বিশ্ববিদ‌্যালয়গুলো আমাদের কী শেখায় ?

প্রকাশিত: ৪:২২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২, ২০১৯

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার

কতটা দুর্ভাগা হলে দেশের উচ্চশিক্ষায় সেরা ১৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনকে তদন্তে নামতে হয়। জীবনকে চিনতে শেখার স্থান এই বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা জীবনে যত যা কিছু শিখেছি তার অধিকাংশই এই ক্যাম্পাসে গিয়ে। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে ১০০ এর মধ্যে আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। কিন্তু এগুলো স্থানীয়ভাবে অভিযুক্ত হয়েছে দুর্নীতির ভাগাড় হিসেবে।

বহুকাল ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে ভর্তি বাণিজ্য, প্রশ্নফাঁস, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ইত্যাদির অভিযোগ আসছিলো। গত কয়েক বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তো আলোচনার অন্ত নেই। অথচ কোনদিন সেসব অভিযোগ আমলে নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি কেউ। ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক প্রতিষ্ঠান হয়েও অবহেলা করে গেছে দিনের পর দিন। টনক নড়ল যখন জাহাঙ্গীরনগর এবং গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে গোটা দেশ কেঁপে উঠল তখন।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ভূমিকা, সেটিকে সমুন্নত রাখার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই হতে পারে উপযুক্ত উপায়। ভিসি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি।

একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ হয় তিনি চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ ব্যবসার সাথে জড়িত, তখন নৈতিক অবস্থান থেকেই তাদের সরে যাওয়া উচিৎ ছিল। তেমনটা আশা করা অবশ্য বোকাদেরকেই মানায়। আমাদের দেশে কেউ ক্ষমতা একবার পেলে তার নামে শত অভিযোগ থাকলেও পদ ছাড়ার নাম নেয়ার নজির নেই।

একজন ভিসি মানে সেই প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তি, যার উপর মূল দায়িত্ব থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অ্যাকাডেমিক ইস্যুকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করার। সময় মতো অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ক্লাস, পরীক্ষা সমাপ্ত করা, সেশন চালু রাখা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রেখে সকলের জন্য স্থিতিশীল ও সহাবস্থান নিশ্চিত করা।

তার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান ঠিক রেখে গবেষণা ও উন্নয়নকর্ম পরিচালনার নেতৃত্ব দেয়া। অথচ কী ঘটছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে? এই প্রশ্নের উত্তর এই লেখাতেই রয়েছে। অবাক নয়, লজ্জায় নত হই যখন জানতে পারি, যাদেরকে আমরা শিক্ষক বলে সম্মান করে এসেছি এতকাল, সেই তাদেরকেই আজকে আসামির কাঠগড়ায় দেখছি। তাহলে কী শিখালেন তারা আমাদের, আর নিজেরাই বা কী শিখেছেন? বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, সত্যিই কি আমরা ক্যাম্পাসগুলোতে মানুষ হবার জন্য আসি?

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির চাকা তরতর করে উপরের দিকে ধাবিত হচ্ছে। গোটা বিশ্বের আকর্ষণ এখন বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার কাজের যোগ্যতার স্বীকৃতিও পাচ্ছেন নানা স্বীকৃতির মাধ‌্যমে। এমডিজি, এসডিজি অর্জনের খাতায় আমাদের দেশ রয়েছে শীর্ষ অবস্থানে।

আমাদের সেনাবাহিনী শান্তি রক্ষায় সুনামের সাথে লড়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। অথচ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছে দিনের পর দিন। নেই কোনো আধুনিকতার ছোঁয়া, নেই গবেষণা বা সৃষ্টির নজির। মেধাবীরা কেন আজকে দেশবিমুখ, এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই যাদের, তারাই আজকে সংবাদে শিরোনাম।

আজকে যদি শিরোনাম হতো দেশের ১৪ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি দিয়েছে কেউ। বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি বিউটি পার্লার চালান এবং এর হিসাব নিকাশও নিজেই সামলান। যে ভিসির মাথায় বিউটি পার্লারের উন্নয়নের চিন্তা, সেই ভিসি কেমন করে প্রতিষ্ঠানের বিউটিফিকেশন নিয়ে কাজ করবেন?

অভিযোগ এসেছে তিনি তার পরিবারের একজনকে সেকশন অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে নিয়ম ভঙ্গ করে অযোগ্য একজনকে কেবল শিক্ষকই নয়, বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব দিয়েছেন। তাহলে এখানে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন রাখাই যায়, ইউজিসি এতদিন কী করেছিলো? কেন তারা আগে থেকেই বিশবিদ্যালয়গুলোতে কোথায় কে কী করছে তার খোঁজ রাখে না? তাদের কি কোনো মনিটরিং সেল নেই? নাকি তারাও সেসব দুর্নীতির অংশীদার হয়ে যাচ্ছে? আজকাল আর ভরসা রাখার মতো কোনো জায়গা যেন থাকছে না।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া সাধারণ মানুষের সন্তানদের পড়াশুনার আর কোনো জায়গা নেই। প্রাইভেট তো অনেকের হাতের নাগালের বাইরে। ক‌্যাম্পাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মাঝে রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকতেই পারে। কিন্তু সেই রাজনীতি হতে হবে সামগ্রিকতার বিচারে। সেই রাজনীতির সর্বাগ্রে থাকবে দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠা ও ভালোবাসা। কিন্তু আজ দায়িত্ব যেন ভর করে আছে রাজনীতির উপর। কেমন করে নিজের পদকে টিকিয়ে রাখা যায় এবং পদ টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করা দরকার তার সবই করছে কেবল আসল দায়িত্বটিকে বাদ দিয়ে।

ক্ষমতা একবার পেলেই ধরে নিচ্ছে সেটি তার পারিবারিক সম্পত্তি। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও সম্পত্তিকে ব্যবহার করে পারিবারিক উন্নয়নের যে গুরু দায়িত্ব নিয়েছেন আমাদের ভিসিরা, সেখান থেকে বের হতে গেলে চলমান তদন্তটি হওয়া উচিত অত্যন্ত কঠিন ও শক্তভাবে। জাহাঙ্গীরনগরের ভিসির বিরুদ্ধে কেবল টাকা লেনদেনের অভিযোগই নয়, এসেছে তার স্বামী ও সন্তানকে অবৈধভাবে ক্ষমতায়নের অভিযোগ।

এখন অবিলম্বে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও বাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করতে না পারলে দেশের মেরুদণ্ডের বাকিটাও খসে পড়বে।

লেখক: শিক্ষার্থী, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্র বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ‌্যালয়।

মন্তব্য করুন