ধর্ষণ; একাত্তরকেও হার মানিয়েছে কী না, মুক্তিযোদ্ধারা বলতে পারবেন

প্রকাশিত: ১১:৩০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৪, ২০১৯

দেশে অসংখ্য ডিসি কবীর ও সিরাজুদ্দৌলা রয়েছে। আরাম কেদারায় শুয়ে-বসে নারীভোগের নীলনকশা আঁকে এরা। দু’একটা কাকতালীয়ভাবে প্রকাশ পেলে হৈ চৈ শুরু হয়, আবার ক’দিন পর যেই-সেই অবস্থা। কে বলতে পারে? টিভির পর্দায় ব্যভিচারের বিরুদ্ধে বড় গলায় কথা বলা গলাবাজরাই প্রতিবাদ শেষে নারী কলিগকে দিয়েই ক্লান্তি ঘোচায় না!

আমার ধারণা— এ দেশে যৌন নির্যাতনের অন্তত আশিভাগই পর্দার আড়ালে থেকে যায়। লজ্জা, আত্মর্যাদা, সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে আশিভাগ নির্যাতিত নারী নীরবে চোখের পানি ফেলে। আর এই দুর্বলতার সুযোগটাই বেশি গ্রহণ করে লম্পট চামড়ালোভীরা।

যে বিশভাগ প্রকাশ পায়, তাদের দশভাগ মান-সম্মানের চিন্তা না করে প্রকাশ করে দেয়, পাঁচভাগ কাকতালীয়ভাবে প্রকাশ পেয়ে যায়, তিনভাগ বাধ্য হয়ে প্রকাশ করে, আর বাকি দুইভাগ ব্ল্যাকমেলাররা প্রকাশ করে দেয়। এটা কোনো সংস্থার জরিপ নয়, আনুমানিক একটা ধারণা বললাম।

বিচারের জন্য আইনের আশ্রয়ে যাওয়া বেশিরভাগ নারীরা আরেকদফা নির্যাতনের শিকার হন আইনী চিপায় পড়ে! বিশভাগের একপার্সেন্ট ভিকটিমও সঠিক বিচার পান না। কিছু নারী রাগ অভিমান আর ক্ষোভে আত্মহত্যা করেন, কিছু নারী কলঙ্কের বোঝা নিয়েই মৃত্যুর অপেক্ষা করেন, আর কোনো কোনো নারী চলে যান পতিতালয়ে!

নারী সহকর্মীরা আজ যৌন লালসার মূল টার্গেট। ঘরের বাইরে বের হওয়া বেপর্দা নারী ও ফ্রি মাইন্ডে চলাফেরা করা নারীদের বেশিরভাগই যৌন নির্যাতনের শিকার। সাংবাদিক, পুলিশ, সরকারী কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, সোশ্যাল ওয়ার্কার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও সংস্থা, ডাক্তার— এমনকি মাদরাসাও যুক্ত হচ্ছে ইদানীংকালে। সবজায়গায় যেন যৌনহয়রানী মহামারী আকার ধারণ করেছে!

আসলে বর্তমান সময়ে নারী-পুরুষের দেহখেলার বিষয়টাকে আমি যৌনহয়রানী বলতে চাই না, বলতে চাই ব্যভিচার। স্রেফ ব্যভিচার। কেননা— এই সময়ে ইভটিজিং ও জোরপূর্বক ধর্ষণের চেয়ে আপোষে পরকীয়া ও প্রেম সংঘটিত দেহলীলা বেশি হচ্ছে।

দিনের পর দিন উভয়ের যৌন সম্পর্কের পর দু’জনের মাঝে কিছু নিয়ে বনাবনি না হলেই মেয়েটা ধর্ষণের অভিযোগ ঠুকে দেয়! আর বিচার জরিমানা যা হয় সব পুরুষটার! না_ এই একতরফা বিচার ইসলাম সমর্থন করে না, বরং আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে দুইটাকেই কঠোর বিচারের সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন। আর এই বিচার কার্যকর হলে দেশে যৌন নির্যাতন তো দূরের কথা, লম্পট পুরুষরা ভুল করেও কোনো নারীর দিকে তাকাবে না।

ডিসি বলেন আর এডিসি বলেন, এ দেশে যৌন নির্যাতনের বিচার হয় না। বিচার হয় না ব্যভিচারেরও। কারণ যারা বিচার করবে, তাদেরও কেউ কেউ এই অপরাধে অপরাধী। তাহলে বিচার হবে কীভাবে? বরং এসব আইনের রক্ষকরা অপেক্ষায় থাকে, ভিকটিমকে কায়দামতো পেলে একদান মেরে দেবে!

প্রেমিকরা ধর্ষণ করে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে, মাতুব্বররা ধর্ষণ করে বিচার পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে, নেতারা ধর্ষণ করে পদ-পদবীর লোভ দেখিয়ে, আইনরক্ষকরা ধর্ষণ করে আইনের ফাঁকফোকরে, ডাক্তাররা ধর্ষণ করে পরীক্ষার নাম করে, শিক্ষকরা ধর্ষণ করে এ-প্লাসের লোভ দেখিয়ে, সাহেবরা ধর্ষণ করে চাকরির ভয় দেখিয়ে, আর হুজুররা ধর্ষণ করে জাহান্নামের বয়ান শুনিয়ে। দেশটা যেন ধর্ষণের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে! একাত্তরকেও হার মানিয়েছে কী না, তা মুক্তিযোদ্ধারা বলতে পারবেন।

যে দেশে সুন্দরী প্রতিযোগিতার নামে সুন্দরী মেয়েদের দেহভোগের অনুমোদন দেওয়া হয়, সে দেশে এর থেকে বেশী আর কী আশা করা যায়?

বেশ কয়েক বছর আগে এক চলচ্চিত্র অভিনেতার একটা সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম— চলচ্চিত্রে অশ্লীল সিনেমা নিয়ে কিছু বলার অনুরোধ করা হয়েছিল তাকে। তিনি বলেছিলেন, সিনেমা মানেই তো অশ্লীল, এখানে আবার শলীল আর অশ্লীলের কী আছে? আগের ছবিতে ধর্ষণের দৃশ্য দেখানো হতো পাতলা কাঁথার আড়ালে, এখন সেটা সরাসরি দেখানো হয় এই তো!

কার যেন আরেকটা কলাম পড়েছিলাম— চলচ্চিত্রে আসা কোনো নারী-পুরুষই ধোয়া তুলসী নয়। তাদেরকে যদি কেউ আইডল মানে, তাহলে তার জীবন বরবাদ। কারণ সিনেমায় ধর্ষণ ব্যভিচার আর সন্ত্রাসী গুন্ডামী ছাড়া কিছুই শেখানো হয় না।

ছোটপর্দার কয়েকটা আর্টিস্টের আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশের পরও কোনো এক অভিনেত্রী বলেছিলেন— এসব ঘটনা থেকে কেউই বাদ নয়, কারোটা প্রকাশ পায় আর কারোটা পায় না। ধরা পড়লে অশ্লীল, ধরা না পড়লে মহানায়িকা কিংবা মহানায়ক! আসলে এটাই মূলকথা। নারী সহকর্মীরা এসব জেনেই তো চাকরিতে যায় এবং উভয়ের সম্মতিতেই তো সবকিছু হয়, তাহলে হৈ চৈ কেন? চলুক না ব্যভিচার! দেশটা ভাদ্রের কুকুরের রাজ্যে পরিণত হোক!

ইবনে মুসা, লেখক ও কলামিস্ট

মন্তব্য করুন