মাওলানা ফজলুর রহমান: পাকিস্তানে ইসলামী রাজনীতির অনন্য উপমা

প্রকাশিত: ৮:১৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০১৯

প্রাক আলোচনা : জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পাকিস্তানের এক উজ্জল নক্ষত্র হলেন মাওলানা ফজলুর রহমান। পাকিস্তানের রাজনীতিতে তিনি যেই স্বাক্ষর রচনা করেছেন তা এই উপমহাদেশ বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারতের ইসলামী রাজনীতির জন্য এক অনন্য উপমা। হাটি হাটি পা পা করে তিনি রাজনীতিতে এক বিরাট ভূমিকা তৈরি করতে পেরেছেন। তবে মাওলানা ফজলুর রহমান জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পাকিস্তানের হয়ে রাজনীতি করেন। যার সাথে বাংলাদেশের জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সম্পর্ক খুব একটা সামাঞ্জস্যপূর্ণ নয় বরং বাংলাদেশের জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের রাজনীতি নিয়ে ভিন্নভাবে লেখতে হবে কিছু বলতে চাইলে। মাওলানা ফজলুর রহমান বা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পাকিস্তানের রাজনীতি মেলানোটা খুব একটা প্রাসঙ্গিক হবে না।

মাওলানা ফজলুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনসহ একটি বড় লেখা সিলেট মহানগর জমিয়তের স্মারক থেকে আমি সংগ্রহ করেছি। যেহেতু আমার অনুসন্ধানের সাথে এই প্রবন্ধের খুব একটা অমিল নেই তাই অনলাইন পোর্টাল উপযোগী করার জন্য কিছু সম্পাদনার সাথে এই লেখাটিই প্রকাশ করছি।

জন্ম ও শিক্ষা : মাওলানা ফজলুর রহমান ১০ জিলহজ্জ ১৩৭২ হিজরী মোতাবেক ২১শে জুন ১৯৫৩ সালের শুক্রবার পবিত্র ঈদুল আযহার দিন ডেরা ইসমাঈল খান জেলার আব্দুল খয়েল গ্রামে মুফতী মাহমূদ এর গৃহে জন্মগ্রহন করেন। এ সময় তার পিতা মাদরাসায়ে কাসিমুল উলূম মুলতানে মুহতামিম ও শায়খুল হাদীস ছিলেন। তাই তার চাচা খলিফা মুহাম্মদ তার লালন পালন করেন। তিনি স্বীয় ঘরেই পড়াশুনার সূত্রপাত করেন এবং গ্রামের পাঠশালা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। মুলতানে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে ১৯৭৩ সালে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে মেট্রিক পাশ করেন। এরপর দীনি শিক্ষার প্রতি মনোনিবেশ করেন। তিনি মাওলানা কারী মুহাম্মদ মুলতান এর কাছে কেরাত মশক করেন। এছাড়া দারুল উলূম হক্কানিয়া আকুড়াখটক মাদরাসায় অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে পড়াশুনা করেন।

শিক্ষকতা জীবন ও দীনের খেদমত : ১৯৭৯ জামেয়া হক্কানিয়া আকুড়াখটক থেকে ফারেগ হয়ে জামেয়া কাসিমুল উলূম মুলতানে শিক্ষকতা শুরু করেন। এক বৎসর শিক্ষকতা ও দারুল ইফতার নায়েবের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় তার পিতা মুফতী মাহমূদ রাহ. ১৯৮০ সালের ১৪ অক্টোবর হজ্জের সফরে য়াওয়ার পথে করাচিতে ইন্তেকাল করেন। এরপর থেকে স্বীয় পিতার মিশন বাস্তবায়নে তিনি আত্মনিয়োগ করেন। তার পিতার জানাজার নামাজের পূর্বে লাখো জনতার সামনে পিতার স্থলাভিষিক্তভাবে খানকায়ে ইয়াসীন জয়ের গদীনশীন পীর হযরত শায়খ সায়্যিদ আহমদ সাহেব মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেবকে দস্তারে ফযিলত প্রদান করেন। অতঃপর দারুল উলূম হক্কানিয়া আকুড়াখটকে তার শিক্ষকদের সাথে দেখা করতে আসেন। যখন তিনি হযরত মাওলানা আবদুল হক হক্কানী সাহেবের ঘৃহে উপস্থিত হন, তখন মাওলানা ফজলুর রহমান হযরতকে আরজ করেন যে, হুজুর আপনি ও অন্যান্য আসাতিজায়ে কেরাম হাদিসের সনদ দিয়েছেন, কিন্তু দসতারে ফযিলত তো দেননি। তখন সাথে সাথে নিজের মাথার পাগড়ি খুলে দিয়ে বলেন, আমি আমার মাথার পাগড়ি দ্বারা তোমার দস্তারবন্দী করে দিলাম।

