এইচ এম এরশাদ : পরাধীনতার শেষ জীবন

প্রকাশিত: ৯:৪৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০১৯

আলহাজ্ব হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, এটাই তাঁর পূর্ণ নাম। সংক্ষেপে এইচ এম এরশাদ। বাংলাদেশের দীর্ঘায়ুতম সাবেক প্রেসিডেন্ট ও রাজনীতিবিদ তিনি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর মেয়াদকালও ছিল দীর্ঘতম। ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপি সরকারের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তার থেকে ১৯৮২ সালে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তিনি প্রথমে নিজেকে প্রধাণ সামরিক আইন প্রশাসক পরে সরাসরি প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি নিজেকে ঘোষণা করলেন। এ জুলুমকে আমি কখনো মেনে নিতে পারিনি। দেশের অধিকাংশ নাগরিক সেসময়ে তাঁকে জালেম হিসেবেই মনে করতো।

১৯৯০ সাল পর্যন্ত তাঁর শাসণামল ছিল নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। যুগপৎ আন্দোলনের এক পর্যায়ে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। এটাই রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘পতন’ বলা হয়। তাঁকে হটানোর আন্দোলনে অনেক মানুষের রক্ত ঝড়েছে। এখন আর রক্ত ঝড়ে না। উধাও হয়ে যায়।

তাঁর শাসনামলে এ দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হয়। দেশের সব থানার মান উন্নীত করেছেন তিনি। থানার নতুন নামকরণ হয় উপজেলা। তাঁর আগে এ শব্দটির সাথে পরিচয় ছিলো না কারো। আর উপজেলা ছিল একটি জেলার মিনি সংস্করণ। হ্যাঁ, তিনি প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণ করেছিলেন, ফলে প্রান্তিক জনগন সুফল পেয়েছে। তাঁদের সময় বেঁচেছে, প্রশাসনিক হয়রানি কমেছে। তবে সরকারী দপ্তরে দূর্ণীতি বেড়েছিলো, যা এখনো চলছে।

১৯৮৩ ইং সালে বরিশালের একটি থানা সদরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সন্ধ্যার পর হারিকেনের আলোর ন্যায় বিদ্যুতের টিমটিমে আলো দেখেছি সদর রোডে। যা ছিল ইট বিছানো, আর দোকানগুলো ছিলো ঝাপ দেয়া। অর্থাৎ দোকানের সন্মুখভাগ তুলে বাঁশ দিয়ে ঠেক লাগানো। গ্রামেগঞ্জে এখনো তা দেখা যায়। রাষ্ট্রপতি এরশাদের করা উপজেলার বদৌলতে সেখানে এখন দালানকোঠায় সয়লাব। সেসময় ঐ থানায় ছাদওয়ালা দালানকোঠা একদম ছিলোনা, কয়েকটা প্রাইমারী বিদ্যালয় ছাড়া। বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নের রূপকার ছিলেন তিনি। একযোগে সারা দেশের অবকাঠামোর উন্নয়ন তিনিই শুরু করেছিলেন উপজেলা সিস্টেম করার মধ্য দিয়ে। এটা এ দেশের জনগন কখনো ভুলবেনা।

তাঁর সাথে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিরোধটা ছিল অবৈধ ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে। এটাই ছিল মারাত্মক খতরনাক। বিএনপি নেতাদের প্রতি তিনি তুলনামূলক অধিক স্টীম রোলার চালিয়েছিলেন। যে সব নেতৃবৃন্দ তা সহ্য করতে পারেননি, তারা দলে দলে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় তারা আবার ফিরেও এসেছে নিজ দলে। অনুরূপ আওয়ামী লীগ থেকেও নেতাদেরকে জাতীয় পার্টিতে আমদানী করেছিলেন। ভোলা থেকে তোফায়েল আহমেদকে যেদিন এ্যারেস্ট করে লঞ্চযোগে বরিশাল জেলে পাঠানো হয়েছিল, তখন তাঁর হাতে হ্যান্ডকাফ লাগানো ছিলো। তখন স্পেশাল পাওয়ার এ্যাক্ট ছিলো নিবর্তনমূলক আইন। বলা নেই কওয়া নেই, মন চাইলেই এরেস্ট করা হতো রাজনৈতিক নেতাদেরকে। জামিন হতো না ১২০ দিনের আগে। আবার মেয়াদ বাড়ানো হতো। হাইকোর্ট থেকে জামিন পেতে পেতে কয়েক মাস চলে যেতো। স্পেশাল পাওয়ার এক্টে আটক হতে আরো কোন অপরাধ করা লাগতো না। রাজা চাইলেই হতো। তাঁর শাসনামলে লোকাল এমপিরা ঐ আইনের আওতায় বিরোধীদলীয় নেতাদেরকে আটক করাতে পারতেন।

তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময় লাগতো কয়েক সেকেন্ড। যখন যা করতে চাইতেন, দ্রুততার সাথেই তা বাস্তবায়ন করতেন। সারা দেশে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের রাজত্ব চলতো। মাস্তানী চাঁদাবাজির কমতি ছিলনা। তাঁর মধ্যেও উন্নয়নমূলক কাজ চলতো সমান গতিতে। তৎকালীন সময় দেশের বড় প্রকল্পগুলো তিনিই বাস্তবায়ন করেছেন। যমুনা সেতু তিনি শুরু করেছিলেন। এজন্য জনগনের কাছ থেকে সারচার্জ আদায় করা হতো। ঢাকা শহর রক্ষা বাঁধ তিনিই করেছিলেন। ফলে পুরো ঢাকা এখন আর তলিয়ে যায় না। ঢাকার বড় বড় ইমারত ও সড়ক তিনি করেছেন। দেশের বড় বড় ব্রীজ ও সড়ক তিনি নির্মাণ করে ঘটা করে উদ্বোধন করেছেন। বরিশালের কালিজিরা ব্রীজ উদ্বোধনের একদিন পর তিনি ক্ষমতা হারান।

বর্তমান শাসনামলের দিকে তাকিয়ে আপনি যদি তাঁর শাসনামলকে মূল্যায়ণ করেন, তাহলে এরশাদের শাসনামলকে ‘স্বর্ণযুগ’ বলতে হবে।

আজ তাঁর বিদায় বেলায় তাঁর চরিত্রের নেতিবাচক আমল নিয়ে লেখা নির্দয় হবে। তিনি শেষ জীবনটা পরাধীনতার মাঝে কাটিয়েছেন। স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ছিলোনা। একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী একনায়কের ব্যক্তিস্বাধীনতা বলতে কিছু ছিলনা। শেষ জীবনে জেল জুলুমের ভয়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ঘন্টায় ঘন্টায় চেঞ্জ হতো।

নিজের বউ বিদিশাকে তালাক দিতে হয়েছিলো তৎকালীন রাজনৈতিক পীরের কথায়। সিএমএইচে শেষ শয্যায় বিদিশার হাত ধরে বুকের কাছে নিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন বারবার। সাবেক স্ত্রীর ‌হাত ধরে থেকেছেন ঘন্টার পর ঘন্টা। ক্ষমতার মদমত্তে থাকাকালীন বহু নারীর সাথে তিনি রোমান্টিক সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। তাঁর কবিমন তাঁকে অজস্র নারীর প্রেমিক বানিয়েছে।

এইচ এম এরশাদ সংবিধানে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে ইসলামকে প্রতিস্থাপন করেছেন। এটা যদিও প্রতীকি একটা বিষয়। তবুও তার পরবর্তী কোন সরকারই পরিবর্তন করার সাহস রাখেনি। তিনি ঢাকার মসজিদগুলোর বিদ্যুৎ বিল মওকুফ করেছিলেন। পাঞ্জাবি টুপি পরে বিভিন্ন মাসজিদে জুমা আদায় করতেন। তিনি দু তিনটি দরবারে ঘনঘন যাতায়াত করতেন। ছারছীনা, আটরশি ও সাঈদাবাদী দরবারে যখন তখন ছুটে যেতেন। একবার ছারছীনায় গিয়ে বললেন, “রাতে স্বপ্নে দেখে এখানে ছুটে এসেছি, পীর সাহেব হুজুরের সোহবত নিতে, বরকত হাছিল করতে।” অথচ সপ্তাহখানেক আগেই ওখানে স্পেশাল ফোর্সের লোকজন জড়ো হয়েছিল।

এরশাদের মাঝে খুব ইসলামপ্রীতি ছিল। কতকে বলতো ভন্ডামি। আমরা তা মনে করি না। মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে তাঁর ব্যাপক অবদান আলীয়া লাইনের আলেমরা কখনো ভুলবে না। তিনি আলেম সমাজকে সম্মানিত করেছেন। মাদ্রাসা শিক্ষকদেরকে বৈষম্য থেকে তিনি সমান্তরালে নিয়ে এসেছিলেন। বর্তমানে যে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকরা একই বেতন কাঠামোতে বেতন ভাতা পাচ্ছেন, তা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের অবদান।

আজ তাঁর শেষ যাত্রায় নিশ্চয়ই সেখান থেকে কিছু পাথেয় যোগ হবে আশা করি। যা তাঁর নাজাতের উসিলা হতে পারে। আমরা কায়মনোবাক্যে দোয়া করছি, বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃদ্ধ রাষ্ট্রপতির কবরখানা যেন আঁধারে ঢাকা না থাকে। আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করে তাঁর কবরকে আলোকিত রাখবেন। আমরা জানি, আল্লাহ তায়ালা বৃদ্ধদেরকে সম্মাণ করেন।

লেখক, এক্টিভিস্ট ও বিশ্লেষক

মন্তব্য করুন