পবিত্র হজ্বের জরুরী মাসআলা-মাসাঈল

প্রকাশিত: ৯:২৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৮, ২০১৯

আতাউল করীম মাকসুদ

হজ্ব ইসলামধর্মের ভিত্তিসমূহের একটি। পবিত্র কোরআন ও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে তার ফজিলতের কথা। রাসুলে কারীম সা. তো সোজাসাপ্টা বলে দিয়েছেন, মাকবুল হজ্বের প্রতিদান জান্নাত। হজ্ব কবুল হবে যদি শরিয়তের হুকুম মত হজ্ব করা হয়।

সংক্ষেপে হজ্বের জরুরী বিধাসসমূহ-

হজ্বের মুল ফরজ তিনটি।
১. ইহরাম: অর্থাৎ, অন্তর থেকে নিয়ত করা এবং ইহরামের নির্ধারিত পোষাক পরিধান করে তালবিয়া পড়া। প্রথমে মক্কায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলে মীকাত পার হওয়ার আগে ইহরাম পরিধান করতে হবে।

বাংলাদেশিদের জন্য মীতাক হলো ইয়ালামলাম পাহাড়। বিমানে সাধারণত মীকাত আসার পূর্বে ঘোষণা করা হয়। তবে, বিমানে অনেক সময় ইহরাম পরার সুব্যবস্থা না থাকায় বিমানবন্দর থেকে ইহরাম পরিধান করতে পারবে। এমনকি নিজের বাসা থেকেও পরা যাবে। তবে, এক্ষেত্রে সাবধানতা হলো, নিয়ত ও তালবিয়া বিমানে ওঠার পর করা।

প্রথমে মদিনায় যাওয়ার নিয়ত হলে ইহরাম পড়তে হবে না। মদিনা থেকে রওয়ানা হওয়ার সময় জুল হোলাইফা থেকে ইহরাম পরিধান করবে এবং নিয়ত করবে-
‘হে আল্লাহ, আমি হজ্বের নিয়ত করেছি, আমার জন্য হজ্বকে সহজ করে দিন এবং আমার হজ্ব কবুল করুন’।

মহিলাদের ইহরাম অনেকটা পুরুষের মতোই। তবে, মহিলারা সেলাইযুক্ত কাপড় পরিধান করবে, মাথা ডেকে রাখবে, শুধু চেহারা বের করবে। তবে, লম্বা কোনো টুপি অথবা অন্য কোনো জিনিস মাথার সামনের দিকে রেখে চেহারার ওপর নেকাব ব্যবহার করবে। বর্তমানে মহিলাদের জন্য এরকম আলাদা টুপি পাওয়া যায়। সেগুলো ব্যবহার করে চেহারা ঢেকে রাখবে। কোনো অবস্থায়ই ভিন্ন পুরুষের সামনে চেহারা প্রকাশ করবে না।

২. আরাফার ময়দানে অবস্থান করা: ৯ই জিলহজ্ব দুপুর থেকে সুর্যাস্তের মধ্যে কিছুক্ষণের জন্য হলেও আরাফার ময়দানে অবস্থান করা। রাসুলে কারীম সা. বলেন, ‘আলহাজ্জু আল আরাফাহ’ অর্থাৎ, আরাফার ময়দান অবস্থান করাই হলো হজ্ব। হজ্বের অন্যতম ফরজ আরাফার ময়দানে অবস্থান করা।

৩. তাওয়াফে জিয়ারত: ১০ই জিলহ্জ থেকে শুরু করে ১২ই জিলহজ্ব পর্জন্ত মাথার চুল মুন্ডন করা অথবা ছেটে ফেলার পর পর্যন্ত করা হয়। মহিলাদের বিশেষ অসুস্থতা শুরু হয়ে গেলে তাওয়াফে জিয়ারত দেরী করবে। পাক হওয়ার পর তাওয়াফে জিয়ারত করতে হবে। তাওয়াফে জিয়ারত না করলে হজ্ব সহীহ হবে না।

অনেক মহিলারা অসুস্থতাকে প্রতিহত করার জন্য ঔষধের সাহায্য গ্রহণ করেন। ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, এভাবে ঔষধ ব্যবহার করা জায়েজ হলেও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এজন্য যথাসম্ভব এমনটি না করা।

যদি কোনো মহিলা অসুস্থতা নিয়ে তাওয়াফে জিয়ারত করে ফেলে, তাহলে তাকে একটি গরু কুরবানি দিতে হবে। আর হ্যাঁ, মক্কায় অবস্থানকালীন সময়েই কোরবানী দিতে হবে।

উপরোক্ত তিনটি কাজই হজ্বের ফরজ। তিনটির কোনো একটি ছুটে গেলে হজ্ব সহীহ হবে না এবং কোনো পশু জবাই করেও তার প্রতিকার হবে না। নতুন করে পুণরায় হজ্ব করতে হবে।

বিশেষত, হজ্বের তিনটি ফরজ ধারাবহিকভাবে আদায় করতে হয়। ক্রমবিন্যাস রক্ষা করতে হবে। তাওয়াফে জিয়ারত আগে করে নিলাম, আর আরাফায় অবস্থানকে পরে নিলাম, এমন করলেও হজ্ব বাতিল হয়ে যাবে।

হজ্বের রুকন ২টি:
১. তাওয়াফে জিয়ারত। ২. আরাফার ময়দানে অবস্থান।

হজ্বের ওয়াজিব ৬টি।
১. মুজদালিফায় অবস্থান করা। ২. সাফা ও মারওয়া সায়ী করা। ৩. মিনায় অবস্থিত জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা। ৪. কেরান অথবা তামাত্তু হজ্বকারীর জন্য কুরবানী করা। ৫. মাথা মুন্ডানো অথবা চুল ছেটে নেওয়া। ৬. মীকাতের বাহিরে অবস্থানকারীদের জন্য বিদায়ী তাওয়াফ করা।

তবে, হজ্বের অন্য সকল ফরজ ও ওয়াজিব আদায় সম্পন্নকারী কোনো মহিলার অসুস্থতা শুরু হয়ে গেলে তার সাথে থাকা মাহরাম দেশে আসার সময় হয়ে গেলে তার জন্য তাওয়াফে বিদা করা ওয়াজিব নয়। সে মসজিদে হারামের অংশে প্রবেশ না করে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মুনাজাত করবে এবং মাহরামের সঙ্গে দেশে চলে আসবে।

হজ্বের কোনো একটি ওয়াজিব ছুটে গেলে হজ্ব সহীহ হবে। এমনকি ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিলেও হজ্ব সহিহ হবে। তবে, এজন্য পশু কোরবানী করা অথবা সদকা করা। হ্যাঁ, শরিয়তসম্মত কোনো ওজরের কারনে কোনো ওয়াজিব ছুটে গেলে পশু কোরবানী অথবা সদকা করতে হবে না।

হজ্বের সফরে ইহরাম পরিধান করার পর কিছু কাজ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। না জানার কারনে অনেক হাজ্বী সাহবেরা এসকল কাজে লিপ্ত হয়ে যান। এজন্য হজ্বে যাওয়ার পূর্বে কোনো বিজ্ঞ আলেম থেকে এসংক্রান্ত বিধান জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরী।

হজ্ব অবস্থায় নিষিদ্ধ-
১. সুগন্ধি ব্যবহার করা। ২. সেলাই করা কাপড় পরিধান করা, তবে মহিলারা সেলাই করা কাপড় পরিধান করবে। ৩. মহিলাদের মাথা ও চেহারা ঢেকে ফেলা। ৪. চুল কাটা। ৫. নখ কাটা। ৬. সহবাস অথবা সহবাসে উদ্বুদ্ধকারী কোনো কাজ করা। ৭. হজ্বের ওয়াজিবসমূহের মধ্য থেকে কোনো একটি ছেড়ে দেওয়া। ৮. স্থলে অবস্থানকারী পশু শিকার করা। ৯. হারাম শরীফে অবস্থানকারী পশু শিকার অথবা হত্যা করা। ১০. হারাম শরীফের গাছ অথবা ঘাস ছিঁড়ে ফেলা।

এসকল বিষয় থেকে ইহরামের সময় বেঁচে থাকা অত্যন্ত জরুরী। ইহরাম পরিধান করার পর এসব নিষিদ্ধ কাজ সংঘটিত হলে নিকটস্ত কোনো আলেম থেকে বিধান জেনে নিয়ে শরিয়তের হুকুম দ্রুত পালন করা আবশ্যক।

হজ্বের যাবতীয় বিধান পালন করার পর মদিনা মুনাওয়ারার উদ্দেশ্যে সফর করা। এটি ভালোবাসাময় একটি সফর। মুমিন হৃদয়ের লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন। এজন্য অত্যন্ত আগ্রহভরে মদিনার উদ্দেশ্যে সফর করা। অবশ্য, আমাদের দেশের অনেক হাজি সাহেবান হজ্বের আগেই মদিনায় যান। এতেও কোনো অসুবিধা নেই।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হজ্বের যাবতীয় বিধান মেনে চলার তাওফিক দান করুন।

মন্তব্য করুন