এরপর ২০০১ সালে দারুল উলূম দেওবন্দের মুহতামিম প্রধান পৃষ্টপোষক মাওলানা সায়্যিদ আসআদ মাদানী রাহ. মাওলানা মরগুবুর রহমান রাহ. ও নায়বে মুহতামিম মাওলানা কারী উসমান সাহেব তার দস্তারবন্দী করেন। এছাড়া হযরত শায়খুল হাদীস জাকারিয়া রাহ.ও তাকে এক হাদীসের মতন পড়িয়ে সনদ প্রদান করেন। তিনি বিখ্যাত বুর্জুর্গ শায়খ সায়্যিদ আহমদ সাহেবের হাতে বাইআত গ্রহন করে ২ মাস লাগাতার তার খিদমতে থেকে রিয়াজত ও মুজাহাদা করেন। যার ফলে তিনি তাকে ইজাযত পদান করেন। অতঃপর শায়খুল হাদীস জাকারিয়া রাহ. এর খলীফা শহীদ মাওলানা ইউসুফ লুধিয়ানভী রাহ. তাকে আরাফার ময়দানে চার তরীকার ইজাযত প্রদান করেন।

রাজনীতির সূচনা : ১৯৭৯ ঈসায়ী ৯ নভেম্বর করাচির খালিকে দুনিয়া হলে মাওলানা ফজলুর প্রথম রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান করেন। এই বক্তব্যে তিনি তৎকালিন সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউল হকের রাস্ট্রপ্রধান পদে থাকা নিয়ে চ্যালেঞ্জ করেন। তার অনলবর্ষী বক্তব্যে আভিভূত হয়ে পাকিস্তানের গণতন্ত্রেরে পিতা নবাবজাদা নসরুললাহ খান অগত্যা বলে উঠেন – “থামো, এই ভূমি বড়ই উর্ভর”। পাকিস্তানে অচীরেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে। এসময় নবাবজাদা গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য এম আর ডি গঠন করেন। মাওলানা ফজলুর রহমান এ আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে যান। এরপর থেকেই তার জেলে যাওয়া আসা শুরু হয়ে যায়। ১৯৮১ সালে তিনি যখন জেনারেল জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে কারাবন্ধী হন তখন তাকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব নির্বাচন করা হয়। তাকে দেখতে গিয়ে এক জমিয়ত নেতা যখন বলেছিলেন যে, আজ থেকে আপনি জমিয়তের মহাসচিব। তখন ২৭ বছরের টগবগে যুবক এ দায়িত্বের মর্ম উপলব্দি করে দুচোখ বন্ধ করে দেন এবং বলে উঠেন যে, এই মহান দলের ভার কাঁধে নিতে হলে যে সামর্থের প্রয়োজন তা তো আমার কাছে নেই। কেননা, এখনো আমার পিতৃবিয়োগের শোক বিদূরিত হয়নি। তখন অন্যান্য নেতাদের প্রেরণা তাকে উৎসাহ প্রদান করে। যার ফলে তার উপর পাহাড় সম বিপদ আসলেও তিনি এর কোন তোয়াক্কা করেন নি। ১৯৯৫ সালের ২৮ মার্চ জামেয়া মাদানিয়া করিমপার্কে ৩২৫ সদস্যের ৯০% এর মতামতের ভিত্তিতে জমিয়ত সভাপতি হাফিজুল হাদীস আল্লামা আবদুল্লাহ দরখাস্তি রাহ. এর ইন্তেকালের পর তাকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।

কারাবরণ ও বিরোধীতা : অনুসন্ধান মতে মাওলানা ফজলুর রহমান রাজনৈতিক মামলায় মোট ১০ বার কারাবরণ করেন। আর বিরুদ্ধে সীমাহীন প্রোপাগান্ডা চলছে। ইন্টারনেটে তার নামে অসংখ্য ভিডিও অডিও ভাইরাল করা হয়েছে। আর ফেইসবুকের কথা তো সবারই জানা। মূলত একজন নিরেট ইসলামী ব্যাক্তিত্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করছে এ বিষয়টি অনেকেই মেনে নিতে পারেনি যে কারণে তাকে নিয়ে প্রোপাগান্ডা এবং মিথ্যাচার খুব বেশি হয়েছে বলেই ধারণা অনেকের। কিন্তু এতে মাওলানার কর্মকান্ডে কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি বরং তিনি তার স্বীয় যোগ্যতায় পাকিস্তানের রাজনীতিতে নাম তৈরি করতে পেরেছেন।

জাতীয় নেতৃত্বে মাওলানা : মাওলানা ফজলুর রহমান ১৯৮৫ সালে পাকিস্তানের নির্দলীয় ভোট প্রত্যাখান করেন। ১৯৮৮ সনের নির্বাচনের পরে বেনজীর ভূট্টো সেনা শাসনকে দাবিয়ে রাখার জন্য গোলাম ইসহাক খানকে রাস্ট্রপতি মেনে নিলেন। তিনি রাস্ট্রপতিকে স্বপদে বহাল রাখার পরিবর্তে খান আব্দুল ওয়ালী খানকে সাথে নিয়ে নবাবজাদা নসরুল্লাহ খানকে রাস্ট্রপতি পদে দাঁড় করিয়ে দিলেন। ১৯৯৩ সনে বেনজীর ভূট্টো দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হলে মাওলানা ফজলুর রহমান জাতীয় সংসদের পররাস্ট্র বিষয়ক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। (এ সময় আফগানিস্থানে তালেবানের জন্ম হয়ে গিয়েছিল। এবং তিনি তাদের মূখপাত্র ছিলেন।) তাই রাস্ট্রপতি তার উপর ডিজেল থেকে অংশীদারিত্ব নেয়ার অভিযোগ উত্থাপন করে। এরই সূত্র ধরে তার শত্র“রি তাকে ডিজেল মাওলানা বলতে থাকে। কিন্তু ১৯৯৬ সনে যখন বেনজীর ক্ষমতাচ্যুত হন, তখন নওয়াজ শরীফের তদন্ত ব্যুরো সর্বশক্তি নিয়োগ করেও তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উত্থাপন করতে পারেনি।

ইতিপূর্বে পাকিস্তানে ইসলামী অনেক দল ছিল কিন্তু তা কোন জাতীয় শক্তির রূপ ধারণ করতে পারেনি। মাওলানা ফজলুর রহমান ২০০২ সালে সকল ইসলামী দল নিয়ে “মুত্তাহিদা মজলিসে আমল বা এম. এম. এ.” নামে একটি জোট গঠন করেন। যার সভাপতি ছিলেন বেরেলভীপন্থি মাওলানা শাহ আহমদ নূরানী এবং সেক্রেটারী বা মূথপাত্র ছিলেন তিনি নিজে। এতে মওদুদী, শিয়াসহ সকল মত ও পথের লোকেরা তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং এম এম এর ৭২ টি সীট কেন্দ্রীয় ও প্রাদশিক পরিষদে জয়লাভ করে।

