ওসি মোয়াজ্জেমের কঠোর শাস্তি হলে শান্তি পাবে নুসরাতের আত্মা: সুমন

প্রকাশিত: ১:০৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০১৯

ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার দায়ে মামলার প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ১৬ খুনির সবার ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। এ রায়কে সাধুবাদ জানিয়ে ফেসবুকে লাইভ করেছেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। তিনি এ রায়কে ‘মাইলফলক’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন,

‘ক্ষমতাসীন সরকারের দুজন প্রভাবশালী লোক আসামী হিসেবে থাকার পরও এমন দ্রুত রায় ঘোষণা করাটা একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে’ সাথে সাথে তিনি এই একই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত তৎকালীন ফেনী থানার ওসি মোয়াজ্জেমের ব্যাপারেও কথা বলেছেন। কারণ ওসি মোয়াজ্জেমের ব্যাপারে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তিনি মামলা করেছেন।

তিনি বলেন, ওসি মোয়াজ্জেমকেও এই একই আসামী তালিকায় রাখলে ভালো হতো এবং তার কঠোর শাস্তি নিশ্চিত হতো। তারপরও তার ব্যাপারে যে মামলা চলমান সেটার রায় খুব শীগ্রই জানা যাবে। ওসি মোয়াজ্জেমের শাস্তি হলে নুসরাতের আত্মা শান্তি পেত বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

এদিকে আজ বৃহস্পতিবার ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ বেলা সোয়া ১১টার দিকে নুসরাত হত্যা মামলার সব আসামির উপস্থিতিতে এ রায় দেন। এর আগে বেলা ১১টা ৭ মিনিটে জনাকীর্ণ আদালতের এজলাসে এসে হাজির হন বিচারক। তিনি সংক্ষিপ্ত রায় পড়েন। রায়ের ফাঁসির পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নুসরাতের পরিবার ও তাঁর আইনজীবী। অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী আপিল করার কথা বলছেন।

এর আগে আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়েছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ফেনী জেলা কারাগার থেকে মামলার ১৬ আসামির সবাইকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পিনপতন নীরবতার মধ্যে বিচারক রায়ের কাজ শুরু করেন।

মামলার রায় শুনতে আদালতে নুসরাতের পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও মামলার আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী ও আসামিদের স্বজনরাও হাজির ছিলেন। আদালত চত্বরে কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও উৎসুক মানুষের ভিড় লক্ষ করা গেছে।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে একটি প্রিজনভ্যানে করে আসামিদের কারাগার থেকে বের করা হয়। ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে তাদের আদালত চত্বরে নিয়ে আসা হয়। প্রিজনভ্যানটিকে মাঝখানে রেখে দুইপাশে ছিল পুলিশের গাড়ি। তারপর হাতকড়া পরা অবস্থায় সারিবদ্ধভাবে সবাইকে প্রিজনভ্যান থেকে নামিয়ে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। কাঠগড়ায় আসামিদের উদ্বিগ্ন দেখা যাচ্ছিল। কামরুন নাহার মনি তার সদ্যজাত সন্তানকে নিয়েই কাঠগড়ায় উপস্থিত হন। রায় পড়ার সময় আসামিরা দোয়া পড়ছিলেন। রায় শোনার পর পরই আসামিরা কাঠগড়ায় কান্নায় ভেঙে পড়েন।

চাঞ্চল্যকর এই রায়েকে ঘিরে ফেনী শহর, আদালত চত্বরে কড়া নিরাপত্তা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নুসরাতের বাড়ি ঘিরেও নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা। এ মামলায় উভয়পক্ষের শুনানি শেষ হয় গত ৩০ সেপ্টেম্বর। তারপরই আদালত রায়ের জন্য দিন নির্ধারণ করেন। মামলার বিচারকাজ শুরুর ৬২ দিনের মধ্যে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা হয়। দ্রুততম সময়ে এই মামলার বিচারকাজ শেষ করা একটি দৃষ্টান্ত বলে উল্লেখ করেছেন আদালত সংশ্লিষ্টরা।

মামলায় সোনাগাজী ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। এসব আসামির সবাই কারাগারে আছেন। আসামিদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের উপজেলা কমিটির সভাপতি, প্রভাবশালী কাউন্সিলর, ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের কর্মী থেকে শুরু করে মাদ্রাসার শিক্ষক, ছাত্রছাত্রীরাও রয়েছেন।

মামলার রায়কে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, তাই ফেনী শহর, আদালত চত্বর ও নুসরাতের বাড়িতে কঠোর নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে বলে সকালে এনটিভি অনলাইনকে বলেন ফেনী পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক সুদীপ্ত রায়।

পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘নুসরাতের বাড়িতে এক সার্কেল পুলিশ নিয়োজিত রয়েছে। অন্যদিকে আদালত চত্বরে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শতাধিক সদস্য। এ ছাড়া জেলা শহরেও র‍্যাবসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। সাদা পোশাকেও বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।’

প্রসঙ্গত, নুসরাত জাহান রাফি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন। ওই মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা তাকে যৌন নিপীড়ন করে বলে অভিযোগ ওঠে। এ ব্যাপারে নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেয়া হচ্ছিল। অভিযোগের ব্যাপারে থানায় নিজের মোবাইলে নুসরাতের জবানবন্দি রেকর্ড করেন তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। সেই জবানবন্দির ভিডিও এরপর তিনি ছড়িয়ে দেন বলে অভিযোগ ওঠে।

পরবর্তীতে ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথমপত্র পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রে যান নুসরাত। এ সময় তাকে কৌশলে একটি বহুতল ভবনে ডেকে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। সেখানে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়া হয়। ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান নুসরাত। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন বাদী হয়ে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করেন।

এরপর গত ৩১ জুলাই নুসরাত হত্যায় ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন মামলার বাদী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। বুধবার বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত বিচারক শেখ নাজমুল হাসান এ সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। এরপর আসামি পক্ষের আইনজীবী ফারুক আহমেদ জেরা শুরু করেন। এদিন জেরা শেষ না হওয়ায় আদালত আগামী ২০ আগস্ট পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন।

আইএ/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন