ব্যবসায়ীদের সব ধরনের সাহায্যের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

প্রকাশিত: ৭:৫৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১, ২০১৯

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানে আশ্বাস দিয়ে নতুন শিল্প কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশের প্রতি মনযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ‘আমাদের সরকার ব্যবসা-বান্ধব সরকার।

শেখ হাসিনা আজ রোববার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় রপ্তানি ট্রফি ২০১৬-১৭ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-র যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুন্সী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের আমি একটাই অনুরোধ করব, যে শিল্প বা শিল্পাঞ্চল আপনারা গড়ে তুলবেন বা শিল্পোন্নয়ন করবেন পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতি আপনাদের গুরুত্ব দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনাটা শুরু থেকেই করতে হবে যেমন, খুব হার্ড কেমিক্যাল ওয়েস্ট অথবা সলিড ওয়েস্ট বা অন্যান্য লিকুইড ওয়েস্টের ব্যবস্থাপনা যদি শুরু থেকেই করেন তাহলে আমাদের পরিবেশ রক্ষায় একটি সহযোগিতা হবে এবং দেশের জন্য, মানুষের জন্য কল্যাণকর হবে।’ তিনি ব্যবসায়ীদের এ দিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানান।

এই প্রসঙ্গে তিনি প্রতিটি শিল্প এলাকায় একটি করে জলাধার রাখার ব্যাপারে নজর দেয়ার জন্যও ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেন বৃষ্টির পানি সেখানে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যায়। যতগুলো স্থাপনা হবে সেখানকার বৃষ্টির পানি এখানে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। যাতে করে অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় এই পানি ব্যবহার করা যায়।

শিল্প এলাকায় একটা জলাধার থাকলে সেখানকার পরিবেশটাও ভালো থাকে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী সে স্থানে অধিকহারে বৃক্ষরোপণের পরামর্শ দেন।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যগণ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্যগণ, পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং শিল্প সংস্থার প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিসহ বিদেশি কূটনিতিক এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

দেশের রপ্তানি খাতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অনুষ্ঠানে ২৮টি ক্যাটাগরিতে ৬৬টি প্রতিষ্ঠানের মাঝে জাতীয় রপ্তানি ট্রফি ২০১৬-১৭-র ২৯টি স্বর্ণ, ২১টি রৌপ্য এবং ১৬টি ব্রঞ্জ ট্রফি প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।

‘জাবের এন্ড জুবায়ের ফেব্রিক্স লিমিটেড’ টানা ৬ষ্ঠ বারের মত শ্রেষ্ঠ রপ্তানিকারক হিসেবে ২০১৬-১৭ সালের রপ্তানি স্বর্ণ ট্রফি জয় করে।

‘জাবের এন্ড জুবায়ের লিমিটেড’ ২০১৭ সালের সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়ের জন্য আরো একটি স্বর্ণ ট্রফি লাভ করে।

অনুষ্ঠানে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যেও সম্প্রসারণের ওপর একটি ভিডিও চিত্রও প্রদর্শিত হয়।

রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন নতুন পণ্য সংযোজনের ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘রপ্তানি পণ্য সংযোজনের জন্য পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে হবে। সেইসাথে আমাদের পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা বেশি সেইদিকে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। বাজার খুঁজে বের করতে হবে।’

তিনি ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং হাইকমিশনারদের দেশের রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

আমাদের রপ্তানি পণ্যের সম্ভার অতীতের থেকে সমৃদ্ধ হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের নতুন নতুন অনেক পণ্য এসেছে, যেমন আইসিটি।’

তিনি বলেন, এই তথ্য প্রযুক্তির বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাছাড়া আমাদের চামড়াসহ অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য, পরিবেশবান্ধব পাট ও পাটজাত পণ্য, সিরামিক, ফার্মাসিউটিক্যালস, আসবাব পত্র, জুয়েলারি প্রভৃতিসহ বিভিন্ন নন ট্যাডিশনাল পণ্যের নতুন বাজার সৃষ্টি হয়েছে।

এ সময় যেসব দেশের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যেও এখনও প্রবেশাধিকার ঘটেনি সেসব দেশেও প্রবাশী বাংলাদেশীদের বসবাস রয়েছে উল্লেখ করে তাঁদের মাধ্যমে সুযোগকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বৈদেশিক বাণিজ্য ও রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য ‘ফরেন ট্রেড ডিভিশন’ চালু করেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আ.লীগ সরকারের বিগত সাড়ে ১০ বছরে দেশের আর্থ-সামাজিক প্রতিটি খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২০২টি দেশে প্রায় ৭৫০টি পণ্য ও সেবা রপ্তানি করে ৪৬ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় করেছে। এই সময়ে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ১৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ৭০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

২০০৫-০৬ অর্থবছরে যেখানে দেশের বাজেটের পরিমাণ ছিল ৬১ হাজার কোটি টাকা। সেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। যা জিডিপি’র ১৮ দশমিক ১ শতাংশ বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০১৮-২০২১ সন মেয়াদি রপ্তানি নীতি প্রণয়ন করেছে। প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি অপ্রচলিত পণ্যের ক্ষেত্রেও রপ্তানি ভর্তুকি প্রদান করা হচ্ছে। ফলে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকগণ রপ্তানি বাণিজ্যে সক্ষমতা বাড়াতে পারছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘তৈরি পোশাকখাতে এ বারের বাজেটে ২০১৯-২০ অর্থবছরে রপ্তানিতে অতিরিক্ত ১ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, সরকারের সক্রিয় প্রচেষ্টায় ডব্লিউটিও কর্তৃক স্বল্পোন্নত দেশের জন্য ঔষধের মেধাস্বত্ব মেয়াদ ১ জানুয়ারি ২০৩৩ সাল পর্যন্ত বাড়ানোয় ঔষধ রপ্তানিতে এটি বিরাট অবদান রাখবে।

ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের জন্য তাঁর সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ ও প্রণোদনার উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, ‘আমাদের পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করতে গত অর্থবছরে ৩৫টি খাতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এ অর্থবছরে আরও কিছু রপ্তানি পণ্যকে নগদ সহায়তার আওতায় আনা হচ্ছে।’ ‘বাণিজ্য বসতী লক্ষী’ আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী এ সময় ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমিয়ে আনায় তাঁর সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, ‘ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি ও ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সুদের হার ‘সিঙ্গেল ডিজিটে’ নামিয়ে আনার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’

এ সময় দেশের জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর এবং দক্ষ ও কর্মঠ যুব সমাজ গড়ে তোলায় সরকারের উদ্যোগ ও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুব সমাজ ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য কর্মসংস্থান ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, তাদের জন্য ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা- ২০১৮ প্রণয়ন এবং ‘ই-বাণিজ্য করবো, নিজের ব্যবসা গড়বো’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণেরও উল্লেখ করেন তিনি। দক্ষিণ আমেরিকা, রাশিয়া এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশসমূহের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা প্রাপ্তির জন্য তাঁর সরকারের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার ও তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রী।

‘নতুন পণ্য নতুন দেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি বৃদ্ধির আকাঙ্খা ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০২১ সালের মধ্যে ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় অর্জনের লক্ষ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

জিআরএস/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন