেদের তছনছ করে দিলো। কেড়ে নিলো দুমুঠো আহার, আর রাতের ঘুম। আমার নতুন জামাটাকেও ছাড় দিলো না, ওটাও নিয়ে নিলো। তখন থেকে আর নতুন জামা গায়ে দেওয়া হয়নি। মূলত অর্থের অভাবে গায়ে দিতে পারি নিই।

ভায়া! ওই প্লাবন কিন্তু দু’একটা জিনিস অবশ্য আমাদেরকে উপহার হিসেবে দিয়ে গিয়েছে। কিছু না বলেই উপহার দিয়েছে ‘নীরব কান্না, বস্তা ভর্তি হতাশার ঝুলি, আর মাথাভর্তি হরেকরকম দুশ্চিন্তা’। না, কিছুতেই সংসার চলছিলো না! এর মধ্যে অনেক টাকা ঋণ হয়ে যায়! চিন্তা আরো বেড়ে গেলো। প্রতিদিন পাওনাদারদের কুরুচিপূর্ণ কথা শুনতে শুনতে নিজের উপরই রাগ উঠতো। না পারতাম কিছু বলতে আর না পারতাম তাদের কুরুচিপূর্ণ কথার পাল্টা জবাব দিতে। বাক প্রতিবন্ধীর মতো চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার ছিলো না আমাদের। দু’হাত প্রসারিত করে শুধুই মালিককে বলতাম—’মালিক, এই করুণ অবস্থা থেকে মুক্তি চাই আমরা,মুক্তি দেন, দয়ে করেন আমাদেরকে’।

একদিন পড়ন্ত বিকেলে আমি,মা, আমার ছোটবোন রাবেয়া বারান্দায় বসে কি নিয়ে যেন কথা বলছিলাম। ঠিক ওই মুহূর্তে পাশের বাড়ির নয়না খালা এসে উপস্থিত হলো। আম্মাকে বললো— বুবু, তোমার জন্য কাজ পেয়েছি, করবা?

আম্মা হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলেন। জানতে চাইলেন কী কাজ? খালা বললেন এক বাড়িতে রান্না করতে হবে, সকাল টাইমে রান্না করে দিয়ে চলে আসতে পারবা।

মাসে তিন হাজার দিবে। রান্নার হাত ভালো হলে সামনে আরও বাড়িয়ে দেবে।

তারপর আম্মা বললেন—বুবু, এ মুহুর্তে তিন হাজার টাকা আমার জন্য তিনলক্ষ টাকার মতো। কখন থেকে যাবো বলেন?

আচ্ছা, সকালে আমার সাথে যায়েন।

পরদিন থেকে আম্মা নিয়মিত কাজে চলে যেতে লাগলেন। কিন্তু, এই তিন হাজার টাকা দিয়ে সংসারের ঘানি টানা বেশ কষ্টসাধ্য! ওদিকে আবার পাওনাদারদের টাকাও দিতে হচ্ছে।

আম্মা আমাকে বললেন —সকালে ঝাউবাগানে গিয়ে ঝাউপাতা কুড়ালে কেমন হয়? শুনেছি ভালোই ইনকাম। তাহলে আম্মা আমিও যাবো আপনার সাথে। আম্মা তখন বললেন —না,তোর যেতে হবে না। সকালে মকতব আছে তোর,তুই বরং মকতবে যাস।

আম্মার ইনকামের টাকায় মোটামুটি সংসার চলছিলো। কিন্তু, গতবছর থেকে আম্মা অসুস্থ। কোনো কাজকাম করতে পারে না। পুরোপুরি অচল বললেই চলে। ছোটবোনটা যা পারে, তা-ই করে।

আম্মার ঔষধ খরচ, বাড়ির বাজার,আর ছোট বোনের খাতা-কলম কেনার টাকা জোগাড় করার জন্য আমার লেখা-পড়ার ইতি টানিয়ে দিলাম।

বই-খাতা নিয়ে বোধহয় আর যাওয়া হবে না স্কুলে।

রায়হান! এগুলো বিক্রি করে দিনে কতো পাও?

এই তো ভায়া, তিনশো, কিংবা চারশো। তবে, সিজনে আরো বেশি পায়। আর রাতে বোতল কুড়াই। ওখানেও একশো-দেড়শো মতো পায়।

আলহামদুলিল্লাহ, আমার ইনকামে ভালোই চলছে।

আমার আম্মার জন্য একটু দো’আ কয়রেন ভায়া, যেনো ভালো হয়ে যায়। আম্মা ছাড়া কেউই নেই আমাদের। ওনিই সব।

মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে রায়হানের জীবনকাহিনী শুনছিলাম, নিজের অজান্তেই টপটপ করে চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল! আহা, মানুষের জীবন এতোটাই জটিল-কঠিন হতে পারে? কীভাবে সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব। পরিস্থিতি অসম্ভবকেও সম্ভব করে দেয়। পরিস্থিতি মানুষকে শিখিয়ে দেয় অনেক কিছু। শিখিয়ে দেয় কীভাবে পরিস্থিতির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয়, বাঁচিয়ে রাখতে হয়।

ভালো থাকুক, সুখ ফিরে আসুক রায়হানের মতো অসংখ্য রায়হানের জীবনে।

 আই.এ/

মন্তব্য করুন