মুক্তিকামী কাশ্মীর: বাংলাদেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

প্রকাশিত: ৩:৪৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৬, ২০১৯

স্বাধীন সিকিমের পর দ্বিতীয় রাজ্য হিসেবে স্বশাসিত ভূমি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর অংশকে পরিপূর্ণ অধিকৃত করলো ভারত। সোমবার প্রতুষ্যে প্রথমে নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের মন্ত্রীসভায় অনুমোদন, আইনমন্ত্রণালয় হয়ে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর, এরপর সংসদে ঘোষণার মাধ্যমে ভারতের কেন্দ্রীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মধ্য দিয়ে স্বশাসিত কাশ্মীরকে কেন্দ্র শাসিত রাজ্যে পরিণত করা হয়েছে।

  • ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় তৎকালীন অবিভক্ত কাশ্মীরের রাজা হরি সিং এর বিরুদ্ধে পাকিস্তান সীমান্ত সংলগ্ন পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্রোহ গড়ে ওঠে। একই সময়ে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পশতুন উপজাতিরা কাশ্মীর রাজ্যে আক্রমণ করে। নিজ অধিনস্ত রাজ্যের নাগরিকবিদ্রোহ দমনের জন্য হরি সিং সাহায্যের হাত পাতেন ইংরেজ গভর্নর- জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে। মাউন্ট ব্যাটেন সাহয্যের জন্য শর্ত জুড়ে দেন কাশ্মীরকে নিয়ে ভারতভুক্ত হতে হবে। রাজা হরি সিং এর অধিনে তখন অবিভক্ত কাশ্মীর ছাড়াও জম্মু ও লাদাখও ছিল।

ব্রিটিশরা যখন ভারত ভাগ করে তখন একটা সিদ্ধান্ত এমনিতেই এমন ছিল যে, ঐ সময় স্বশাসিত রাজ্যের রাজারা চাইলে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন ও অথবা ভারত পাকিস্তান যেকোনো দেশের সঙ্গে যেতে পারবে। ‍কিন্তু কাশ্মীরের রাজা হরি সিং নিজ প্রজাদের বিদ্রোহ দমন করতে লর্ড ব্যাটনের দ্বারস্ত হলে সরাসরি ভারতভুক্তির শর্ত জুড়ে দেন। হরি সিং ভারতভুক্তির পক্ষে স্বাক্ষর করেন।

এরপরই ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরে প্রবেশ করে। অন্যদিকে কাশ্মীরের পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে তা দখলে নেয় পাকিস্তান। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৪৯ সালের ১৭ অক্টোবর ভারতের সংবিধানে ৩৭০ অনুচ্ছেদ গৃহীত হয়। ভারতীয় সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধানের ১ নং অনুচ্ছেদ ব্যতিত (প্রতিরক্ষ, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ) আলাদা সংবিধান তৈরির অধিকার পায় কাশ্মীর।

নিজস্ব সংবিধান বলে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, আলাদা পতাকা, দ্বৈত নাগরিকত্ব অধিকার পায় ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের জনগণ। এই অংশে কাশ্মীরের একাংশ ছাড়া রাজ্যভুক্তি বহাল থাকে জম্মু ও লাখাদ এর। এই অংশ পরিচিতি পায় জম্মু ও কাশ্মীর নামে। অর্থাৎ সম্পূর্ণ কাশ্মীর বলতে শুরু থেকেই কাশ্মীরের সঙ্গে জম্মু ও লাখাদও অবিচ্ছদ্য হিসেবে যুক্ত। আর এই কাশ্মীরিদের মনে স্বাধীনতার বীজ লালিত হয়ে আসছে সেই ৪৭’ থেকেই।

লাদাখে সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ, জম্মুতে সংখ্যাগুরু হিন্দু ও কাশ্মীরে সংখ্যাগুরু মুসলিম মিলে সম্প্রীতির বন্ধনে নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়েই টিকে আছে সূচনালগ্ন থেকে। কখনও এরকম শোনা যায়নি যে, জম্মু অঞ্চলের মানুষ স্বায়ত্ব শাসন ভুলে ভারতের সাথে একিভুত হতে চেয়েছে। বরং কাশ্মীর আজাদের আন্দোলন হয়েছে, হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অর্থাৎ চুক্তিভিত্তিক ভারতভুক্তি থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ণ স্বাধীনতাই ছিল কাশ্মীরিদের দাবি।

বিজেপি শাসিত ভারত সরকার সেটা না করে বরং একচেটিয়াভাবে নিজস্ব রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে কাশ্মীরের স্বাধীকারের শেষ অবলম্বনটুকুও কেড়ে নিয়েছে ইতোমধ্যেই। ভুলণ্ঠিত করেছে দীর্ঘদিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস। সেই সঙ্গে মাত্র দুটি জেলার লাদাখকে আলাদা করে সৃষ্টি করলো বিভক্তি। এই বিভক্তির বিপরীতে জম্মু ও কাশ্মীরকে একত্র রাখার মাঝেও রয়েছে সুচতুর ষড়যন্ত্র। এমনটাই বিশ্লেষকদের ধারণা। জম্মু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান।

তীর্থে আগমনকারী হিন্দুদের কাশ্মীরে অবাধ যাতায়াত, ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল অনুযায়ী জায়গা-জমি কিনে বাড়ি করার পথ সুগম ও সহজ করে মুসলিম প্রধান কাশ্মীরের চরিত্র পরিবর্তন করাই এর আসল উদ্দেশ্য বলে মন্তব্য করেছেন সংসদে বিরোধী দল কংগ্রেস সদস্য গুলাম নবি আজাদ।

সংসদে তিনি বলেছেন, ‘ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিকভাবে কাশ্মীরের যে অনন্য চরিত্র, কলমের এক খোঁচায় বিজেপি সেটাই বরবাদ করে দিতে চাইছে’।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা কী হতে পারে?

