পাক-ভারত যুদ্ধ ও কাশ্মীরের মুক্তিযুদ্ধ

প্রকাশিত: ৪:২৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১, ২০১৯

কাশ্মীরের মাজলূম গণমানুষ ভারতের একপেশে শাসন থেকে মুক্তিলাভের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করে আসছে কয়েকযুগ ধরে। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে মর্যাদার আসনে সমাসীন করতে চাইছে ভূস্বর্গ খ্যাত প্রিয় মাতৃভূমি কাশ্মীরকে। কিন্তু অসংখ্য প্রাণ, এক সাগর রক্ত, অগণিত মা-বোনের ইজ্জত আর সর্বস্ব খুইয়ে এখনও দেখা মেলেনি সে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার। মুক্তিযুদ্ধে স্বজনহারা আর্তনাদের হৃদয়বিদারক আহাজারী একদিন স্বাধীনতার স্বাদ পিলাবে মুক্তিকামীদের ইনশাআল্লাহ।

মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় কয়েকদিন পূর্বে স্বাধীনতাকামী চারজন কাশ্মীরী বীর সেনাদের হাতে কুপোকাত হয়েছে ভারতীয় ২০ জন জালিম ও কুখ্যাত হানাদার বাহিনী। আর এতেই নড়েচড়ে বসে বিশ্বমোড়লরা! না, কাশ্মীরের পক্ষে অবস্থান নেয়নি, ভিন্ন দিকে ঘটনার মোড় ঘুরাতে পাগলপাড়া হয়ে ওঠে তারা। কাশ্মীরের সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের বীর খেতাব না দিয়ে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী বলে অভিযুক্ত করে! অন্যদিকে কাশ্মীরের বিরুদ্ধে মিডিয়ার সরব প্রচার দেখে বোঝা যায়- শকূনের গোষ্ঠীর ঘুম হারাম!

কাশ্মীরকে নিরবে নিঃশ্চিহ্ন করতে এবং সবার নজর ভিন্ন দিকে ব্যস্ত রাখতে, বিশ্বের অন্যতম অপদার্থ রাষ্ট্র (যারা গো-মুত্র পান করে, খোলা ময়দানে মলত্যাগ করে, পূন্যের আশায় পূর্ণ উলঙ্গ সাধুর নির্লজ্জাস্থানে মাথা ঠুকে ইত্যাদি) ভারতের ব্রেকিং ব্রিফিং ‘পাঁচ মিনিটে মানচিত্র হতে পাকিস্তানের নাম মুছে দেবো’! আচ্ছা, কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানকে মুছে দেওয়ার কথা আসে কোত্থেকে?

ভারতের ঘোষণার পর পাকিস্তানও প্রায় একই ভূমিকায় বক্তব্য দেয়। ব্যস! কাশ্মীর ভুলে এখন সবাই পাক-ভারত নিয়ে ব্যস্ত! ভারত সফল, কারণ সামান্য কয়েক শব্দের বক্তব্যে কাশ্মীর থেকে সবার নজর পাক-ভারত বিতন্ডার দিকে ঘুরিয়ে দিলো! পত্রিকার পাতায় গরম খবর, দু’দেশের সেনাবাহিনী যুদ্ধের সরাঞ্জামাদি নিয়ে সিমান্তে প্রস্তুত! শুনেছি দু’দেশকেই আবার সমর্থন দিতে শুরু করেছে বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো।

মনে হচ্ছে কাশ্মীরের মাজলূম/অসহায় জনতার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ঘর পোড়ার মাঝে আলুপোড়া দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে রাষ্ট্রগুলো। ভাব দেখে মনে হয় কাশ্মীরকে ঘিরে বিশ্বযুদ্ধ বাঁধাতেই তাদের এ নাক গলানি। তবে এটা স্পষ্ট- কাশ্মীরের নিপীড়িত মাজলূমের রক্তে নজর পড়েছে ভিনদেশী শকূনদের। মনে রাখা উচিত! কখনও কখনও যুদ্ধ সমস্যার সমাধান করে না, বরং স্বপ্ন সাধনা ধুলিসাৎ করে দেয়। তবে হ্যাঁ, কোরআন-সুন্নাহ নির্দেশিত ইসলাম প্রশ্নে যদি যুদ্ধ/জিহাদ শুরু হয়, সেটি ভিন্ন কথা।

  • আমরা তিনটি কারণে কাশ্মীরের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলতে পারি :

    ০১. কাশ্মীর মুসলিম প্রধান ভূখন্ড।

    ০২. আমরা পরাধীনতার যন্ত্রণা বুঝি ও জানি, তাই স্বাধীনতাকামী দেশ ও জনগণের পক্ষে থাকব।

    ০৩. আমরা সবসময় মাজলূমের পক্ষে এবং জালিমের বিরুদ্ধে, তাতে সে যে ধর্মের বা জাতির হোক না কেনো।

