হাজেরার লাল ডায়েরি

প্রকাশিত: ১:২৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৬, ২০১৯

কামরুন নাহার

অলস দুপুর। খবরের কাগজ নিয়ে বসছি অমনি দরজায় খটখট আওয়াজ৷ এক রাশ বিরক্তি নিয়ে এগিয়ে গেলাম। ভর দুপুরে আবার কে এলো? দরজা খুলতেই দেখি ছোট একটি ব্যাগ কাঁধে ৩ থেকে ৪ বছরের অসম্ভব সুন্দর ফুট ফুটে এক মেয়ে! দেখতে ঠিক পরীর মতো। কে তুমি? আমি হাফসা বলেই মেয়েটি আমাকে জড়িয়ে ধরল। কান্না জুড়ে দিল। নিষ্পাপ বাচ্চাটির চোখের পানি আমার আন্তর ভিজিয়ে দিলো৷ পরক্ষণেই বুকে টেনে নিয়ে বললাম, কী হয়েছে মামনি? কান্না করছো কেন? আমাকে আরও শক্ত করে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল সে। তখনই নজর পড়ল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধের ওপর। ভাল করে খেয়াল করে দেখি রহিম চাচা। রহিম চাচা! রহিম চাচা আপনি? আমার বাড়ি চিনলেন কী করে? আর এই মেয়েটি কে? তো চিনলাম না। মা, বহু কষ্টে তোমার ঠিকানাডা পাইছি। ও হচ্ছে হাজেরার মেয়ে।

হাজেরার মেয়ে! কোথায় থাকে হাজেরা, ও কি এখনও সেই আগের মতই রয়ে গেছে, আশপাশে লুকিয়েছে তাই না? নাগো মা না৷ হাজেরা এই দুনিয়ায় নাই। কথাটা শুনামাত্রই কয়েক মুহুর্তের জন্য বাকশক্তি হারিয়ে ফেলি। তার পর যা শুনেছি তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। মাত্র ১৫ বছরের ব্যবধানেই কত কিছু ঘটে গেছে। HSC পরীক্ষার পরপরই আমার বিয়ে হয়ে যায়। আমি ঢাকায় চলে আসি। এর কিছুদিন পর হাজেরারও বিয়ে হয়৷ ও স্বামীর সাথে কানাডা চলে যায়। তারপর থেকে কোনো যোগাযোগ হয়নি আমাদের। শুনেছি হাজেরার মা বাবা মারা যাওয়ার পর দেশের সব সম্পদ বিক্রি করে দিয়েছিল সে।

বিয়ের পর অনেক বছর সন্তান না হওয়ার ওর স্বামী আরেকটি বিয়ে করে। এতে হাজেরা একা হয়ে যায়। তাই সে হাফসাকে দত্তক আনে। মা মেয়ে মিলে ভালই ছিল। তবে ভাগ্য ওদের অনুকূলে ছিল না। বছর খানিক পরেই হাজেরা অসুস্থ হয়ে পরে। জন্মের সময় হাফসার মা মারা যায়। আর তার বাবার কোন খোঁজ নেই। এই কথাটা হাফসা বা অন্য কেউ জানে না। হাজেরা একটি ডায়েরি পাঠিয়েছে। সেই ডায়েরি পড়ে এটা জানতে পেরেছি। ২য় বিয়ে করার পরেও স্বামীর সাথে কিছুটা যোগাযোগ ছিল। কিন্তু দুরারোগ্য অসুস্থতার কারণে ওর স্বামী সেই যোগাযোগটাও বিছিন্ন করে দেয়। নিশ্চিত মৃত্যু জেনে শেষে দেশে ফিরে আসে হাজেরা।

