ঈদের দিনে এক অসহায় পিতার করুণ আর্তনাদ

প্রকাশিত: ১০:৫৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১২, ২০১৯

ঈদের নামায থেকে বের হয়ে রিকশা করে বাসায় যাচ্ছি। পঞ্চাশোর্ধ বয়সী এক জীর্ণকায় চালক খুব ধীরে রিকশা টানছেন। পেছন থেকে ডাকলাম, বাবাজি! আপনার কষ্ট হচ্ছে?’ ঘুরে তাকালেন তিনি। চেহারায় বিষন্নতা। বললেন, ‘বাবা! এখনও ভালোমন্দ জিজ্ঞানোর লোক আছে? সবাই খালি ধমকাইয়া ধমকাইয়া জোরে চালাইতে কয়।

আমি রিকশা থেকে নেমে যাই। চলেন বাবাজি! আজ হাঁটতে হাঁটতেই যাবো। দু’জন গল্প করছি আর হাঁটছি। ওনার রিকশায় করে যাওয়াটা যথাযথ মনে করিনি। কিছুদূর যেতেই মনে হলো, বেচারা খুবই ক্ষুধার্ত। ঈদের দিন, কোথাও কোনো হোটেল বা রেস্তোঁরা খোলা নেই।

এর মাঝেই একটা দোকান নজরে পড়ল, খিচুরীর দোকান। বেচারা ঈদের দিনেও খিচুরী নিয়ে বসেছেন। দোকানে ঢোকলাম। রিকশাওয়ালা মুরব্বীকে ওনার চাহিদানুযায়ী খেতে বললাম।

বাড়ীতে কে কে আছে আপনার? খাবার মাঝেই জানতে চাই আমি। একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন- আপনের চাচি আর একটা পোলা আছে।
বড় ছেলে-মেয়ে নেই?
নাহ নাই!
এবার নাশতা খাওয়াও বন্ধ। চোখের কোণে পানি। কী ব্যাপার বাবাজি! আপনি খাচ্ছেন না যে! কিছু লুকোচ্ছেন মনে হচ্ছে।
বারবার বলছিলেন, ‘আমার কেউ নাই, আমার কেউ নাই। শুধু বুড়িটা আর ছোট পোলাডা আছে। ওরা আর আমারে ছাইড়া কই যাইবো!’

এবার শিশুদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন লোকটি। আমি চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যাই। প্রশ্ন করে কি ভুল করলাম! বিপরীত টেবিলে বসা ছিলাম। কাছে গিয়ে বসলাম।
বাবাজি! রাগ করবেন না। আমার প্রশ্ন কি আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে কোনো কারণে? লোকজন চারদিকে ভিড় জমালো। রিকশা চালক লোকটি বলতে শুরু করলেন-

‘আল্লাহ আমারে একটা পোলা দিছিলো। নায়কের মতোন দেখতে। আমি দিনমজুর আর আপনের চাচি মাইনসের ঘরে কাজ কইরা লেহাপড়া করাইছি। রাইতে রাইতে ওর লাইগা আল্লাহর দারে কানছি। লোকটি কথা বলার ফাঁকে ফাঁকেই ডুকরে কেঁদে ওঠেন।

আমার পোলায় অনেক পড়ছে। আমাগো গ্যারামের এক অফিসাররে দিয়া একটা চাকরিও পাইছে। আমার পোলায় পরথম বেতন দিয়া মিষ্টি নিয়া আইছিলো। সবাই শুধু কইতো তোমার কপাল খুইল্লা গেছে। তোমার পোলারে মানুষ বানাইছো। আমার যে কী খুশি লাগতো!

আবার কেঁদে ওঠেন তিনি। লোকটির কান্নায় আশপাশের দু’চারজনের চোখও ছলছল ছিল। একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন-

পোলারে গ্যারামেই একটা বিয়া করাইছিলাম। কী সুন্দর একটা বউমা পাইছিলাম। ঘরের সব ঘুছাইয়া রাখতো। দুই বছর পর একটা নাতনী হইছে। এক্কারে রাজরানী। কিন্তু এর দুই বছর পর আমার পোলায় বউমারে ঘরে রাইখা সারা রাইত কার লগে জানি কতা কইতো। বউমা আমারে কইলে পোলায় বউমারে খুব মাইর দেয়।

কয়দিন পর দেহি পোলায় একটা মহিলা নিয়া হাজির! মোবাইলে পেম কইরা বিয়া করছে। ঐ মহিলারও স্বামী সন্তান আছে! আমি ঐ মহিলারে গাইলাইলাম। ঐ খন্নাস! তোর শরম লাগে না? স্বামী সন্তান থুইয়া আরেকটা সংসার ভাঙতে আইছস? তুই তোর সন্তান থুইয়া কেমনে আইলি! তুই মানুষ নাকি ডাইনি? আমার লক্ষ্মী বউমাটা খালি কান্তেছিলো বাবা। আপনের চাচি বেহুশ হইয়া গেছিলো।

আমার বউমার বাপে, মানে আমার বেয়াই আমার আর আমার পোলার নামে মামলা দিছিলো। আমারে পুলিশ ধইরা নিয়া দেড়মাস জেলে রাখছে। দেড়মাস পর আইসা দেখি আপনের চাচি কান্তে কান্তে চোখে দাগ পড়াইয়া ফালাইছে। পোলায় ঐ ডায়নিটা নিয়া পলাইয়া কই জানি গেছে গা। আমি আমার বাড়িটা বন্ধক রাইখা বেয়াইর সাথে মামলা মিটমাট করি। নাতনীটা খালি জিগায় দাদু আব্বু কই? কন বাবাজি তখন কি আমি না কাইন্দা পারি?

আমার নাতনী এখন বড় হইছে। স্কুলে পড়ে। বউমারও ভালো একটা জাগায় বিয়া হইছে। আমার দারে মাঝে মাঝে জামাই নিয়া আহে। কী ভালো জামাইটা! কিন্তু আমার পোলাটা আহে না। পরে খবর পাই হ্যায় ঢাকা থাকে। বাড়ী তো বন্ধক রাখা। টাকা না দিলে বাড়ি থেইকা নাইমা যাইতে কয় টাকাওয়ালা। বাড়ী থেইক্কা নাইমা ঢাকা পোলার বাসায় উঠি। কিন্তু পোলার ঐ ডাইনী বউ পোলারে তাবিজ করছে। ঐ বউর মোটেও লজ্জা নাই। লজ্জা থাকলে কি আর ভাইগ্গা আহে! এই যে ভাইগ্গা আইলো, সেই লজ্জা ঐ মাইয়া, মাইয়ার বাপ, ভাই বা মা কারো নাই। খালি অহংকার! এরা সবাই আইসা আমার পোলার বাসায় পইড়া থাকে। আর আমরা যেনো কামের লোক।

ঐ মহিলার ভাইরে মটরসাইকেলে কইরা স্কুলে নিয়া যায়, আর ওর আপন ছোট ভাই হাইটা হাইটা মাদরাসায় যায়। মনে হয় যেনো আমার পোলা ঐ খন্নাস মহিলার গোলামী করতেছে। ঐ মহিলা যা কয় তাই করে। কিছু করতে গেলে বউরে জিগ্গান ছাড়া করে না। ওর মায়রে ডাইকাও জিগায় না।

ওর একটা চামচা আছে, হেয় আমার ছোট পোলারে একটা গাইল দিছে। তোর মায়রে… কইয়া। আমার ছোট পোলায় বড় পোলার দারে নালিশ দিয়া উল্টা মাইর খাইছে। ওর শালায় সব সময় গাইল দেয়। ওর বউ সব সময় ওরে আমাদের থেইক্কা দূরে রাখে। ঐ বলদটায় তা বোঝে না।

আমরা ওর বাসাত্তে নাইমা আইছি। একটা রুম ভাড়া নিয়া থাকি। আমি দিনে রিক্সা চালাই রাইতে ঘুমাই। আর আপনের চাচি দিনেও কান্দে রাইতেও কান্দে। ছোট পোলাডারে মাদরাসায় ভর্তি করছি। দেখি শেষ বয়সে ইট্টু শান্তিতে থাকতে পারি কী না।

বড় পোলায় নাকি ব্যাংকের সবাইরে মা-বাপের খেজমত করতে কয়। মা-বাপরে কান্দাইয়া ও সুখে থাকতে পারবে না। যাদের জন্য আমাগো ভুইল্লা গেছে, সেই তারাই ওরে কান্দাইবে! ওর মতো সন্তানেরা মা বাপের দোআ পায় না! কতোমাস হইছে একটাবার খবরও নেয় নাই।

এভাবেই অকৃতজ্ঞ ও পরকীয়ায় আসক্ত এক সন্তানের নেমকহারামীর বর্ণনা দিচ্ছিলেন এক হতভাগ্য পিতা। আসলে পরকীয়া বড় মারাত্মক ব্যধি। পরকীয়ার মেয়েরা সম্ভবত একটু বেশীই অহঙ্কারী হয়।

গল্পটি পড়ে যে কোনো ধর্ম বা বিশ্বাসের লোক অকপটেই বলে ফেলবে, গল্পের ছেলেটি মা-বাবার সাথে যে আচরণ করেছে, তা নিশ্চয়ই কোনো মানুষ করতে পারে না। ছেলেটি চরম বেঈমান ও নেমকহারাম। পশুসত্বা গ্রাস করে নিয়েছে ছেলেটিকে।

ছেলেটি অকৃতজ্ঞ ও আত্মমর্যাদাহীন। নাহয় যে মা-বাবা কোলেপিঠে করে তাকে মানুষ বানালেন, জীবন উৎসর্গ করলেন ছেলের ভবিষ্যত গড়ে দেবার জন্য, গায়ের রক্ত পানি করে সব উজার করে দিলেন ছেলের জন্য, সে ছেলে কোনোদিন মা-বাবার সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারে না।

“পাশ্চাত্যের মোকাবেলায় নববী আদর্শ” নামক বই থেকে সংগৃহীত।

লেখক : মুফতী হাবিবুর রহমান মিছবাহ।

মন্তব্য করুন