২০১৮ সালের ২৫ জুলাই পাকিস্তানের ১১ তম জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে দাবি করে মাওলানা ফজলুর রহমানের সম্মিলিত জোট মজলিসে মুত্তাহাদা আমেলা ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। এরপর তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন এবং ইমরান খান সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন প্রতিবাদে নামেন। তিনি কাশ্মীর ইস্যূতে ভারতের অবস্থানের কঠোর বিরোধিতা করার সাথে সাথে ইমরান খানেরও বিরোধিতায় নামেন এবং ইমরান খান সরকারকে হঠাতে জোড়ালো আন্দোলন শুরু করেছেন। পাকিস্তানের সকল বিরোধী দলকে একত্রিত করে তিনি এখনও সে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও ইমরান খান তার সাথে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন কিন্তু তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইমরান খানের পদত্যাগের আগ পর্যন্ত কোন আলোচনা হবে না।

মাওলানার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র : ২০০২ এর জাতীয় নির্বাচনে পারভেজ মুশাররফ সরকার সীমাহীন কারচুপি করে। মুসলিম লীগ (কায়েদে আজম) নামে একটি দল গঠন করে মুত্তাহিদা কাওমী মুভমেন্ট কে সাথে নেয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্য জোগাড় করতে পারেননি। নওয়াজ শরীফ এবং বেনজীর ভূট্টো তখন নির্বাসনে ছিলেন। মুসলিম লীগ (নেওয়াজে শরীফ) এর নেতৃত্ব জাবেদ হাশিমীর হাতে ছিল। আসিফ আলী জারদারী কারাগারে ছিলেন এবং পিপিপির বাঘডোর আসিফ আলী জারদারীর হাতে ছিল। তিনি জেলে বসে নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান ও নবাবজাদা আকবর বকটিকে সাথে নিয়ে মাওলানা ফজলুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। রাতে সর্বদলীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো- (১) পিপিপি মুসলিম লীগ (নেওয়াজ) এম এম এ, জমহুরী ওয়াতান র্পাটি মিলে মাওলানা ফজলুর রহমান কে প্রধানমন্ত্রী বানাবেন। (২) সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশে কোয়ালিশন সরকার হবে। বেনজীর সরকার গঠনের সাথে সাথে পেশোয়ার অথবা করাচি আসবেন। এবং (৩) মাওলানা ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সব মামলা খারিজ করে দেয়া হবে।

এ খবর রাতেই আমেরিকান এম্বেসেডরের কাছে পৌঁছে যায়, সাথে সাথে সে একদিকে বেনজীর ভুট্টোকে রুখে দিল। অন্য দিকে মাওলানা ফজলুর রহমান যাতে প্রধানমন্ত্রী হতে না পারেন, সেজন্য মোশাররফের উপর চাপ সৃষ্টি করতে লাগলো। যার ফলে মাওলানার প্রধানমন্ত্রী হবার পথ চতুর্দিক থেকে বন্ধ হয়ে গেল এবং মখদূম আমীন ফাহিমকে প্রধানমন্ত্রী বানানো হলো। এক ভোটের ব্যবধানে মাওলানা প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন না। অবশেষে মাওলানা বিরোধী দলীয় প্রধান হলেন এবং একসাথে সরকারী দলে ও বিরোধী দলের স্বাদ গ্রহন করতে লাগলেন। জমিয়ত কেন্দ্রীয় সরকারে বিরোধী দলে আর সীমান্ত ও বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকারে সরকারী দলে কাজ করলো। এজেন্সিদের পক্ষ থেকে প্রতারণার পরও মাওলানা ফজলুর রহমান কোন সময় আইন ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি। কোন সময় তার বিরুদ্ধে মুসররত শাহীনকে উত্তেজিত করা হলো, কোন সময় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অনুসন্ধান করা হয়েছে। স্থিরবুদ্ধিতা ও গাম্বীর্যের সাথে সাথে বীরত্ব দেখানো মাওলানা ফজলুর রহমানের বৈশিষ্ট্য। তিনি বুদ্ধিভিত্তিক সর্বপ্রকার দূরভিসন্ধির দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে থাকেন। আত্বঘাতি হামলাও তাকে দূর্বল করতে পারেনি। শারিরিক অসুস্থতা হলে তা চিকিৎসা দ্বারা উপশম করাতেন আর রাজনৈতিক কোন সমস্যা এলে সরাসরি হারামাইন শরীফাইনে চলে যেতেন।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভরসার যায়গা : জাতীয় নেতাগণ যেখানে কোন রাস্তা পাননা সেখানে তারা মাওলানা দারস্থ হন। অনেক কম লোক জানেন যে, ২০১১ সালে আসিফ আলী জারদারীকে চিকিৎসার জন্য দিল্লি প্রেরক মাওলান ফজলুর রহমান। এসময় অনেক সাংবাদিক বলাবলি করতে থাকেন যে জারদারী সাহেব পালিয়ে গেছেন আর আসবেন না। কেউ কেউ বলেন তিনি নির্বাসিত হয়েছেন। অবশেষে তিনি যখন দেশে ফিরে আসেন তখন এই নাজুক পরিস্থিতিতে তার পাশে দাড়িয়ে সর্বপ্রকার প্রতিবন্ধকতা দূর করিয়ে দেন মাওলানা ফজলুর রহমান। আসিফ আলী জারদারী ছাড়াও চৌধুরী সুজাআত, ইসকান্দার ইয়ার ওয়ালীদের সাথে ও মাওলানার ঘনিষ্ট বন্ধুত্ব রয়েছে। তিনি কাশ্মীর বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের চেয়ারম্যন থাকা অবস্থায় বার বার মনমোহন সিং সরকারের সাথে বৈঠক করে কাশ্মীর বিষয়ক অনেক সমস্যা সমাধান করেন।

দূরদর্শী রাজনীতিবিদ : তিনি বিগত নির্বাচনের পূর্বে নওয়াজ শরীফের সাথে বৈঠক করে পরবর্তী সরকার যৌথভাবে করার বিষয়টি পাকাপোক্ত করে নেন। কিন্তু নির্বাচনে আসন কম পাওয়ার দরুন সরকার তাকে সাথে না নিয়ে ইমরান খানকে সাথে নেয়। অন্য দিকে জামাতে ইসলামী তার বিরুদ্ধে ইমরান খানের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু স্বার্থপরদের বন্ধুত্ব বেশি দিন ঠিকে নাই। ইমরান খানের সাথে নওয়াজ সরকারের রফা দফা হয়ে যায়। এসময় নেওয়াজ শরীফ মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেবের আশ্রয় নেন। তার দলে বিরোধী দলীয় প্রধানের পদ দান করেন। তিনি তার দলেন মহাসচিব আব্দুল গফুর হায়দরীকে বিরোধী দলীয় প্রধান বানান। অতঃপর নিজে কাশ্মীর বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের চেয়ারম্যান হন। আকরাম খান দূরানীকে অন্য একটি মন্ত্রণালয় দেন। এর কিছুদিন পর মাওলানা আবদুর গফুর হায়দরীকে স্বরাস্ট্রমন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এসময় তাকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিল যে, আপনার দলকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বরাস্ট্রমন্ত্রনালয় দেয়া হল কিন্তু আপনি তা নিজে না নিজে আপনার মহাসচিবকে দিয়ে দিলেন। এর কারণ কী? জবারে মাওলানা বলেছিলেন “কিছকী কিয়াদত মে ওজারতি করোঁ উনকো মায়ঁ পাহচানতা নেহ।

কিছুদিন পর সিনেটের সভাপতি ও সহ-সভাপতি নির্বাচনের পালা আসে। তখন তিনি নেওয়াজ শরীফ ও আসিফ আলী জারদারীকে এক বৈঠকে নিয়ে বসেন। পত্রিকার ছবি যারা দেখেছেন তারা অবশ্যই মাওলানার পরিচয় পেয়েছেন। মঞ্চে তিনটি চেয়ার। ডানের চেয়ারে প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরীফ, মধ্যখানে মাওলানা আর বামপাশের চেয়ারে আসিফ আলী জারদারী। পাকিস্তানের ইতিহাসে এমন কুটনৈতিক মাপের রাজনীতি অতীতে কেউ দেখাতে পারেনি। ফলে মাত্র ৫টি সিনেট ভোট নিয়ে ৭ ভোট ওয়ালা পিটিকে হারিয়ে উভয় দলের ভোটে তার মহাসচিব ফখরে জমিয়ত মাওলানা আব্দুল গফুর হায়দরী সিনেটের ভাইস চেয়াম্যান নির্বাচিত করিয়ে আনেন।

অসাধারণ কুটনৈতিকতা : ভারত ও চীন সীমান্তে যখন টান টান অবস্থা বিরাজ করছিল। তখন বিশ্বের সেরা শক্তিধর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বরাক ওবামা এশিয়ান কুটচালে ভারত এসে ভারতের খাসিয়া জৈন্তা পাহাড় থেকে সরাসরি হাইওয়ে মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের যাবতীয় ব্যবস্থাপনা করে যান। পরের সপ্তাহে মাওলানা ফজলুর রহমান অপর পরাশক্তি চীন সফর করে তিব্বত থেকে পাকিস্তানের ভিতর দিয়ে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত হাইওয়ে নির্মাণের কাজ শুরু করে আসেন এবং সীমান্ত প্রদেশে নেওয়াজ শরীফকে দিয়ে কাজের উদ্বোধন করান। যার ফলে পরের সপ্তাহে বারাক ওরামা পাকিস্তান ও চীন সফর করে তার কাজের ফলে সৃষ্ট দূরত্বকে কমিয়ে আনার পদক্ষপে নেন।

সফর ও সম্মাননা : মাওলানা ফজলুর রহমান পৃথিবীর কয়েকশত দেশ সফর করেছেন। এবং অনেক দেশ থেকে রাস্ট্রীয় সম্মাননা ও পেয়েছেন। বাংলাদেশে নব্বই এর দশকে প্রথম সফর করেন। ২য় দফা ২০০০ সালে জামিয়া মাদানিয়া আংগুরা মুহাম্মপুরের ১০ সালা দস্তারবন্দী সম্মেলনে, ৩য় দফা ২০০৫ সালে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় সম্মেলনে, ৪র্থ দফা ২০১০ সালে জামিয়া মাদানিয়া আংগুরা মুহাম্মপুরের ৫০ বর্ষপূতী ও দস্তারবন্দী সম্মেলনে এবং সর্বশেষ আযাদ দ্বীনী এদারায়ে তালীম বাংলাদেশের দস্তাারবন্দী সম্মেলনে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন।