মেয়েটি কান্নাস্বরে বলল, আম্মু বলেছে তুমি আমার মামনি। তুমি আমাকে আম্মুর মতই আদর করবে। আমি কপালে গালে চুমু খেয়ে বললাম হ্যাঁ মা, আমিতোমার মামনি। হাফসা ব্যাগ থেকে একটা লাল ডায়েরি বের করে হাতে দিল। আম্মু বলেছে এটা তোমাকে দিতে। ডাইরির পাতায় পাতায় জীবনের অনেক কথা রয়েছে। সব শেষে হাজেরা লিখেছে, মারা যাওয়ার ১০ দিন আগে ‘কলি তোকে অনেক কথা বলার ছিল। মনে হয় সে সময় আর পাবো না। তোর কাছে আমার শেষ অনুরোধ, আমার মেয়েটাকে তোর বুকে একটু আশ্রয় দিস।’ এই সেই হাজেরা যার জন্য আমি আজ আমার মতো হতে পেরেছি।

আল্লাহর রহমত আর হাজেরার সাহায্য পেয়েছি বলেই আমার মত দরিদ্র পরিবারের মেয়ের পক্ষে কিছুটা লেখাপড়া করা সম্ভব হয়েছে। ক্লাস ওয়ান থেকে শুরু করে ইন্টার পর্যন্ত লেখাপড়ার সমস্ত খরচ দিয়েছে হাজেরা। ও একটা ড্রেস কিনলে আমাকেও একটা দিত। আমার বাবা ওদের দিনমজুরি। একদিন হাজেরার মা আমার বাবার কাছে হাজেরার অনেকগুলো পুরনো কাপড় দিয়েছিল আমার জন্য। মেয়ের জন্য এতগুলো কাপড় দেখে বাবা মা বেশ খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু হাজেরা যখন জানতে পারল ভীষণরকম রেগে গেল, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বাড়িতে ছুটে এলো। চেনা ওর পুরাতান সব কাপড় টেনে বের করে নিয়ে ওর আম্মুর সাথে অনেক রাগ করলো। কেন পুরনো কাপড় আমাকে দেয়া হল। আমি খুব লজ্জা পেয়েছিলাম সেদিন।

আমাকে টানতে টানতে ওর আম্মুর সামনে নিয়ে বলে, ও আমার বন্ধু, গরীব হতে পারে কিন্তু ফকির না। যদি কখনও কিছু দিতে হয় তাহলে নতুন কিনে দিবে। ওর এ কথা শুনে কেন যেন খুব কান্না আসছিল। হাজেরাকে মাঝে মাঝে বলতাম, তুই আমাকে এত কিছু দিস, আমি তো কিছুই দিতে পারি না তোকে। ও হাসতো আর বলতো, এখন তোর দরকার তোকে দেই। যেদিন আমার দরকার হবে সেদিন আমায় দিস। বলতাম তোর আবার কিসের দরকার হবে? তুই তো রাজরাণি হবি। বড়লোক বাবার একমাত্র মেয়ে তুই৷ সেই হাজেরা আজ আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছে, আমি কি করে এতটা অকৃতজ্ঞ হই! ওর কাছে আমি চিরঋণী। বিয়ের পর আমার অবস্থা কিছুটা পরিবর্তন হয়। তখন থেকে যেকোন পছন্দের জিনিস কিনলে ওর জন্যও একটা করে কিনতাম। ওর ঋণ আদায় করার জন্য এমন করতাম না বরং শুকরিয়া আদায়ের জন্য। ওর বিরহবেদনা আমাকে ভীষণভাবে আহত করল। তা বলার ভাষা বা শক্তি আমার কোনোটাই নেই।

দুপুরের খাবারের পর একটু বিশ্রাম করে রহিম চাচা চলে গেলেন। কতকরে থাকতে বললাম, কিন্ত শুনলেন না। পরম মমতার সঙ্গে হাফসাকে রেখে দিলাম। আজ থেকে ও আমার মেয়ে। আমার কাছেই থাকবে হাফসা। কিন্তু সমস্যা একটা বাঁধলো, যখন শাশুড়ী জানতে পারলেন বিষয়টি। এটা নিয়ে তিনি তুলকালামকাণ্ড শুরু করলেন, কোথাকার কে তাকে কেন বাসায় রাখবে! বাড়িটি কী নঙ্গরখানা? কিছুতেই তিনি এটা মেনে নিবেন না। তার কথা শুনে না সইতে পারছিলাম না কিছু বলতে পারছিলাম! এখন কিছু বলা যাবে না। যা করার বুদ্ধি ও কৌশলে করতে হবে। শেষে একমাত্র আশা-ভরসা খুঁজে পেলাম স্বামীর কথা ভেবে। তাকে সব বুঝিয়ে বললাম।

