চীনে ভয়াবহ মুসলিম নির্যাতন, নিশ্চুপ গোটা বিশ্ব!

প্রকাশিত: ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৪, ২০১৯

বর্তমান আধুনিক বিশ্বের কোনো এক প্রান্তে কারো ধর্মীয় ও মানবিক অধিকার খর্ব করা হলে সারা বিশ্বে সেটা আলোচিত হয়। নির্যাতিতের পাশে দাড়ায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। তাদের হয়ে কথা বলে তাবত পৃথিবীর বাঘা বাঘা শাসকরা। ফলে জুলুমবাজ সরকার বা বেসরকারী গোষ্ঠী কোনো না কোনো সময় নিবৃত হতে বাধ্য হয়।

কিন্তু এই আধুনিক উৎকর্ষতার পৃথিবীতে এমন একটি জাতিগোষ্ঠী আছে যাদের কান্না আর আহাজারি পৃথিবীর শাসকদের কর্ণ কুহরে ঠিক পৌঁছে না। তারা না পারছে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচতে, না পারছে নিজেদের ইচ্ছেমতো স্বাধীন জীবন-যাপন করতে। প্রতি পদে পদে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মুখে পড়ে এই নিগৃহীত জাতি। বলা হচ্ছে চীনের উইঘুর মুসলিমদের কথা।

চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের আদি বাসিন্দা হচ্ছেন সংখ্যাগুরু উইঘুররা। উইঘুররা জাতিগত, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিকভাবে তুর্কিঘনিষ্ঠ। চীনের অন্যসব এলাকার ওপর প্রাধান্য বিস্তারকারী হান জাতিগোষ্ঠী ও তার শাসকদের থেকে উইঘুররা সম্পূর্ণ আলাদা।

অথচ ১৯৪৯ সালে চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কিছুদিন পর চীনের কমিউনিস্ট সরকার উইঘুরদের বৃহত্তর চীনের সাথে যোগ দেয়ার প্রস্তাব জানায়। প্রস্তাব মেনে না নেয়ার পর থেকে শুরু হয় উইঘুর মুসলিমদের উপর নির্যাতন, নেমে আসে বিভীষিকাময় অত্যাচার। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে উইঘুরদের ধর্ম ও সংস্কৃতির স্থলে কমিউনিজম চাপিয়ে দেওয়ার জন্য চীনা কমিউনিস্টরা উঠে পড়ে লেগে যায়। এর অংশ হিসেবে তাদের ধর্মীয় শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়। ধর্মীয় প্রার্থনালয় ভেঙে দেয়া হয়। ধর্মীয় কার্যাবলীর উপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এমনি ঘটনা দীর্ঘ ৭০ বছর যাবত প্রত্যক্ষ করে আসছে চীনের উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়, চীন সরকারের নির্মম নির্যাতন এবং নৃশংশতার সাক্ষী শিনজিয়াং প্রদেশের ১ কোটি ১০ লাখ মুসলমান

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিটি ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছে, প্রায় ১০ লাখ উইঘুরকে চীনের ‘সন্ত্রাসবাদ’ কেন্দ্রগুলোয় আটক রাখা হয়েছে। ২০ লাখ মানুষকে ‘রাজনৈতিক ও রাজনৈতিক পুনর্বিবেচনার শিবিরে’ অবস্থান করতে বাধ্য করা হয়েছে। এসব তথ্যের সাথে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগের মিল পাওয়া যায়।

ইতিপুর্বে ১৯৫২ সালে অক্টবার মাসে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় ৪ দিনব্যপি একটি ইসলামি সাংস্কৃতিক সম্মেলনে রুহী উইঘুর নামের একব্যক্তি প্রবন্ধ পাঠান করেন। তাতে দক্ষিন-পশ্চিম এলাকায় বসবাসকারী মুসলমানদের উপর যে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয় তার একটি বিবারণ প্রকাশ পেয়েছিল । তখন এই প্রবন্ধ সকলের মনে নারা দেয় । এর অর্থা চীনা মুসলিমদের ওপর নির্যাতন এটা নতুন কিছু না। আর একটা বিষয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, যেসব লোকজনের ২৬টি তথাকথিত ‘স্পর্শকাতর দেশের’ আত্মীয়-স্বজন আছেন তাদেরকে এসব ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, কাজাখিস্তান এবং তুরস্কসহ আরও কিছু দেশ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, এছাড়াও যারা মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বিদেশের কারও সাথে যোগাযোগ করেছে তাদেরকে টার্গেট করেছে কর্তৃপক্ষ।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রাপ্ত তথ্য থেকে ভয়াবহ কিছু বিষয় জানা গেছে। ‘শিক্ষা শিবির’ নামক ক্যাম্পে যাদেরকে রাখা হয়েছে তাদেরকে চীনা ম্যান্ডারিন ভাষা শেখানো হচ্ছে। কমিউনিস্ট পার্টির প্রশংসার কথা বলা এবং তাদের সঠিক আচরণ পরিচালনার নিয়মগুলো কঠোরভাবে মনে রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে। তাদের নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সমালোচনা করতে অথবা সেই ধর্ম পরিত্যাগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

এ অভ্যাসগুলোর অংশ হিসেবে চীন সরকার সাংঘর্ষিকভাবে শিনজিয়াংয়ের উইঘুর সংস্কৃতি ও জাতিগত সত্তাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এই শিক্ষাশিবিরের পাশাপাশি উইঘুর শিশুদের ক্যাম্প ও স্কুল রয়েছে, যেখানে তাদের পরিবার, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। শিক্ষাশিবিরে পাঠানো লাখো উইঘুরের নির্মম নির্যাতনের ঘটনা বিশ্ব মিডিয়াতেও এসেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, ২০০৯ সালের দাঙ্গার পর চীনা সরকারের সমালোচনা করে শান্তিপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশের দায়ে চীন সরকার গোপনে বেশ কয়েকজন উইঘুর মুসলিম বুদ্ধিজীবীর বিচার করেছে।

বিশিষ্ট উইঘুর ব্যক্তিত্ব গত কয়েক বছরে আটক বা অদৃশ্য হয়ে গেছেন শিনজিয়াং থেকে। এদের মধ্য আছেন ইসলামি শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ সালিহ হাজিম, অর্থনীতিবিদ ইলহাম তোকতি, নৃতাত্ত্বিক রাহাইল দাউদ, পপশিল্পী আবদুর রহিম হায়াত, ফুটবল খেলোয়াড় এরফান হিজিম প্রমুখ। ২০১৬ সালে ‘মেকিং ফ্যামিলি’ নামের একটি উদ্যোগ চালু করে চীন। এর মাধ্যমে উইঘুর পরিবারকে প্রতি দুই মাসে কমপক্ষে পাঁচ দিনের জন্য তাদের ঘরে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের হোস্ট করতে বাধ্য করে।

শিনজিয়াং প্রদেশে সংবাদ মাধ্যম নিষিদ্ধ। তাই এসব অত্যাচারের নির্মমতা মানুষ খুব কমই জানতে পারছে। চীন সরকার বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। উইঘুর মুসলমানদের বিরুদ্ধে বর্বরোচিত নীতির ব্যাপারে চীন বলে যে বিচ্ছিন্নতাবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় চরমপন্থার মোকাবিলা করার জন্যই তারা নানান পলিসি নিতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু দাড়ি রাখা, রমজান মাসে রোজা রাখা কীভাবে ধর্মীয় চরমপন্থা, তা বিশ্ববাসীকে বোঝাতে পারে না।

মূলত ধর্মীয় অনুষ্ঠান তাদের মতে চরমপন্থা। আর এই চরমপন্থা দমনের নামে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, জেল-জরিমানা চলছে। অপরদিকে গোটা বিশ্ব বিবেক এই বর্বর নির্যাতন চেয়ে চেয়ে দেখছে। মাঝেমধ্যে নিন্দা করে বিবৃতি দেওয়া ছাড়া কোনো দেশ এই ব্যাপারে তেমন কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না বা নিতে পারছেন না। তবে সকল উদারবাদী শান্তিপ্রিয় মানুষের একটাই চাওয়া, অচিরেই উইঘুর মুসলিমরা যেন চীনে তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ফিরে পায়।

চীনের বর্তমান কম্যুনিস্ট শাসকরা প্রধানত : অন্য সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়াতে উইঘুরদের সাথে তাদের কোনো সুসম্পর্ক নেই। শুধু সুসম্পর্ক নেই বললেই বিষয়টা পুরা বলা হয় না। উইঘুরদের মধ্যে ইসলামের যে প্রভাব আছে তাকে চীনের কম্যুনিস্ট নেতারা আপত্তিকর মনে করে এবং তা দূর করতে বলপ্রয়োগ ও নির্যাতন চালানো কোনটাই বাদ রাখতে তারা রাজী নয়।

মাঝখানে একটা কথা বলে রাখি, বাংলাদেশের জনগণের প্রতি প্রতিবেশী ভারতের শাসক সম্প্রদায়ের মনোভাব ভাল নয়। বিশেষ করে ভারতের বর্তমান শাসক দল বিজেপি আগাগোড়াই একটি কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হওয়াতে মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের প্রতি তাদের মনোভাব আগাগোড়াই শত্রুতাভাবাপন্ন। ভারতের শাসক সম্প্রদায় মুসলমানদের প্রতি শত্রুতাভাবাপন্ন বলে বাংলাদেশের জনগণ চীনের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন। এই একই কারণে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জনগণ চীনের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন। কিন্তু তারা চীনের উইঘুর মুসলমানদের বিরুদ্ধে চীনের কম্যুনিস্ট শাসকদের আচরণে ক্ষুব্ধ। এটা উইঘুররা প্রধানত: মুসলামন বলে নয়, চীনের কম্যুনিস্টদের মধ্যে মানবিকতা বোধের প্রচন্ড অভাব বলে।

আমরা উইঘুরদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন তারা প্রধানত: মুসলমান বলে নয়, তারা মজলুম বা নির্যাতিত বলে। কম্যুনিস্টরা বিপন্ন মানবতার পক্ষে বলে এক সময় যে ধারণা ছিল তা অসত্য প্রমাণিত হয়েছে কম্যুনিস্ট চীনসহ বহু দেশে। ইসলাম জুলুম-নির্যাতনে বিশ্বাস করেনা। সে কারণেই আমরা উইঘুরদের বিরুদ্ধে চীনের কম্যুনিস্ট শাসকদের নির্যাতনের বিরোধী। এই নির্যাতন তারা বন্ধ না করা পর্যন্ত আমরা তাদের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়ার প্রয়োজন বোধ করব না।

রাশিয়া, চীন প্রভৃতি দেশে কম্যুনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠার বহু বহু বছর আগে আরব দেশে সাম্যভ্রাতৃত্বের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন ইসলামের নবী হযরত মুহম্মদ (সা.)। পরবর্তীতে মুসলমানরা অনেকে সাম্যভ্রাতৃত্বের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হলেও প্রকৃত ইসলামপন্থীরা কখনও সাম্য-ভ্রাতৃত্বের আদর্শ ত্যাগ করেননি। অপর পক্ষে রাশিয়া, চীন প্রভৃতি দেশে একদা কম্যুনিস্ট সমাজ গড়ে উঠলেও অল্পদিন পরেই তারা দেশে নির্যাতনমূলক আদর্শের দিকে ফিরে যায়। সুতরাং কম্যুনিস্টদের ইতিহাস থেকে মুসলমানদের শিক্ষা গ্রহণের কিছু নেই। তাই রাশিয়া, চীন প্রভৃতি দেশে কম্যুনিস্ট শাসনের পরিবর্তে যে নির্যাতনমূলক পথে তারা দেশ পরিচালনা শুরু করেছে তা থেকে আমাদের গ্রহণের কিছু নেই। তবে এ বিষয়ে আমরা চীনের তুলনায় রাশিয়ার দৃষ্টান্ত থেকে কিছুটা ইতিবাচক কিছু দেখতে পাচ্ছি। রাশিয়ায় কম্যুনিস্ট শাসনের পতনের পর এককালের সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্গত যেসব অঞ্চলে এককালে কম্যুনিস্ট শাসন ছিল, সেসব দেশ এখন অপেক্ষাকৃত উন্নত সমাজ হতে পেরেছে।

আরো পড়ুন: উইঘুর কারা? কী তাদের অপরাধ?

দু:খের বিষয় এব্যাপারে রাশিয়ার দৃষ্টান্ত থেকে অনেক পেছনে পড়ে আছে কম্যুনিস্ট চীন। তার প্রমাণ আমরা দেখছি উইঘুরদের বাসভূমি চীনের সিনকিয়াংয়ে। সেখানে এখন চলছে কম্যুনিস্ট শাসকদের জংলী শাসন। এটা বলছি শুধু উইঘুরা মুসলিম বলে নয়। তারা যদি মুসলমান নাও হতো, আমরা তাদের এই জংলী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতাম।

বাংলাদেশের জনগণ আমরা চীনের সাধারণ মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল যদিও আমাদের একাত্তুরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের শাসকরা পাকিস্তান শাসকদের প্রতি নিলজ্জ সমর্থন দিয়ে গেছে। কারণ ঐ সমথর্নের ব্যাপারে চীনের সাধারণ মানুষের কোন দোষ ছিল না। দোষ ছিল চীনের কম্যুনিস্ট নেতৃবৃন্দের। আমরা বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে চীনের সাধারণ মানুষের প্রতি আমাদের সহানুভূতি জানাতে চাই এবং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানাতে চাই যে, চীনের শাসকদের অপরাধের জন্য আমরা চীনের সাধারণ মানুষদের দায়ী করতে চাই না।

তারা নির্দোষ কারণ তারা চীনের শাসকদের মত একাত্তুরের আমাদের বিরুদ্ধে কোন অপরাধ করেনি। তারা চীনের শাসকদের মতো আমাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ করেনি, তাই তাদের শাসকদের সাথে একইভাবে দায়ী করতে পারি না। পক্ষান্তরে যেহেতু তাদের শাসকরা একাত্তরে আমাদের জনগণের পক্ষ দাঁড়ায়নি, তাই আমরা তাদের অকারণে নিন্দা করে তাদের অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাই না। কারণ আমরা বিশ^াস করি, যারা অপরাধ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে বিরোধিতা করাও একটা অপরাধ। আমরা যে কারণে চীনের সাধারণ মানুষের পক্ষে, সেই একই কারণে আমরা চীনের অপরাধী শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না জানানোকেও একটা অপরাধ বলে মনে করি।

এমএম/এসএস/আইএ 

মন্তব্য করুন