রাসূল সা. এর অবমাননার শাস্তি ও যৌক্তিকতা

প্রকাশিত: ৭:৩৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০১৯

ইসলাম হল নিখুঁত, পরিপূর্ণ ও চিরন্তন একটি জীবনব্যবস্থা। এর প্রতিটি বিধান ও আহকাম সত্য ও যুক্তিযুক্ত। ইসলামে কোনো দ্বিধা ও জটিলতা, অসাঢ়তা ও অযৌক্তিকতা নেই। ইসলামের সৌন্দর্য এবং ইসলামী জীবনের প্রশান্তি ও প্রাণময়তা প্রমাণিত সত্য। সারা বিশ্বের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম ও ইসলামের নবীকে আপন করে নিচ্ছে। দলে দলে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছে। ইসলামের অগ্রযাত্রা পশ্চিমা ও তার দোসরদের সহ্য হয় না। তাদের গাত্রদাহ হয়। বিগত কয়েক বছর থেকেই তারা পুরো দুনিয়ায় ইসলাম অবমাননার এক তুফান বইয়ে দিয়েছে। তারা চেষ্টা করছে– ইসলামকে হীন ও নিচু করার। ইসলাম ও ইসলামের নবীর ‘খুলুকে আজীমের’ উপর কালিমা লেপনের। আহলে বাইত ও সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে আপত্তিকর কথা প্রচারের।

শাইখুল ইসলাম তাকী উসমানীর ভাষায়— ”বর্তমানের তথাকথিত সভ্যতার দাবিদাররা, যারা নিজেদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির ঢাকঢোল পিটিয়ে বলে বেড়ায়, আমরাই মানবাধিকারের ঝান্ডাবাহী। তাদের কাছেও ইসলামের বিরুদ্ধে কোন যুক্তি প্রমাণ নেই। ইসলামের বিরুদ্ধে যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে তাদের করুণ পরাজয় হয়েছে। ফলে তাদের জন্য এখন ইসলাম ও ইসলামের নবীর বিরুদ্ধে গালিগালাজ করা ছাড়া অন্য কোন পথ খোলা নেই। তাই চাঁদের গায়ে থুথু ছুঁড়লে যেই পরিণতি হয়, তাদের তাই হচ্ছে। নিজেদের নাপাক থুথুতে সর্বগতরে নিজেরাই নাপাক হচ্ছে”।

শানে রিসালাত সম্পর্কে গোস্তাখি এত ভয়াবহ ও ঘৃণ্য অপরাধ যে, কোন মুসলমান-ই তা বরদাশত করতে পারে না। মুসলমানরা যত দুর্বল, সহায়-সম্বলহীন ও বিপর্যস্তই হোক না কেন যখন হেফাজতে শানে রেসালতের প্রশ্ন আসে তখন শাপলার তপ্ত-খুন ইশকে রাসুলের চেতনায় ও শিরা-উপশিরায় টগবগ করে উঠে। অপরিণামদর্শী সে নরপশুকে শায়েস্তা করা পর্যন্ত তারা স্থির ও শান্ত হতে পারে না। রাসূল অবমাননাকারীদের শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা কুরআনুল কারীমে বলেন—

انّما جزاء الذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآَخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ

যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের বিরুদ্ধে দুশমনিতে লিপ্ত হয় এবং পৃথিবীতে অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টির পাঁয়তারা করে, তাদের শাস্তি কেবল মৃত্যুদন্ড, শূলিবিদ্ধ করে হত্যা কিংবা হাত পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা অথবা নির্বাসিত করা (কারাগারে নিক্ষেপ করা)। এ তো হল তাদের পার্থিব অপমান। আর পরকালেও তাদের জন্য অপেক্ষা করছে মর্মন্তুদ শাস্তি। (মায়েদা ৬ : ৩৩) হাদীসে নববীতে মুরতাদদের শাস্তি প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে—

عن عكرمة قال : أتي علي رضي الله عنه بزنادقة فأحرقهم. فبلغ ذلك ابن عباس فقال : لو كنت أنا لم أحرقهم، لنهي رسول الله صلى الله عليه وسلم : لا تعذبوا بعذاب الله، ولقتلتهم لقول رسول الله صلى الله عليه وسلم : من بدل دينه فاقتلوه.

ইকরিমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আলী রা. এর নিকট কয়েকজন মুরতাদ-যিন্দীককে ধরে আনা হল। তিনি তাদের পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন। এ-খবর ইবনে আববাস রা এর নিকট পৌছলে তিনি বললেন, আমি হলে পুড়িয়ে হত্যা করার আদেশ দিতাম না। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহ পাকের শাস্তি দানের বস্তু (আগুন) দ্বারা শাস্তি দিও না।’ আমি বরং এদেরকে হত্যা করতাম। কেননা আল্লাহর রাসুল বলেছেন, ‘যে নিজের দ্বীন পরিবর্তন করবে, তাকে হত্যা করে ফেলবে।’ (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৯২২, জামে তিরমিযী, হাদীস ১৪৫৮, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৩৫১, মুসনাদে আহমদ, হাদীস ১৮৭১) এছাড়াও হাদীস শরীফে কা’ব ইবনে আশরাফ হত্যার প্রসিদ্ধ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুক্তি ভঙ্গ করে শত্রুতার ঘোষণা দেওয়া ও তাঁর শানে কুৎসা রটনা করে কবিতা আবৃত্তির অপরাধে তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। ( সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)

ইবনে কুদামা হাম্বলী রহ. লিখেছেন, সব ধরনের মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড। এ বিষয়ে আলেমগণের ইজমা তথা মতৈক্য রয়েছে। হযরত আবু বকর, উসমান, আলী, মুআয, আবু মুসা, ইবনে আববাস এবং খালিদ ইবনে ওয়ালীদ প্রমুখ সাহাবী রাযিয়াল্লাহু আনহুম থেকে এ শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে। আর এ শাস্তির উপর কোনো সাহাবী আপত্তি করেননি। অতএব মৃত্যুদন্ডের এ বিধানের উপর সাহাবায়ে কেরামেরও ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।-আলমুগনী ১২ : ২৬৪ রাসুলের কটুক্তিকারীর মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারে উম্মাহর ঐক্যমত নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তাই সে মুসলিম হোক বা কাফের হোক। চার ইমাম থেকেই এই ফতোয়া বর্ণিত হয়েছে। (কিতাবুল খারাজ,১৮২; ফতোয়ায়ে শামী ৩/৩১৯)

কুরআন হাদীস ও ইজমা দ্বারা রাসূল অবমাননার শাস্তি প্রমাণিত হলো। বিশ্বাসীদের জন্য এটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু রাসূল অবমাননার শাস্তি হিসেবে যখনি মৃত্যুদণ্ডের কথা আসে, তখন পশ্চিমা জ্ঞানপাপী ও তথাকথিত মানবাধিকার সংগঠনগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। তারা বরং মানবতার মুক্তির দূত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অবমাননাকেই একটি মানবিক অধিকার হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চালায়।

যে মহান সত্তা মানব জাতিকে মানবতা ও মানবতার সম্মান শিখিয়েছেন; মানব জাতিকে সম্মানের অধিকার দিয়েছেন, তার সাথে বেয়াদবির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কখনো মানবাধিকার লঙ্ঘন হতে পারে না। পৃথিবীর কোথাও কোন আইনে এই মানদন্ড টিকতে পারেনা। কারণ, পৃথিবীর সব দেশেই, সব রাষ্ট্রেই যখন বিদ্রোহীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়; তখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষের বিদ্রোহীকে কেন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবেনা ?! এ-ব্যাপারে হট্টগোল যে অনেক বড় নিমকহারামি তা বলাই বাহুল্য। এছাড়াও সমাজে মুরতাদের অবস্থান সংঘাত-সহিংসতা ও আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতির কারণ হয়ে থাকে। এমন ব্যক্তির বেঁচে থাকার মাঝে কোনো মঙ্গলের আশা করা যায় না। একে বাঁচিয়ে রাখাই বরং অনেক বড় নির্বুদ্ধিতা। আমরা যদি সাম্প্রতিক পরিস্থিতির দিকে একটু লক্ষ্য করি, তাহলেই আমাদের সামনে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। মূলত মানবাধিকারের কথা তাদের মুখেই মানায় যাদের আলোকিত ও সোনালী ইতিহাস আছে। পক্ষান্তরে যারা হালাকু খান, চেঙ্গিস খানের ‘আদর্শ-সন্তান’; যে জাতিরা হিটলার, মুসোলিনি, ট্রাম্প ও মুদির মত কুলাঙ্গারদের জন্ম দিয়েছে, একে একে দুটি বিশ্বযুদ্ধ ঘটিয়েছে, সারা বিশ্বব্যাপী মুসলিম নিধনযজ্ঞ চালাচ্ছে; তাদের মুখে মানবাধিকারের বুলি পতিতাদের চক্ষুলজ্জায় মাথা নত হওয়ার মতো কাহিনী। নিজের জীবন কোরবান করে দিয়ে হলেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। আল্লাহ না করুন; আমরা যদি সক্ষম ভাবে এর সফল মোকাবেলা করতে না পারি তাহলে সেটা আমাদের ঈমান ও ইসলামের জন্য এবং আমাদের এ স্বাধীন দেশের জন্য বড় অশনি সংকেত হবে।

লেখক : আবু জোবায়ের, অধ্যয়নরত, হাটহাজারী মাদ্রাসা।

মন্তব্য করুন