সে কিছুক্ষণ নিরব থেকে শান্ত গলায় বলল, এটাতো অবশ্য ভালো এবং বিশেষ গুণ, তাছাড়া তোমার ওপরও তার সীমাহীন অবদান আছে। কিন্তু আমার কী করার আছে বল? মার ওপর দিয়ে আমার কোনো কথা বলার অধিকার নেই। মাকে কষ্ট দিয়ে তার অনুমতি ছাড়া কিছু করার সাধ্যও আমার নেই। তবে তোমাকে একটা পরামর্শ দিতে পারি। ওই মেয়েটাকে কোনো এতিম খানায় রেখে আসো। আর মাঝে-মধ্যে গিয়ে দেখে আসবে, কিছু লাগলে তা দিব। তুমি তো জানো, আম্মা হার্ডের, হাইপ্রেসারের রুগী । আমি চাইনা আম্মা কিছু নিয়ে উত্তেজিত হোক। শেষ ভরসায় চাঁদের গ্রহণ লাগা দেখে হতাশ হয়ে পড়লাম। অস্ফুট শব্দে শুধু মুখ দিয়ে বেরুলো, হায় মা…! আহ্ শাশুড়ী মা…! এমনটি যদি ঘটতো আপনার সঙ্গে কিংবা আপনার মেয়ের সঙ্গে! মনের ব্যথা সব মনেই কবর দিলাম। বলার জায়গা নেই। কিন্তু যে করেই হোক ওকে আমার বুকে ঠাঁই দিবই। হাজেরার মেয়ে আমার মেয়ে। ওর আশা আমি পূরণ করবোই ইনশাআল্লাহ ।

বুঝতে বাকি নেই আমার, এই ক্ষণযুদ্ধে একাই লড়তে হবে। অনেক ভেবেচিন্তে পরিশেষে একটা উপায় বের হলো, হাফসাকে তো পড়াতে হবে। মানুষ করতে হবে। জ্ঞান শেখাতে হবে। এর জন্য হাফসাকে নিরাপদ ও সুশিক্ষার কেন্দ্র মহিলা মাদরাসায় দিতে পারি। ব্যাস, তাই করলাম। নিজে চাকরি করার কারণে টাকার সমস্যা হয়নি। স্বামীর কাছেও চাইতে হয়নি কখনও। আজ ৭ মাস হয়ে গেলো হাফসাকে মাদ্রাসায় দিয়েছি। একবারও বাসায় আনিনি। আনিনি মানে আনতে পারিনি আমার শাশুড়ির কারণে। কেবল প্রতিমাসে একবার গিয়ে দেখে আসি আর যা লাগে তা দিয়ে আসি। তারপরেও এই নিয়ে বাসায় মোটামুটি অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। হাফসার সঙ্গে প্রতিদিন একই সময়ে ফোনে কথা হয়।

হাফসা আজ বলছে, মামনি মামনি, ঈদের সময় সবাই বাসায় যাবে, আমাকে বাসায় নিবে না? তোমার কাছে যেতে ইচ্ছে করে আমার। ওর আঁকুতি আর অভিযোগমাখা কথা শুনে কিছুই বলতে পারছি না। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে হাত দিয়ে চোখের পানি মুছছি! কোন উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। ফোনে ওপাশ থেকে কণ্ঠে ভেসে আসছে, কী হলো মামনি, আমাকে তোমার কাছে নিবে না? চুপ করে আছো কেন? আঁচল দিয়ে চোখ মুছে ধরা গলায় বললাম, হ্যাঁ মামনি আনবো। ঈদের ছুটিতে তোমাকে অবশ্যই আনব মামনি। আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করছি, আল্লাহ আপনি সুন্দর একটা সমাধান করে দিন। এই নিষ্পাপ শিশুর কাছে আমাকে মিথ্যে বাদি করবেন না। একটা ব্যবস্থা করে দিন। সুন্দর একটি পথ বের করে দিন।

লেখক, শিক্ষিকা শেনওয়ালিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা।

আই.এ/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন