ছেলেধরা: গুজবের ওপর চলছে নির্মমতার মহোৎসব!

তাসলিমা বেগম রেনু

প্রকাশিত: ৫:৩৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০১৯

ছোটবেলায় শুনেছি, ব্রীজ বা বড় স্থাপনা করতে নাকি মানুষের মাথা লাগে। তখন এসব ভয় দেখিয়ে বাচ্চাদের জব্দও করা হতো। রাস্তাঘাটে অপরিচিত কাউকে এলোমেলো চুলে দেখলেই পালাতাম কল্লাকাটা ভেবে। মহিলা ভিক্ষুক থেকে সাবধান থাকত সবাই।

কত মহিলা-পুরুষ ভিক্ষুকের ব্যাগ চেক করেছে এলাকাবাসী তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তখন দেখতাম ঐ মানুষগুলি অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকত। তবে ঐ সময় বর্তমানের মতো নিষ্ঠুরতা ছিল না। কাউকে সন্দেহ করে ভুল প্রমাণিত হলে উল্টো ভিক্ষুকের কাছে ক্ষমা চাওয়া হতো। ধর মার কাটকাট করে কোনো মাকে মেরে ফেলার ঘটনা তখনকার দিনে ঘটত না।

বড় হওয়ার সাথে সাথে জানতে পারি আসলে ওসব গুজব ছিল। তবে নরবলির বিষয়টা সনাতন ধর্মের রীতি থেকে এসেছে। পরবর্তিতে গল্পকথা হিসেবে রয়ে যায় বিষয়টি। কিন্তু এই যুগে এসেও যে সেই কাল্পনিক গল্পকথা বাস্তবে রূপ নেবে বা মানুষও তা বিশ্বাস করবে, সেটা ধারণায় ছিল না।

এই সময়ে এসে হঠাৎ গুজব ছড়িয়ে পড়ল- বাংলাদেশের মানুষের বড় স্বপ্ন আর সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ পদ্মাসেতুর জন্য মানুষের কল্লা লাগবে! এই গুজবে সারাদেশের মানুষ আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ে। সরকার ও পদ্মাসেতু কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিলেন পদ্মাসেতুতে কল্লা লাগবে এটি গুজব ও মিথ্যা। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর প্রতিবাদ হয়।

কিন্তু, এই গুজবের দুর্বলতা হাতিয়ার বানিয়ে যে অপরাধযজ্ঞ শুরু হয়েছে, তা অমানবিক, পৈশাচিক এবং বর্বর। গুজবকে বাস্তবে রূপ দিতে মানুষরূপী কিছু জানোয়ার বাচ্চাদের মাথা কেটে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এ পর্যন্ত দুই-তিন জায়গায় নির্ভরযোগ্য সূত্রে মাথা কাটার সংবাদ পাওয়া গেছে।

এই বর্বরতায় মা-বাবারা নিজ সন্তান স্কুল-মাদরাসায় পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন! তবে ঘটনার বাস্তবতা যতটুকু, তার চেয়ে গুজব হাজারগুণ বেশি। গুজবটি ছড়িয়েছে কোনো একটি অপরাধীচক্র তাতে সন্দেহ নেই। এই গুজবের রোগ ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। সুযোগ হিসেবে নিয়েছে সব অপরাধীচক্র। আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

  • গুজবের সুযোগ নিয়ে অপরাধীচক্র কীভাবে অন্যায় করে বেড়াচ্ছে দেখুন! কয়েকটি সংবাদপত্রের হেডিং দিচ্ছি সংক্ষেপে-
    • ছেলেধরা অপবাদ দিয়ে টাকা দাবি, না পেয়ে পিটুনি
    • বন্ধুর অনুরোধ রাখতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার
    • ছেলেধরা সন্দেহে এবার পাঁচ এনজিওকর্মীকে গণপিটুনি
    • উত্তর বাড্ডায় মেয়েকে ভর্তি করানোর তথ্য জানতে স্থানীয় একটি স্কুলে যান তাসলিমা বেগম রেনু (৪০)। এসময় তাকে ছেলেধরা সন্দেহে প্রধান শিক্ষকের রুম থেকে টেনে বের করে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়।
    • মাদারীপুর সদর উপজেলার ধূরাইল ইউনিয়নের বৈরাগীর হাট এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে মানসিক প্রতিবন্ধী নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর।

