সংসার ভাঙ্গন ও ডিভোর্স বেড়েই চলছে: কারণ ও উত্তোরণ

প্রকাশিত: ৬:৫৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০১৯

শারমীন চৌধুরী: এপর্যন্ত আমার যত বান্ধবীর বিয়ে হয়েছে তাদের মোটামুটি সবারই বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। কারওটা হওয়ার পথে। আমি তাদের জিজ্ঞেস করেছি, কেন ডিভোর্স দিলে? প্রথম উত্তর আসছে, বন্দী বন্দী লাগে। দ্বিতীয় কথা, ও আর সেই আগের মত নেই। আমি আমার কালচার বাংলাদেশ কনট্যাক্সটে সব কিছু তুলে ধরব। আমরা বিয়ে নিয়ে এত বেশী ফ্যান্টাসিতে ভুগি তা বলার মত না। হোক এটা খুব কালচারাল ফ্যামিলি, হোক রিলিজিয়াস ফ্যামিলি।

যারা একটু সংস্কৃতিমনা তারা কল্পনা করেন বিয়ে করলে এখানে ঘুরতে যাব, ওখানে যাব, এটা কিনবো, ওটা কিনব, দ’জন দু’জনের দিকে তাকিয়ে থাকব, হাত ধরব, এভাবে ছবি তুলবো, ওভাবে তুলবো। আর যারা রিলিজিয়াস তারা কল্পনা করেন, জামাইকে নিয়ে মক্কা মদিনা যাবে, জামাই আমাকে অনেক টেক কেয়ার করবে, বউকে দেখে চক্ষু শীতল হবে, অনেক ধার্মিক হবে, আইডিয়াল বউ-জামাই হবে। আসলে বাস্তব খুব ভিন্ন। বাস্তবে এইগুলো অনেক সময়ই এরকম আইডলিষ্টিক হয়ে উঠে না। হতে পারে আর্থিক সমস্যা, সামাজিক নানান সমস্যা কিংবা জীবনকে যেভাবে কল্পনা করি বাস্তবতা সেভাবে গড়ায় না।

বিয়ে ভাঙ্গার ক্ষেত্রে তৃতীয় কোন ব্যাক্তি লাগে। যেমন খুব কোন ছোট বিষয়ে জামাই বউয়ের মাঝে মনোমালিন্য হয়েছে। ওদিকে মেয়ের মা ফোন করে বলবে একবারে চলে আয়। আমাদের কি টাকা পয়সা কম আছে! না তোর যৌবন ফুঁড়িয়ে গেছে! চলে আয় তাড়াতাড়ি, লাগবেনা এই ছেলে। ডিভোর্স দিয়ে দে। অথবা স্বামীর বন্ধু বা বৌয়ের বান্ধবীরাও এইসব ক্ষেত্রে ইনভল্ব হতে পারে। তারা নিজ নিজ বন্ধুকে কুপরামর্শ দিতে সদা প্রস্তুত। অথচ গুড মেন্টরিং বা কনস্ট্রাকটিভ কাউন্সেলিং কিন্তু জীবন থেকে অনেক সমস্যা দূর করে দিতে পারে।

স্বামীর বন্ধু এসে বলছে ভাবি আপনি এত ভাল, আপনার জামাই আপনার সাথে এরকম করে! এরকম একটা কিউট মেয়ের সাথে এরকম করতে পারলো! অথচ কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে পড়বে সাপ। দেখা যাবে এই লোকও ঘড়ে বউয়ের সঙ্গে খারাপ আচরণ করছে। আলগা প্রিত দেখাতে আসছে। আবার বউয়ের বান্ধবীরা এসে বলবে- আপনার মত এইরকম ভাল জামাই পেলে আমরা খুশিতে নাচতাম। ওতো আসলে মানুষই চিনল না। আমাদের নেচারটা এমন যে, আমরা অন্যের সব কিছু পছন্দ করি, আবার তার চেয়েও মূল্যবান জিনিস নিজের থাকলে সেটার পাত্তা দি না।

পরিচত একজন আছেন। স্বামী বন্ধুর বউকে হুট করে বিয়ে করে ফেলে। সেই জামাই আবার ওই লোকের বউকে বিয়ে করে। তখন আমার মনে হলো এই ভাঙ্গনের পেছনে অপশন থাকাটাও একটা কারণ। জীবনে এত অপশন থাকলে মানুষ তার নিজের জিনিস নিয়ে কনফিউজড হয়। এবং এই অপশন বেছে নেওয়ার যে স্বাধীনতা সেটা তাকে দিশেহারা করে দেয়। স্বেচ্ছাচারিতা তখন প্রতিদিন হতে থাকে।

এবার আসি অন্য কথায়। এখন একটা কথা বলব যা আপনার বিশ্বাস না ও লাগতে পারে, কিংবা খারাপ ও লাগতে পারে। তবে আমি খুব বিশ্বস্ত সূত্রে জেনেছি, বউ নিয়ে ছেলে আলাদা একটা ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকবে এটা অনেক মা-ই সহ্য করতে পারেন না। যদিও দু’জনের সম্পর্ক সম্পূর্ণ আলাদা। তবুও একটা অন্য পরিবার থেকে আসা মেয়ে তার ছেলেটাকে দখল করে ফেলছে এটা মানা কষ্টকর। আবার এমনও হচ্ছে যে, মেয়েটি কয়দিনের মাথায় স্বামীকে শাসন করছে, বলছে, তোমার ভাই-বোনকে টাকা দিতে পারবা না। মাকে দিতে পারবা না, এই সেই। মানে টাকা-পয়সার হিসেব নেওয়া শুরু করে দেয়। এসব নিয়ে পরবর্তিতে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। এগুলো একটা সময় ডিভোর্সের দিকে নিয়ে যায়।

