অর্থ না বুঝে কোরআন পাঠ করলে কি সওয়াব হবে?

প্রকাশিত: ১২:৩৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৯
প্রতীকী ছবি

হেরা থেকে উৎসারিত বিশ্বব্যাপী আলোকোজ্জ্বল এক দীপ্তিময় আলোকবর্তিকা হলো আল কোরআন, যা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশীগ্রন্থ। বিশ্বমানবতার চিরন্তন মুক্তির সনদ এবং অনন্য বিধানগ্রন্থ আল কোরআন, যার অধ্যয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে রয়েছে মানবজাতির কল্যাণ ও সফলতা। ইসলামী মূলনীতির প্রথম ও প্রধান উৎস হলো আল কোরআন। যার সফল ও সার্থক বাস্তবায়ন ঘটেছে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব নবী করিম (সা.)-এর মাধ্যমে। নবুয়তের ২৩ বছর জীবনব্যাপী যুগোপযোগী প্রেক্ষাপটের ক্রমধারায় তাঁর ওপর অবতীর্ণ হয় এই মহান ঐশীগ্রন্থ। তিনি ছিলেন আল কোরআনের বাস্তব নমুনা।

কোরআন শরিফ না বুঝে পড়লেও লাভ রয়েছে

অনেকে প্রশ্ন করে থাকেন, মক্তবে বাচ্চাদের তোতাপাখির মতো কোরআন মুখস্থ করানো হয়। তারা অর্থ ও ব্যাখ্যা না বুঝলে তাদের কী ফায়দা হবে? অথবা অনেকে মনে করেন কোরআন না বুঝলে পাঠ করে লাভ নেই। কোরআনের আয়াত দ্বারা এ ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যখন তাদের সামনে কোরআন পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায়। (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২) কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। একেকটি অক্ষর পাঠ করলে দশ-দশটি নেকি পাওয়া যায়। এ সওয়াব পাওয়ার জন্য অর্থ বোঝার শর্ত হাদিসে উল্লেখ নেই। হজরত উসমান (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কোরআনের একটি হরফ পড়বে, সে একটি নেকি পাবে, আর প্রতিটি নেকি দশ গুণ করে বৃদ্ধি করে দেওয়া হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৯১০)

আর কোরআনের অর্থ বোঝার জন্য কোরআনের আয়াতগুলো সঠিকভাবে উচ্চারণ করা ও পড়া প্রথম শর্ত। কেউ সহিহশুদ্ধভাবে কোরআন তিলাওয়াত করতে না পারলে সে কী করে কোরআন বুঝবে? তা ছাড়া কোরআনের তিলাওয়াত হচ্ছে পৃথক একটি উদ্দেশ্য। তাই কেউ এ কথা মনে করা ভুল যে কোরআন পাঠ শেখা ও শেখানো বৃথা। নাউজুবিল্লাহ।

হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এ ব্যাপারে সুন্দর কথা বলেছেন। তিনি বলেন—‘এক. যারা শুধু অর্থের গুরুত্বারোপ করতে গিয়ে তিলাওয়াতের গুরুত্ব উপেক্ষা করেছে, তাদের অনুধাবন করা উচিত, অর্থ বোঝা শব্দ পাঠের অনুগামী। প্রথম হলো শব্দের জ্ঞান। আর নীতি হলো, প্রয়োজনীয় বিষয়ের সূচনাও প্রয়োজনীয় হয়ে থাকে। তাই ‘শাব্দিক তিলাওয়াত লাভহীন’। এ ধারণা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

দুই. কোরআন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শব্দাবলির হিফাজতের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই অর্থ ছাড়া শব্দাবলিও হিফাজত করা আবশ্যক। আল্লাহ না করুন, কোনো জালিম সরকার লিখিত সব কোরআন জ্বালিয়ে দিলেও একজন হাফিজে কোরআন তার স্মরণে রক্ষিত কোরআন দ্বারা আবার লিখতে পারবে। এ ক্ষেত্রে ছোট একজন হাফিজ শিশুই যথেষ্ট। বড়দেরও প্রয়োজন নেই। এখন কোরআন পাঠ শেখানোর প্রচলন বন্ধ করে দিলে পরিণামে দুনিয়া থেকে হাফিজে কোরআনের ধারা বন্ধ হয়ে যাবে।

তিন. রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরআনের শব্দের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব দিতেন। তিনি শব্দের প্রতি এত বেশি গুরুত্ব দিতেন যে ওহি অবতরণকালে জিবরাঈল (আ.)-এর সঙ্গে দ্রুত আবৃত্তি করতেন। অথচ তাঁর স্মরণশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল। এ থেকে তাঁর শব্দের প্রতি অসাধারণ আগ্রহ অনুধাবন করা যায়।

এ ছাড়া রাসুল (সা.)-এর শব্দের প্রতি এত ব্যাকুল হওয়ার আরেকটি প্রমাণ হলো, তিনি নিজে তিলাওয়াতের পাশাপাশি অন্যের তিলাওয়াতও শুনতেন। একবার ইবনে মাসউদ (রা.)-কে বললেন, আমাকে কোরআন শোনাও। ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, আমি আপনাকে শোনাব! অথচ আপনার ওপরই কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে? নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমি অন্যের কাছ থেকে কোরআন শুনতে ভালোবাসি।’ (বুখারি, হাদিস : ৫০৪৯)

চার. কোরআনের শব্দাবলি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রথম ধাপ। তাঁর পক্ষ থেকে প্রথমত, শব্দাবলিই এসেছে, তারপর অর্থ এসেছে শব্দের অনুগামী হয়ে। এ সূত্রেই শব্দাবলি যদি দুর্বোধ্য ভাষায়ও অবতীর্ণ হতো, তবুও সেটাই যথেষ্ট হতো। প্রিয়জনকে খাবারের কিছু দেওয়া হলে তাতে দুটি আকর্ষণীয় বস্তু থাকে। একটি প্রেমাস্পদের হাতের ছোঁয়ার স্বাদ, অপরটি ভক্ষণের স্বাদ। প্রেমের রীতি অনুসারে প্রিয়জনের হাতের ছোঁয়াযুক্ত বস্তু নাগালে পাওয়াটাই আনন্দের একটি উপলক্ষ। অনেক সময় প্রিয়জনের স্পর্শমাখা বস্তুটি ব্যবহার না করে স্মৃতিস্বরূপ রেখে দেওয়া হয়। অতএব, আল্লাহপ্রেমিকদের আনন্দের উপলক্ষ হওয়ার জন্য কোরআনের শব্দাবলিই যথেষ্ট ছিল। সুতরাং অর্থের স্বাদ উপভোগের ছুতা দিয়ে শব্দের স্বাদ পরিত্যাগ করা অযৌক্তিক। (দেখুন : তালিমুল কোরআন, পৃষ্ঠা : ৪-৫)

ওই আলোচনায় স্পষ্ট হলো যে কোরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত এমনই এক শক্তি, যা যেকোনো মানুষকেই প্রভাবিত করতে সক্ষম। তবে হ্যা, এ আলোচনার দ্বারা এটা বোঝানো হয়নি যে কোরআনের মর্ম বোঝার প্রয়োজন নেই। বরং তার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তাই মর্ম উপলব্ধি করে কোরআন পড়া আরো ভালো, অর্থ বুঝে কোরআন পড়া উত্তম। তবে এর অর্থ এ নয় যে অর্থ না বুঝে পড়লে কোনো লাভ নেই। না বুঝে কোরআন পড়লেও সওয়াব হবে।

আই.এ/পাবলিক ভয়েস


পাবলিক ভয়েসের ইসলাম পাতায় লিখতে পারেন আপনিও। লেখা পাঠানোর ঠিকানা মেইল news.publicvoice24@gmail.com


 

মন্তব্য করুন