নানা ধরনের গুজব ছড়ানোর জেরে গত ৬ মাসে গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৩৬ জন। এসব ঘটনা অবশ্যই খুন। এগুলোর বিচার হয়নি, বিচারের তেমন উদ্যোগও দেখা যায়নি। ফলে সরকার বা প্রশাসনের প্রতি মানুষ আস্থা হারাতে বসেছে।

অবশ্য পর পর ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনার পর পুলিশ গণপিটুনিকে ফৌজদারি অপরাধ অভিহিত করে তদন্ত শুরুর কথা জানিয়েছে। তবে পুলিশ সদর দফতর থেকে গণপিটুনির বিরুদ্ধে সতর্কবার্তার তেমন কোনও কার্যকারিতা এখনও দেখা যাচ্ছে না। অথচ ছেলেধরা গুজব এবং ভয়ে অনেক এলাকায় স্কুলে বাচ্চাদের উপস্থিতি কমে গেছে।

পুলিশ সদর দফতরের সর্বশেষ নির্দেশনায় গুজব প্রতিরোধে পুলিশের সব ইউনিট প্রধান ও জেলা পুলিশ সুপারদের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অবশ্য বাড্ডার ঘটনায় কয়েকজনকে আটকের পর রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

ঠিকভাবে বাঁচার নিরাপত্তা ও ব্যবস্থা রাষ্ট্র তার নাগরিককে দিতে পারছে না বলে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে মানুষ।
আর ধর্মীয় অনুশাসণ তো নেই বললেই চলে।

মানসিক দুশ্চিন্তাগ্রস্তরা গণপিটুনির শিকার হচ্ছে বেশি। কারণ হলো:-

মনে করুন করিম সাহেব একটি গার্মেন্টসে কাজ করেন। বেতন ১২ হাজার। এই টাকায় সংসার চালানো, বাসা ভাড়া, পোশাক, মোবাইল খরচ, সংসারে অশান্তি, অসুস্থতা, অফিসে অস্থিরতা, গাড়িতে ঝামেলা, জানজট, রিকশা ভাড়ায় ঝগড়া, বিচলিত মন, এরকম নানা ঝক্কি ঝামেলা মাথায় নিয়ে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে এদিক সেদিক তাকালেন, ব্যস! অমনি হুজুগেরা ছেলেধরা বলে মাইর শুরু করল, মিনিটের মধ্যে কয়েক ডজন এসে মারতে থাকবে, জানতেও চাইবে না কী কারণে মারছে!

কেনো ঘটছে এসব? মনে হচ্ছে এতে ষড়যন্ত্রও থাকতে পারে। কাউকে মারা সহজে সম্ভব নয়। তো এই গুজবের সুযোগে ছেলেধরা বলে প্রতিপক্ষ প্রতিশোধ নিচ্ছে। ধরেন কেউ একজন ষড়যন্ত্র করলো, কাউকে অপবাদ দিয়ে মেরে ফেলবে। ব্যস কয়েকজন মিলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেটা বাস্তবায়ন করে ফেলে। এমনটাই যে হচ্ছে তা বলছি না, তবে এ ধারণা উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই।

সর্বশেষ যে ঘটনা দেশ-বিদেশে শোকের ছাঁয়া নেমে এসেছে, তা হলো বাড্ডার রেনু হত্যা। শিক্ষিতা তাসলিমা বেগম রেনুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। হৃদয়বিদারক এই ঘটনায় অভিভাবকরা আরও বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। চার বছরের ছোট্ট শিশু তুবার কান্না আর মায়ের অপেক্ষায় পথ তাকিয়ে থাকার দৃশ্য সহ্য করার মতো নয়। মা সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য গিয়েছেন, কিন্তু খুন করা হলো ছেলেধরা অপরাধে! দেশে খুন এখন এতটাই সস্তা!

সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ ব্যতিত এই সঙ্কট নিরসন সম্ভব নয়।

মন্তব্য করুন