অন্যদের দৃষ্টিতে মাওলানা : প্রতিভাধর কলামিস্ট জনাব হামিদ মীর তার এক সম্পাদকীয় কলামে লিখেন, অসংখ্য যুবক আমাকে জিজ্ঞেস করেন যে, পাকিস্তানে সর্বপেক্ষ প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ কে? আমি সাধারণতঃ এমন প্রশ্ন এড়িয়ে চলি। কিন্তু কিছু নাছোড়বান্দা যখন আমাকে সাপের ন্যায় পেচিয়ে ফেলে, তখন অনায়াসে তাদের জবাবে মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, মাওলানা ফজলুর রহমান। মজার কথা হলো, কেউ কেউ এ জবাব শুনে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যান, আবার কেউ কেউ অগ্নির্শমা হয়ে বলে দেন যে, তাহলে তাকে ‘ডিজেল মাওলানা’ বলা হয় কেন? আমি সচরাচর এর জবাব এভাবে দেই যে, তাকে ডিজেল মাওলানা খেতাবদাতা জনাব আতাউল হক কাসেমী ও একথা অকপটে স্বীকার করতে বাধ্য যে, মাওলানা ফজলুর রহমান পাকিস্তানের ধীমান রাজনীতিবিদের প্রথম সারির একজন। হমিদ মীর আরো লিখেন- আমার সাথে মাওলানা ফজলুর রহমানের বন্ধুত্ব অনেক পুরাতন। কিন্তু কোন কোন সময় আমার সাংবাদিকতার বেআদবী মাওলানাকে ক্ষেপিয়ে তুলে। আমাকে তার রাগের স্বাধ ও সাময়িকভাবে আস্বাধন করতে হয়। বয়সে বড় হবার পরও তিনি আমাকে বন্ধুর দৃষ্টিতে দেখে থাকেন। মাওলানা ফজলুর রহমান তার র্বণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে প্রায় ১০০% সফল। তবুও তার পেছনে অনেকের কানাকানি ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতে যে থাকবে না তা বলা যায় না। কিন্ত দ্যার্থহীনভাবে বলতে হয়, তিনি মহান পিতার যোগ্য সন্তান। একটি মধ্যবিত্ত দ্বীনদার ফ্যামেলিতে বেড়ে ওঠা বিলিয়নার মাওলানা নিজের দ্বীনদারী থেকে একটুও পিছপা হননি। তিনি তার পিতা উলামায়ে দেওবন্দের স্বার্থক উত্তরসুরী, সীমান্ত প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মুফতী মাহমুদ রাহ. এর দ্বীনি ও রাজনৈতিক উত্তরসুরী। পিতা ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী আর পুত্র হলেন কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধী দলীয় প্রধান। যদি আমেরিকার কারসাজি না হত, তাহলে তিনি ২০০২ সালে হতেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তার স্মরণ শক্তি ও দূরদর্শিতার পর্যালোচনা করতে গিয়ে গোটা পশ্চিমাদের প্রতিনিধিত্বকারী বিবিসি তার রির্পোটে বলেছে যে, মাওলানা একসাথে পাঁচটি কাজ সমাধা করতে পারদর্শী। ২০০৫ সালের এশিয়ান সার্ভে রিপোর্টে মাওলানাকে এশিয়ার ৫ ম ও বিশ্বের উনিশতম ধীমান রাজনীতিবিদ নির্ধারণ করেছে। পাকিস্তাসের কলমবাজ লেখক হামিদ মীর ‘‘জহীন তরীন সিয়াসতদান” উপাধি দিয়ে মাওলানাকে ভূষিত করেন এবং বলেন যদি আল্লাহ মাওলানাকে জীবিত রাখেন তাহলে ভবিষ্যতে দুনিয়াবাসী মাওলানার আরো কত কেরেশমা দেখবে।

মাওলানাকে ‘ডিজেল মাওলানা’ খেতাবদাতা সাংবাদিক আতাউল হক কাসেমী বলেন, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতায় মাওলানা ফজলুর রহমানের কোন জুড়ি নেই। তিনি ডিপ্লোমেটিক ব্যবহারে দারাজ হাতের মালিক। আমার বিশ্বাস তিনি যদি কোন ধর্মীয় নেতা না হতেন তাহলে গোটা পাকিস্তান তার পিছে পিছে দৌড়াত। প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হওয়া তার জন্য কোন কঠিন কাজ ছিল না। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পাকিস্তানের সভাপতি মাওলানা ফজলুর রহমান একজন সফল ও প্রতিভাবান নেতা। বর্তমান বিশ্বে তার মত ইসলামী রাজনীতিতে সফল ব্যক্তি পাওয়া দুস্কর। প্রত্যেক রাজনৈতিক তার জীবনী অধ্যয়ন করা জরুরী। তার জীবনীর উপর আমার জানামতে ১০টি থেকে বেশি ছোট বড় বই লিখা হয়ে গেছে বিভিন্ন ভাষায়। তার জীবনী নিয়ে উচ্চতর গবেষণা ও চলছে ভার্সিটিতে। আল্লাহ পাক তাকে দীর্ঘজীবি করুন।

তথ্যসূত্র: ১. মাওলানা ফজলুর রহমান শাখসিয়াত ও কিরদার। ২. কায়িদীনে জমিয়ত। ৩. নুজামায়ে জমিয়ত। ৪. জমিয়তে উলামা কি সো সালা তারিখ জিদ্দ ও জহদ। ৫. আল জমিয়ত। ৬. রুজনামায়ে জং। ৭. জং সম্পাদকীয় – হামীদ মীর। ৮. ফেইসবুক, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম অফিসিয়াল পেইজ। ১০. পি এস. রাজনৈতিক সচিব, মুফতী আবরার। ১১. প্রেস সচিব, মালাক রিয়াজ খান।

মন্তব্য করুন