অটুট থাকুক বন্ধুত্ব

প্রকাশিত: ৭:৩১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৪, ২০১৯

ইসমাঈল আযহার
পাবলিক ভয়েস

বন্ধু বান্ধব কার নেই। সবারই আছে। বয়স এবং কাজের নানান ক্ষেত্রে আমরা নতুন নতুন বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হই । নতুন জায়গায় গেলে পুরোনো বন্ধুরা হারিয়ে যায়। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। অচেনা অজানা মানুষের সঙ্গে আমাদের অর্তরঙ্গতা হয়। বন্ধুত্ব কখন কীভাবে তৈরি হয় বলা মুশকিল। অনেক সময় প্রথম সাক্ষাতে বন্ধুত্বের বন্ধনটা খুব মজবুত; পাকাপোক্ত হয়। আবার কখনও খুব ধীরে ধীরে, অনেকটা সময় একসঙ্গে থাকার পর বন্ধুত্ব হয়। আবার এই বন্ধুত্ব কখনও আত্মীয়-স্বজনদের চেয়েও কাছে এনে দেয় আমাদের।

যখন আমরা দাওরা (মাস্টার্স) পড়ি আমাদের ক্লাসে একজন বড় ভাই ছিল। দাওরার অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বিয়ের বয়স হয়ে গেলেও তার বয়স ছিল একটু বেশি। আমরা সবাই তাকে ধরে বেঁধে বিয়ে দিয়ে দিলাম। আর্থিক অস্বচ্ছলতা থাকায় তার দেনমহর ও বিয়ের সব আয়োজন আমরাই করলাম। ক্লাসের সবাই এগিয়ে এলো। এক কথায় খুব জাঁকজমক করে তার বিয়ে হল। কোনো বড় বা ছোট যে কোনো ধরণের অসুস্থতায় আক্রান্ত হলে সবাই স্বতস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতো।  আমাদের পুরো ক্লাসের সবার ভেতর একটা ভাল বোঝা-পরা ছিল। স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে যে বন্ধুত্ব হয় না তা নয়। কিন্তু মাদরাসার শিক্ষার্থীদের ভেতর যে একটা বন্ধন সৃষ্টি হয় সেটা ওইসব পরিবেশে খুব কম নজরে পড়বে। তবে প্রত্যেকটা জায়গায় তাদের বন্ধুত্বগুলো নিজেদের কাছে খুবই শক্তিশালী বলে মনে হয়। একদিন আমার এক বন্ধু বলছিল, তোর আর আমার মধ্যে যেমন বন্ধুত্ব এমন অন্য কেউ হবে না।

বন্ধু মানে তার সঙ্গে শুধু মনের দু’টো সুখ-দুখের আলাপ নয়।  আমাদের বন্ধুত্বটা ছেয়ে গিয়েছিল জীবনের সবক্ষেত্রে। অবশ্য এমন বন্ধুত্ব আর কখনও তৈরি হবে না এটাও ঠিক। বন্ধু যে কতো রকম হতে পারে সেটা আমাদের প্রত্যেকের জীবনের দিকে তাকালে ভাল উদাহরণ মিলবে। বন্ধু এমন একটা সম্পর্কের নাম যেটা পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্ক হতে আলাদা এবং অনন্য। আসলে বন্ধুত্বের কোনো দায় থাকে না। দায়হীন অন্যের পাশে থাকার নামই হল বন্ধুত্ব। বন্ধুত্বের অর্থ একেক জনের কাছে একেক রকম হতে পারে, আর এটাই স্বাভাবিক। বন্ধুদের নিয়ে আমাদের অনুভূতি ভিন্ন ভিন্ন রকম। স্মৃতিগুলো তো আর বিচিত্র। অনেক সময় দেখা যায় তিন চার জন মিলে গল্প করতে বসেছি। কারও ছোটকালে বুড়ির বাগান থেকে ঝড়ের দিনে আম চুরির কাহিনী মনে পড়লো। গল্পটি শোনার পর আরেক জনের ঠিক এমন একটি গল্প মনে আসতে পারে। সে বলেই উঠতে পারে, আরে আরে ছোটকালে তো আমরাও এমন করতাম বা এমন একটি কাহিনী আমার জীবনেও ঘটেছিল।

আসলে বন্ধু জিনিসটা সবসময় সতেজ থাকে, বলা যায় একটি ফুলের যৌবনকাল। ফুলটি কখনও ঝরে না, সুখোয় না, সবসময় একই রকম থাকে। বন্ধুত্বের বন্ধন যতোই মজবুত হোক একদিন বন্ধুকে ছাড়তে হয়। এটাই নিয়ম।  অনেকের জীবন অবশ্য কিছুটা আলাদা। সমাজে এমন বহু মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে। যারা আলাদা হয়নি। অনেক চেষ্টা করেও বন্ধুর পাশে থাকতে পারছে না। তবে একটা কথা মানতেই হবে, শৈশবে বন্ধুকে নিয়ে যতো আবেগ উদ্দিপনা বা পাগলামো থাকে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাতে ঘুন ধরে।

শৈশবের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলো আজ স্বপ্নের মতো মনে হয়। শীতের সকালে কুয়াশার ভেতর দিয়ে কুরআন শরীফ বুকে নিয়ে ঝগড়া, মারামারি ও হাসাহাসি করতে করতে যাদের সঙ্গে মক্তবে যেতাম তাদের অনেককে আজ হারিয়ে ফেলেছি। যাদের এখনও হারাইনি, গ্রামে গেলে যাদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়, তখন আমরা পুরোপুরি মন খুলে কথা বলি। সেই ছোটকালের মতো।

কোনো আবেগ নেই, অভিযোগ নেই, অনুযোগ নেই, নেই লৌকিকতা, আছে শুধু ভালবাসা।  খবু একান্ত বিষয় যা কারও সঙ্গে বলা যায় না, পারিবারিক ঝামেলা আমরা সবকিছু অকপটে বলে ফেলি। যে সম্পর্কে লৌকিকতা আছে সেটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক নয়। দায় এক লৌকিকতা বিবর্জিত সম্পর্কই হল বন্ধত্ব।

১৯৩০ সালের দিকে বন্ধু দিবসের আবিস্কার। আচ্ছা এর আগে কী মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব হতো না? অবশ্যই হতো। শুধু বন্ধু দিবসে বন্ধুর বাড়ি কার্ড পাঠানো হতো না। অথবা ফেসবুক, টুইটার বা অন্য কোনো যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পিক সঙ্গে কিছু ফরম্যাল কথাবার্তা যুক্ত একটি মেসেজ পাঠানোর হতো না। বন্ধুত্বের সৃষ্টি যখন মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই। শুধু বন্ধু দিবন নয়, বন্ধুর খোঁজ-খবর হোক সবসময়। ভাল থাকুক সব বন্ধুরা। অটুট থাকুক বন্ধত্বের বন্ধনগুলো।

লেখক, তরুণ আলেম, সাংবাদিক

আইএ/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন