ঈদুল আযহার তাৎপর্য ও কোরবানীর শিক্ষা

প্রকাশিত: ২:৩০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১১, ২০১৯

কে. এম. মিনহাজ উদ্দিন

মানব জাতি আল্লাহ তা’য়ালার সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ জীব। এই মানব জাতি বিভিন্ন জাতি ও ধর্মে বিভক্ত। প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীদের নিজস্ব ধর্মীয় উৎসব আছে। আছে আনন্দ মুখরিত দিন। তেমনিভাবে মুসলমানদেরও আছে দু’টি উৎসব আনন্দের দিন। একটি হচ্ছে ঈদুল ফিতর, অপরটি ঈদুল আযহা। এ দেশের বৃহত্তম জনসমষ্টির কাছে ঈদ এমনই এক আনন্দঘন অনুষ্ঠান। আবাল-বৃদ্ধ বণিতার অনুষ্ঠান এটি। ধনী-গরীব বলে কোনো পার্থক্য নেই এ দিনে। এ দিনের আনন্দ কোনো ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠির নয়। এ দিনের আনন্দ সকলের।

ঈদের দিন এক মুসলমান আরেক মুসলমানের সাথে হিংসাদ্বেষ ভুলে মিলে যায়। শত্রুতা ভুলে বুকে বুক জড়িয়ে অনুভব করে এক বেহেস্তি সুখ। এক মুসলমান আরেক মুসলমানদের সাথে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার এক মহা সুযোগ সৃষ্টি করে ঈদ। ঈদুল আযহা মুসলিম সমাজের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। ঈদুল আযহার অপর নাম কোরবানীর ঈদ। আরবী শব্দ ‘কুরবাতুন’ বা ‘কুরবান’ থেকে কোরবানী শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ ত্যাগের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ। প্রতি বছর চন্দ্র মাসের ১০ই জিলহজ্ব ঈদুল আযহা বিশ্বের মুসলমানদের নিকট উপস্থিত হয় কুরবানীর অফুরন্ত আনন্দ সওগাত ও ত্যাগের উজ্জ্বল মহিমা নিয়ে। এ দিনে বিশ্বের লাখো কোটি মুসলমান বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় অনুপ্রাণিত হয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় হযরত ইবরাহীম আ. এর প্রবর্তিত ত্যাগ ও কুরবানীর আদর্শকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে।

পবিত্র কুরআন মাজীদে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন- ‘সুতরাং তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামায কায়েম কর এবং কোরবানী কর’ (সূরা আল-কাউছার-২)। হাদীস শরীফে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম রা. হতে বর্ণিত আছে- তিনি বলেছেন, একবার রাসূল সা. এর সাহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ কোরবানী কী জিনিস? উত্তরে তিনি বলিলেন, এটা তোমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম আ. এর সুন্নাত (ইবনে মাজা ও আহমদ)।

ঈদুল আযহা বা কুরবানী ঈদ পালনের একটি বেনজির ইতিহাস রয়েছে। আল্লাহ পাক বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আম্বিয়া-ই-কেরামকে বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করেছেন, তাঁদের মধ্যে হযরত ইবরাহীম আ. এর পরীক্ষা উল্লেখযোগ্য ও চির স্মরনীয়। তাঁর পরীক্ষা সমুহের মধ্যে স্বীয় পুত্র হযরত ইসমাইল আ.-কে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানীর নির্দেশ দেয়াই ছিল সবচেয়ে কঠিন অগ্নি পরীক্ষা। সে পরীক্ষায় হযরত ইব্রাহীম আ., পুত্র ইসমাঈল আ. এবং হযরত হাজেরা আ.সহ অর্থাৎ গোটা পরিবারটিই আল্লাহর নির্দেশকে যথাযথভাবে পালন করেছিলেন।

আল্লাহ পাক হযরত ইবরাহীম আ. এর কোরবানী কবুল করলেন। ইসমাঈল আ. জবেহ হলেন না, ইসমাঈল আ. এর স্থলে বেহেস্ত থেকে আনীত দুম্বা যবেহ হয়ে গেল। আল্লাহর নির্দেশ পালনে তাদের জীবনের মায়া মমতা আদৌ স্থান পায়নি। তাঁরা আল্লাহর অসাধারণ প্রেম-প্রীতি, ভালবাসা ও আনুগত্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর অন্তরের কোরবানী কবুল করে পুত্র ইসমাঈল আ. এর জীবন উপহার দিয়ে পশু কুরবানীর মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত এ সুন্নাত জারি করে দিয়েছেন।

হযরত ইবরাহীম আ হতে কিয়ামত পর্যন্ত এটা সুন্নতে ইবরাহীমি হিসেবে চালু থাকবে। সেই ঘটনা স্মরণ করে প্রতি বছর বিশ্বের মুসলমানগণ ঈদুল আযহা উদযাপন করে থাকে। জিলহজ্ব মাসের দশম তারিখে কোনো ব্যক্তি যদি নিসাব পরিমান অর্থাৎ সাড়ে ৭ তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২ তোলা রৌপ্যের সমান দ্রব্যাদির মালিক হয়, তাহলে প্রত্যেক স্বাধীন ও ধনী মুসলমানের ওপর কুরবানী দেয়া ওয়াজিব।

ঈদুল আযহার তাৎপর্য ও কুরবানীর মাহাত্মের প্রতি গুরুত্বারোপ করে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্তেও কুরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে’। রাসূলুল্লাহ সা. মদীনা শরীফে ১০ বছর অবস্থানকালে প্রতি বছরই কোরবানী দিয়েছেন।-তিরমিযী।

হযরত আয়েশা রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, কোরবানীর দিনে আল্লাহর নিকট রক্ত প্রবাহিত (কুরবানী করা) অপেক্ষা প্রিয়তর কোনো কাজ নেই। অবশ্যই কিয়ামতের দিন (কোরবানীদাতার পাল্লায়) কোরবানীর পশু তার শিং, পশম ও তার ক্ষুরসহ হাজির হবে। কুরবানীর রক্ত মাটিতে পতিত হওয়ার পূর্বেই আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায়। তাই তোমরা প্রফুল্ল মনে কোরবানী করো। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)।

গরু, মহিষ, উট, ভেড়া, ছাগল ও দুম্বা দ্বারা কুরবানী করা যায়। অন্য কোনো জন্তু দ্বারা কুরবানী করার অনুমোদন ইসলামে নেই। একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা কেবল একজনের পক্ষে এবং গরু, মহিষ ও উট দ্বারা সাতজনের পক্ষে কোরবানী করা যায়। তবে কোরবানীর পশু নির্ধারিত বয়সের হতে হবে। যেমন- ছাগল, ভেড়া, দুম্বা এক বছর, গরু, মহিষ দু’বছর এবং উট পাঁচ বছর বয়সী হতে হবে। কারো কারো মতে ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ছয় মাসের হলেও কুরবানী জায়েয হবে যদি এগুলো দেখতে এক বছর বয়সের মতো দেখায়।

কোরবানীর পশুর কতগুলো দৈহিক ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকা বাঞ্চনীয়। যেমন- কানা, খোড়া, কান কাটা, লেজ কাটা, শিং ভাঙ্গা ও পাগল পশু দ্বারা কুরবানী করা নাজায়েয। দুর্বল, মজ্জা শুকিয়ে গেছে বা হেঁটে কুরবানীর স্থানে যেতে পারে না এমন পশু দ্বারা কোরবানী করা ঠিক হবে না। কোরবানী দাতা নিজ হাতে কুরবানীর পশু জবেহ করা উত্তম, তবে প্রয়োজনে অন্য লোক দ্বারাও জবেহ করা যেতে পারে।

কুরবানীর গোশত নিজেও খেতে পারবে এবং অন্যকেও খাওয়াতে পারবে। যাকে খুশি তাকে প্রদান করতে পারবে। তবে গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজের জন্যে একভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্যে এবং অপর একভাগ দরিদ্র-নিঃস্বদের মাঝে বিলিয়ে দেয়া মুস্তাহাব।

নবী কারীম সা. বলেছেন, তোমরা মোটা-তাজা পশু দ্বারা কোরবানী করো। কেননা এ পশু পুলসিরাতে তোমাদের সওয়ারী হবে। রাসূল সা. আরো বলেছেন, হে ফাতিমা! আপন কোরবানীর নিকট যাও। কোরবানীর প্রথম রক্ত বিন্দুতে তোমার সমস্ত গুনাহ মাফ হবে এবং জন্তুটি কিয়ামতের দিন সমুদয় রক্ত, মাংস ও শিং নিয়ে উপস্থিত হবে এবং তোমার আমলের পাল্লা ৭০ গুণ ভারী হবে।

মানুষের জীবনে সকল জিনিসের চেয়ে আল্লাহ এবং তার নির্দেশকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়ার শিক্ষা রয়েছে কোরবানীতে কাম, ক্রোধ, লোভ, লালসা প্রভৃতি খোদাপ্রেমবিরোধী রিপুগুলোকে আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশ অনুযায়ী বশ ও দমন করার শিক্ষাও রয়েছে কোরবানীতে।

প্রতি বছর আমাদের মাঝে ঈদুল আযহা ও কুরবানীর ঈদ ফিরে আসে ত্যাগের মহিমা ও আদর্শ নিয়ে। ত্যাগ ছাড়া কখনোই কল্যাণকর কিছু অর্জন করা যায় না। ত্যাগের মধ্যেই রয়েছে প্রশান্তি ও অফুরন্ত রহমত। কোরবানী অর্থ ত্যাগ বা উৎসর্গ করা। তাই আমাদেরকে চিন্তা করে দেখতে হবে যে, আমরা কি আমাদের মাঝে লুকিয়ে থাকা লোভ-লালসা, মিথ্যা অনাচার, অবিচার, অত্যাচার, জুলুম, হানাহানি, স্বার্থপরতা, দাম্ভিকতা, আত্মম্ভরিতা, অহমিকা, দুর্নীতি, সুদ, ঘুষ, গীবত, পরনিন্দা, হিংসা, বিদ্বেষ, চুরি, ডাকাতি, সন্ত্রাসী ইত্যাদিকে কোরবানী দিতে তথা ত্যাগ করতে পারছি কি না। নাকি ঈদকে মুসলমানের একটি নিছক ধর্মীয় আমোদ-ফূর্তি দিবস হিসেবেই গ্রহণ করছি।

কোরবানীর মাধ্যমে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম আ. যে ত্যাগের আদর্শ স্থাপন করে গেছেন তাঁর সুন্নাত হিসেবে কোরবানী পালন করা যেন আমাদের জন্যে কেবল গোশত খাওয়াতেই পরিণত না হয়। মহান আল্লাহর এই বাণীর কথা অবশ্যই আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে। অর্থাৎ ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না উহাদের গোশত এবং রক্ত বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া তথা খোদাভীতি’- (সূরা হজ্জঃ-৩৭)।

কোরবানী একমাত্র মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের রেযামন্দি হাসিলের উদ্দেশ্যে করতে হবে। এতে কোনোরকম সামাজিকতা লোক দেখানো বা দামের প্রতিযোগীতা দেখানো হলে আল্লাহর দরবারে তা কবুল হবে না। কেননা আল্লাহ তা’য়ালা পরিস্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, ইরশাদ হচ্ছে, হে রাসূল সা. আপনি বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও মরণ বিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য উৎসর্গকৃত (সূরা আন’আমঃ ১৬২)।

ঈদুল আযহা বা কোরবানীর ঈদ থেকে আমরা এটাই শিক্ষা নিতে পারি যে, আমাদের আশ-পাশে যারা গরীব-দুঃখী, অভাবী, অসহায়, যাকাত প্রদানের মাধ্যমে আমরা তাদের মুখে হাসি ফুটিয়ে ঈদের আনন্দে শরীক করে নিতে পারি। তাহলে ঈদের আনন্দ পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। পবিত্র ঈদুল আযহার আনন্দ সবাইকে ছুঁয়ে যাক-এটাই ঐকান্তিক কামনা।

লেখক: সভাপতি- বাংলাদেশ জাতীয় সুন্নী ওলামা মাশায়েখ পরিষদ সিলেট জেলা কমিটি।

মন্তব্য করুন