একটি মেয়ে যখন বিয়ে করে নতুন বাড়িতে আসে, সে আগে বাপের বাড়ি কী করত না করত এসব কিন্তু কেউ  দেখে না।  কিন্তু বিয়ের পরে বলে, তোমার চাকরি ছাড়তে হবে, এই করতে হবে, সেই করতে হবে। অথচ এগুলো বিয়ের আগের শর্ত ছিল না। এবং তার টাকার হিসেব নেওয়া শুরু করে। মেয়ে তার বাবা মাকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করলে তখন ছেলের আবার অনেক সমস্যা শুরু হয়ে যায়। এগুলোতে আপত্তি তোলে। তখন মেয়েটা ধাক্কা খায়। আবার কখনো চাকরি ছেঁড়ে ঘরের এমন কাজ করতে চাপ দেওয়া হয় যেগুলো একটি উপার্যনক্ষম পরিবারে ১/২ হাজার টাকা দিয়ে একজন কাজের মানুষ দিয়েই করানো সম্ভব।

নারী যদি তার মেধাকে শাণিত করে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশে কন্ট্রিবিউট করার জন্য আর তাকে যদি তা করতে না দিয়ে খুবই বেসিক কিছুতে সীমাবদ্ধ করা হয় তাহলে এটা মেধার অপচয়। একজন ইঞ্জিয়ারকে ঝাড়ুদার হিসেবে বাধ্য করার মতো। হ্যাঁ অবশ্যই নারী তার ঘর ভালবেসে মাকড়সার জ্বাল পরিষ্কার করবে, বাথরুম ধুবে, সন্তানদের ময়লা কাপড় কেঁচে দেবে, এটা তো জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এটাকেই যদি একমাত্র কাজ বানিয়ে তাকে বড় কাজে অংশগ্রহণ করতে বাঁধা দেওয়া হলে কিন্তু নানান রকম কনফ্লিক্ট তৈরি হয়। নারীরা শিক্ষিত হচ্ছে এবং  সাথে সাথে দুইটা জিনিস তাদের মাথায় রাখতে হচ্ছে।

১. শিক্ষিত নারীর নিজের এডাপটেশন, অন্য একজন শিক্ষিত নারীকে হ্যান্ডেল করার জন্য পুরুষের যোগ্যতা। অনেক শিক্ষিত নারীই শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সামর্থের গরম দেখাতে গিয়ে সংসারই করতে পারছে না। সুখ-শান্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আত্মঅহমিকায়। এর অর্থ হচ্ছে, সে শিক্ষার সাথে নিজের মানবিকতা ও মানবতাকে এডাপ্ট করতে শিখেনি। আবার অনেক পুরুষ জানে না, একজন শিক্ষিত নারীকে কতটুকু ফ্রিডম কিভাবে দিতে হয়। তার সঙ্গে কিরকম আচরণ করতে হবে। হয়ত দেখা গেছে আগের জেনারেশন যেমন ‘প্রভুত্ব’ দেখাতো সেটাই দেখাচ্ছে, এতে করে কনফ্লিক্ট দানা বাঁধছে।

আরেকটা জিনিস- আমাদের এই ভারত উপমহাদেশীয় কনটেক্সটে আমরা সন্তানদের একদম প্রতিবন্ধী হিসেবে গড়ে তুলি। পানিটুকুও পারলে গিলে দেই। কাপড় ধুয়ে, বিছনা গুছিয়ে এমনকি স্কুল কলেজ পর্যন্ত পারলে বিয়ের আগ পর্যন্ত সমস্ত সাপোর্ট দিয়ে এমন প্রতিবন্ধী বানাই যে, তারা নিজের জীবনে সবকিছুতেই ডিপেন্ডেন্ট হয়ে যায়।

এ কারণে আমরা পরবর্তীতে যে কোনো সমস্যার সমাধানে তাদেরকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যোগাতে পারি না। নিজেরা সেইসব সমস্যা দূরীকরণে কোন ধরণের ভূমিকাও রাখতে পারি না। পারব কিভাবে? তাদের সময়টা আমাদের সময়টা তো ভিন্ন। তখন ওই উন্ডোজ সেটাপ দেওয়ার মতো একটাই সমাধান -ডিভোর্স। অথচ আমি বিশ্বাস করি জীবনের প্রতিটি ক্রিটিকাল সমস্যারই ‘শান্তিপূর্ণ’ সমাধান আছে। সবশেষে বলব, সংসারে অশান্তি হোক এটা চরম খারাপ লোকটাও চায় না। অথচ শান্তি কীভাবে আসবে সেটাই আমরা খুঁজতে চাই না। আল্লাহ্‌ আমাদের শান্তি ও সুখের জীবন দান করুন।

ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

মন্তব্য করুন