কাশ্মীরকে এক পতাকা তলে আনার ঘোষণা দিয়েই ক্ষ্যান্ত হয়নি বিজেপি সরকার। কাশ্মীরের রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে প্রথমে গৃহবন্দী ও পরে গ্রেফতার করেছে যাতে তারা স্বাধীনতা আন্দোলনে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে না পারে।

কার্যত এটা কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী মুক্তি আন্দোলনের প্রতি প্রচ্ছন্ন হুমকি এবং জনগণের মতামতকে বৃদ্ধাঙ্গলি দেখানোর নামান্তর। কাশ্মীরের জনগণের স্বাধীনতা খর্ব করার এহেন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ লড়াইয়ে স্বাধীনতা অর্জন করা স্বাধীন সোনার বাংলা প্রিয় মাতৃভুমি বাংলাদেশে কী ভূমুকা হবে সে প্রশ্নটা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে বলা আছে- স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের ২৫ ধারার ‘খ’ ও ‘গ’ উপধারায় বলা হয়েছে, (খ) প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করিবেন;

এবং (গ) সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করিবেন।

সংবিধানের এ ধারার আলোকে কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী জনগণ মুক্তির লড়াইয়ের আনুষ্ঠানিক ডাক দিলেই কেবল তাদের পাশে দাড়ানো নয় বরং এখন থেকেই কাশ্মীরিদের পাশে দাঁড়ানো উচিৎ বাংলাদেশের।

সংবিধানের ‘খ’ উপধারা বর্ণিত ‘সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার’ অক্ষুন্ন রাখতে কাশ্মীরিদের পাশে দাঁড়াতেই হবে, যে অধিকার এযাবতকাল পর্যন্ত তাদের ছিলো।

‘গ’ উপধারায় বর্ণিত ‘সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদ’র বিরুদ্ধে সর্বত্র নিপীড়িতদের সমর্থনের যে কথা বলা হয়েছে তাতেও কাশ্মীরিদের সমর্থন না করার কোনো বিকল্প নেই বলেই মনে করি। যেহেতু বাংলাদেশও একসাগর সাগর রক্ত পেরিয়ে তবেই স্বাধীনতা পেয়েছে।  একটি স্বাধীন দেশের উচিৎ প্রকাশ্যে মুক্তিকামী সংগ্রামী দেশের পাশে থাকা।

আন্তর্জাতিক বিশ্ব কী করবে?

কাশ্মীর পৃথিবীর ভূস্বর্গ হিসেবেই পরিচিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমি কাশ্মীর তার রুপ, লাবণ্যে ঘেরা নয়ানাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অনন্যতার কারনেই ভূস্বর্গ হিসেবে সমাদৃত বিশ্বব্যাপী। পৃথিবী জুড়েই রয়েছে এর খ্যাতি। ফলে বিশ্ববাসীর নজর রয়েছে পৃথিবীর এই স্বর্গ পানে। ভৌগলিক অবস্থানের কারণেই এর গুরুত্বও অপরিসীম। এই অঞ্চল নিয়ে বিবাদ রয়েছে ভারত-পাকিস্তানের পাশাপাশি চিনেরও। চিনকে একটা অংশ ছেড়েও দিয়েছে পাকিস্তান। চিনের বিবাদ বড়সড় না হলেও ভারত-পাকিস্তানের সংঘাত চরম বিপদজনক।

অন্তত দক্ষিণ এশিয় অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতঃ ভবিষ্যত যুদ্ধ-সংঘাত এড়াতে কাশ্মীরের স্বাধীনতার বিকল্প নেই। কেননা কাশ্মীর অধিভুক্তি মেনে নেবে না ভারত-পাকিস্তানের কেউই। যা এক প্রেয়সীকে নিয়ে দুই প্রেমিকের কাড়াকাড়ির মতোই হিংসার সূত্রপাত ঘটায়। সুতরাং ভারত-পাকিস্তানের এ সংঘাত নিরসনে কাশ্মীরের স্বাধীনতা হতে পারে উত্তম সমাধান। সেক্ষেত্রে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরও যদি চায় তারা একীভুত হয়ে একক কাশ্মীর রাষ্ট্র গঠন করবে তাহলে সেই সুযোগও দেওয়া উচিত। আর এই সুযোগটা করে দিতে এবং স্বাধীন কাশ্মীরের স্বীকৃতি দিয়ে শান্তির পক্ষে রায় দেওয়া প্রত্যেক স্বাধীন ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক বিশ্বের আবশ্যকীয় কর্তব্য।

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়; মাত্র ৮ বছর আগে ২০১১ সালের জুলাইয়ে শুধুমাত্র ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠীর ভিন্ন সংস্কৃতির ধারক বাহক হওয়াতে সুদান থেকে স্বাধীনতা লাভ করে দক্ষিণ সুদান। অন্যদিকে জন্মলগ্ন থেকে নিজস্ব সংস্কৃতি, কৃষ্টি-কালচার, সভ্যতা স্বকীয়তা নিয়ে মুক্তির লড়াইয়ে টিকে থাকা কাশ্মীরিদের অধিকার খর্ব করাকে বিবেকবান কেউ সমর্থন করতে পারে না। সুতরাং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ নয় মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই কাশ্মীরিদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে স্বীকৃতি ও সমর্থন করা বিশ্ব পরাশক্তিসহ সকল সভ্য দেশের নৈতিক দায়িত্ব।

মন্তব্য করুন