অতএব, মাজলূম ও স্বাধীনতাকামী কাশ্মীর নিয়ে আমরা কথা বলতেই পারি। সাধ্যানুযায়ী দাঁড়াতে পারি তাদের পাশেও। কিন্তু সেখানে সবাই পাক-ভারত যুদ্ধ নিয়ে সবাই ব্যস্ত কেনো? কথা হবে কাশ্মীর নিয়ে। কাশ্মীরের মাজলূম গণমানুষ নিয়ে। কাশ্মীরের স্বাধীনতা নিয়ে। জালিম ভারতের বিরুদ্ধে সম্মিলিত গর্জন ছাড়তে হবে বিশ্বমুসলিমকে।

পাকিস্তান যদি কাশ্মীরের মাজলূম গণমানুষের পক্ষে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে, তাহলে বিনা অযুহাতে একজন মুসলিম হিসেবে পাকিস্তান সমর্থনের বিকল্প নেই। যেহেতু তারা মাজলূমের পক্ষে। আর ভারতকে এজন্য সমর্থন করি না, তারা জালেম, অত্যাচারী, সন্ত্রাসী, ধর্ষক ও খুনী।

তবে কাশ্মীরের সংশ্লিষ্ঠতা ব্যতিত শুধুমাত্র পাক-ভারত যুদ্ধে আমরা কার পক্ষ নেবো, সে ব্যাপারে কিন্তু আলোচনা রয়েছে- কাশ্মীর সংশ্লিষ্ঠতা ব্যতিত শুধুমাত্র পাক-ভারত যুদ্ধে আপনি কার পক্ষ নেবেন? মুসলমানদের পক্ষ হিসেবে যদি পাকিস্তানকে সমর্থন করেন, তাহলেও আপনি প্রশ্ন থেকে মুক্ত নন। কেননা, যেখানে পাকিস্তানের মুসলিম জনসংখ্যা ১৯ কোটি, সেখানে ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা ৩০ কোটি

ইসলাম ও কাশ্মীর ইস্যু ছাড়া পাকিস্তানের পক্ষপাতিত্বের কোনো যুক্তি-ই দেখি না। কিছু বন্ধু ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ নিয়ে প্রচারে এতটা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, মনে হচ্ছে কাশ্মীর কোনো বিষয়ই নয়, ভারত হেরে পাকিস্তান জিতলেই যুদ্ধজয়! নতুন সংবাদানুযায়ী পাক-ভারত যুদ্ধে ভারত পিছু হটেছে। ব্যস! এবার পাকিস্তানপ্রেমীরাও উল্লাসে মাতোয়ারা। ‘ভারত পিছু হটেছে’র শ্লোগানে অনলাইজগত প্রকম্পিত! আচ্ছা পাক-ভারত যুদ্ধে কে পিছু হটলো আর কে এগুলো তাতে কী এসে যায়? কাশ্মীর নির্যাতন হতে কি ভারত পিছু হটেছে? ভারতীয় নরপিচাশদের হিংস্র থাবা হতে কি মুক্তি পেয়েছে কাশ্মীরের মাজলূম জনতা?

ভারত আমাদের জাত শত্রু। মুক্তিযুদ্ধাকালীন সময় বাংলাদেশের প্রতি তাদের সমর্থন ছিল তাদেরই স্বার্থরক্ষায়। কেননা, বাংলাদেশ ভাগ হলে ভারতের চিরশত্রু পাকিস্তানকে দুর্বল করা যাবে বলেই ভারত বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে বাংলাদেশের যতটা ভারতের পক্ষে কথা বলা উচিৎ, তার চেয়ে বেশী ঘৃণা করা উচিত নির্বিচারে ফেলানীদের হত্যা করে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখার প্রশ্নে।

টিপাইমুখ ও ফারাক্কাসহ বাংলাদেশীদের সুবিধা রক্ষার যাবতীয় চুক্তিপত্র সম্পন্ন না করায়, সহজইে অনুমেয়- ভারত বাংলাদেশের কতটা মিত্র। অতএব, ভারত সমর্থনের কথা বাংলাদেশ চিন্তাও করতে পারার কথা নয়। তাই বলে পাকিস্তানকেও মাথায় নিয়ে নাচার কিছু দেখছি না। বাংলাদেশের গণমানুষের ওপর সবচেয়ে জঘন্যতম নৃশংতা যদি কেউ চালিয়ে থাকে, তা এই পাকিস্তানই চালিয়েছে। তাই পাক-ভারত যুদ্ধে ইসলাম ও কাশ্মীর ইস্যু ছাড়া কারও পক্ষ নিয়ে মাতামাতির কোনো যুক্তি নেই।

কাশ্মীরকে চালের গুটি বানিয়ে ভারত-পাকিস্তান যে পুরোনো শত্রুতার হিসাব মেলাতে যুদ্ধে অগ্রসর হচ্ছে না, তা নিশ্চিত হলেন কীভাবে? তাই একটু থামুন! চোখ-কান খোলা রাখুন! কাশ্মীরের পক্ষে জনমত গড়ে তুলুন! কাশ্মীরের পাশে দাঁড়ান!

‘পাশ্চাত্যের মোকাবেলায় নববী আদর্শ’ বই থেকে
লেখক: হাবিবুর রহমান মিছবাহ (সম্পাদক, পাবলিক ভয়েস)

মন্তব্য করুন