আকিদা প্রমাণে সুস্পষ্ট বক্তব্য জরুরী: বর্ণিত কোনো ঘটনা থেকে আকিদা প্রমান হয় না

প্রকাশিত: ১:০৯ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৪, ২০১৯

(এক)
কোন ব্যক্তির আকিদা প্রমাণ করার জন্য ওই ব্যক্তির সুস্পষ্ট বক্তব্য থাকা চাই। শুধুমাত্র কারও কোন কিতাবে বর্ণিত ঘটনা দ্বারা সেটা তার আকিদা বানানো যায় না। ঘটনাকে রাখতে হবে ঘটনার মতো। ঘটনায় কুরআন, সুন্নাহ বিরোধী কোনো বক্তব্য থাকলে জানতে হবে যে ওই বক্তব্য তিনি সমর্থন করে কি না?

ইবনুল কায়্যিমিল জাওযিয়্যাহ রাহি. এর ‘কিতাবুর রুহ’ এর মধ্যে আশ্চর্যজনক অনেক ঘটনা এসেছে। আমরা সেগুলোকে তার আকিদা বানাই না। বরং ঘটনাকে ঘটনা হিসেবে রাখি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রওজা মুবারক থেকে হাত বের করা সহ আরও বহু ঘটনাকে আমরা ঘটনা হিসেবেই রাখি। কেউ সে ঘটনা বর্ণনা করলে আমরা এটা বলি না যে তার আকিদা হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দুনিয়ার জীবন এবং কবরের জগতের মাঝে কোন পার্থক্য নেই।

শায়খ মতিউর রহমান মাদানি, মুজাফফার বিন মুহসিন এবং এম, এম রফিকুল ইসলাম সাহেব এখানে মোটাদাগে ভুল করেছেন। তারা দেওবন্দি আকাবিরদের কিতাবাদি থেকে দু’ একটি ঘটনা উল্লেখ করে সেটাকে দেওবন্দিদের আকিদা বানিয়ে দিয়েছেন। মতিউর রহমান মাদানি সাহেব দেওবন্দিদের ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ এর আকিদা প্রমাণ করার জন্য রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি রাহি. এর ‘তালিফাতে রশিদিয়্যাহ’ থেকে জামেন আলির একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ঘটনা রচনা করতে গিয়ে তার কৃত জালিয়াতির কথা আপাতত বাদ দিলাম, কিন্তু সে ঘটনা দ্বারা কোনোভাবে বিকৃত ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ এর আকিদা দেওবন্দিদের প্রমাণিত হয় না। অথচ এর বিপরিতে ওলামায়ে দেওবন্দের শত শত ফতোয়া এবং বক্তব্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। জানি না কীভাবে সেগুলো মতিউর রহমান মাদানি সাহেবের চোখ এড়িয়ে গেল?

মুরাদ বিন আমজাদ এবং রফিকুল ইসলাম সাহেব হায়াতুন নবী এর আকিদার ক্ষেত্রে দেওবন্দি এবং বেরলভিদের আকিদা এক করে ফেলেছেন। দলিল স্বরুপ আহমদ কবির রেফায়ি রাহি. এর জন্য রাওজা থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাত বের করার ঘটনা উল্লেখ করেছেন! তারা ঘটনাকে আকিদা বানিয়ে দেওবন্দিদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। অথচ এর বিপরিত দেওবন্দিদের বিশুদ্ধ আকিদা শত শত কিতাবাদিতে রয়েছে। মাওলানা মনজুর নুমানি রাহি. ‘মাসআলাতু হায়াতিন নাবী’ নামে স্বতন্ত্র একটি কিতাব লিখেছেন।

(দুই)

চরমোনাই এর ‘ভেদে মা’রেফত’ এর ‘আল্লাহর আন্দাজ নেই নিয়ে বর্তমানে আলোচনা চলছে। অনেকে এটাকে চরমোনাই এর আকিদা বানিয়ে ফেলেছেন। বাস্তবে যদি কারও আকিদা হয় যে আল্লাহর আন্দাজ নেই, তাহলে সে সাথে সাথে কাফের হয়ে যাবে। ভেদে মারেফতে শামছুত তাবরিজি এর ঘটনার মাঝে এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিচে টীকায় এ কথা লিখে দেওয়া হয়েছে যে, ‘এ ধরণের কথা বলা আমাদের মত সাধারণ লোকদের জন্য পরিষ্কার কুফরী গণ্য হইবে।কিন্তু আল্লাহ পাকের দেওয়ানা বান্দাগণ এশকের চরম হালতে অন্তরের ভারসাম্য হারাইয়া এক প্রকার বেহুশ হইয়া কদাচিৎ এরুপ বলিয়া ফেলেন’। ( ভেদে মারেফত, পৃষ্ঠা নং ১৬)

এখানে এ কথা কুফরি হওয়ার কথা সুস্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছে। পরবর্তীতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে ওই আল্লাহর তাবরিজি রাহি. এর পীরের পক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থন করে। কেউ এশকের হালতে কুফরি বললে সে কারণে সে কাফের হয়ে যাবে কি না? সেটা ভিন্ন মাসআলা। এখানে সে প্রসঙ্গে আলোচনা করছি না। এর বিপরিত চরমোনাই মরহুম পীর এবং বর্তমান পীরের শত শত বয়ান রয়েছে। চরমোনাই এর কোন মুরিদও এ কথা বলে না যে আল্লাহর আন্দাজ নেই। এজন্য ভেদে মা’রেফত এর এ কথাকে তাদের আকিদা বানিয়ে নেওয়া কতটুকু ইনসাফের কাজ? আশা করি চিন্তা করে দেখবেন।

(তিন)

বৃটিশদের গুলি থেকে কিন্তু আহমদ রেজা খান বেরলভি এবং মরহুম হুসাইন আহমদ বাটালভি নিরাপদ ছিলেন। কিন্তু আকাবিরে দেওবন্দের মাঝে যারা জোরে জিকির করতেন এবং যারা আস্তে জিকির করতেন, কেউই রেহাই পাননি। সকলের বুক লক্ষ্য করে তারা গুলি চালিয়েছে। উত্তম এবং অনুত্তম এর বিষয় নিয়ে আমরা যেভাবে বিভক্ত হচ্ছি, সেটা সত্যিই আমাদের জন্য অশনি সংকেত।

আমরা আজ নিজেদের ঘরে আগুন লাগিয়ে বাতিলদের সাথে ঐক্যের শ্লোগান তুলি। নিজের ঘরের উত্তম এবং অনুত্তম এর মত ভিন্নতায় ইজতেহাদের পসরা সাজিয়ে বসি, কিন্তু বাতিলদের বিরুদ্ধে কাজ করতে গেলে আপনারাই তখন ঐক্যের শ্লোগান তুলে বলেন, এ সময় এগুলো নিয়ে কথা বলার সময় নয়। আল্লাহ সকলকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন।

মুফতী রেজাউল করীম আবরার
আলেম  ও লেখক

মন্তব্য করুন