মোহময় একটি রাত

প্রকাশিত: ৭:০৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ৮, ২০১৯

ইসমাঈল আযহার

১. হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগের সামনে ভীড় দেখে দাঁড়িয়ে পড়ি। হটাৎ সবাই কেটে পড়ল। এতোক্ষণ যারা বিশ্রী ভাষায় ডাক্তারদের গালাগাল দিয়ে ধুয়ে দিচ্ছিল তারাও চলে গেল। একটি অজ্ঞাত মেয়ে। রাস্তায় করুণ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে কয়েকজন ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। রাত বেশি হওয়ায় বড় ডাক্তার ছিলেন না। জড়ো মানুষের ফিসফিসানি দেখে মনে হয় কোনো চটুল সংবাদ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করা হচ্ছে। একজন দু‘জন করে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে গেল। মেয়েটির হুশ ফিরেছে। তার কাতর কণ্ঠস্বর কাঁচের দরজা ভেদ করে বাইরে আসছে। অনেকেই নিজের দরদ উগড়ে দিচ্ছেন। কেউ কেউ উঁচু গলায় প্রশ্ন ছুড়ছেন, রাতেও ইমার্জেন্সিতে কেন ডাক্তার থাকল না। আবার অনেকে বলছেন, রাত-বেরাতে মানুষের সমস্যা হতেই পারে। এতো ভাল হাসপাতাল একজন বড় ডাক্তার নেই -এটা মেনে নেয়া যায়?

মানুষের চেচামেচিতে ভয় পেয়ে নার্সরা বড় ডাক্তারকে ডেকে এনেছে। পরীক্ষা করে লেডি ডাক্তার বাইরে এল। চিন্তিত মনে হচ্ছে তাকে। শোরগোল দেখে তিনি হাইহিল জুতার খটখট শব্দ তুলে এগিয়ে এলেন। বললেন, আপনাদের মধ্যে এ+ রক্ত আছে কার?-ভেতরে আসুন। মুহূর্তেই জটলা সাফ হয়ে জায়গাটা ফাঁকা হল। আমারও এ+ রক্ত। আর সবার মতো আমি কেটে পড়লাম। কিন্তু কৌতুহল থেকে গেল। মেয়েটির অবস্থা জানতে ইচ্ছে হল। মানুষের ফিসফিস শুনে সব বোঝা গেলেও তাতে তৃপ্তি হল না। কিছু দূর এগিয়ে আবার পেছনে ফিরে তাকালাম। ডাক্তারের কাছে গিয়ে শুনবো নাকি মেয়েটির কী হয়েছে? নাহ থাক।

পানি কিনতে বেরিয়ে ছিলাম। মা অপেক্ষা করছেন। এই গভীর রাতেও হাসপাতালের দোকানি বসে বসে ঝিমুচ্ছে। বাড়িতে যায়নি। ডাক দিতেই সজাগ হয়ে দোকানি ভান ধরল যেন জেগেই ছিল। আমি যেন বিষয়টি বুঝতে না পারি তাই সে বলল, বসে বসে গান শুনতেছিলাম, শরীলডা একটু ক্লান্ত, ঘুম চইলা আইছে। আজকাল সবখানে লৌকিকতায় ছাড়াছড়ি।

২. কাঁপুনি দিয়ে ফের জ্বর এল আম্মুর। ঘুমন্ত সিস্টারকে জাগালাম। সিস্টার এসে পরীক্ষা করে বলল, এখন ঘন ঘন এমন হবে, জ্বর আসবে, যাবে। অষুধ লিখে দিয়ে বললেন, বেশি খারাপ লাগলে এনে খাইয়ে দিতে। ভয়ের কিছু নেই তাও বলে গেলেন। আম্মু আমাকে ঘুমিয়ে পড়তে বললেন। সকালে উঠে আবার ছোট ভাইকে আনতে যেতে হবে মাদরাসা থেকে । আব্বু অফিস মিস দিতে পারবেন না। কোনো বোন না থাকায় আম্মুর অসুস্থতার পর থেকে বাড়ির কাজবাজসহ টুকটাক রান্নাবাড়াও করতে হচ্ছে আমাকে। বেশির ভাগ সময় খাবার-দাবার অবশ্য হোটেল থেকেই কিনে আনা হয়। ছোট ভাই এলে আরও ঝামেলা বেড়ে যাবে। ওকে কোথায় রাখবো। হাসপাতালের নিয়ম হল, রোগীর কাছে একজনের বেশি থাকতে পারবে না।

একটু আগেও প্রচন্ড ঘুম আসছিল। আম্মু ঘুমোতে বলার পর এক মুহূর্তে কোথায় যেন সব ঘুম উড়ে গেল। শুয়ে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছি। আম্মুর মনে হয় শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আম্মু আম্মু! দু‘বার ডাকলাম, তিনি কোনো সারা-শব্দ করলেন না। মনে হল, ঘুমিয়ে পড়েছেন। অথবা আস্তে ডাকার কারণে শুনতে পাননি। আম্মুর বেডের পাশে যে খালি বেডটা থাকে আমি সেটাতে ঘুমাই। তাতে আমার নিজের কাছে নিজেকে অসুস্থ অসুস্থ লাগে। মনে হয়, সবার মতো আমিও একজন অসুস্থ মানুষ। রোগী এলে অবশ্য আর এই বেডে শুতে পারবো না।  অধিকাংশ রোগীর সঙ্গের লোকদের নিচে শুতে হয়। অনেকে আবার চেয়ারে বসে বসে ঘুমিয়েই দিব্যি রাত পার করে দেন।

এসব ভাবতে ভাবতেই একজন রোগী এল। বেডটা ছাড়তে হল আমাকে। প্রথমে ভেবেছিলাম নতুন রোগী। পরে জানতে পারলাম এরা অনেক আগে এসেছে। এটা তাদেরই বেড। রোগী অপারেশন থিয়েটারে ছিল। এখন তিনি বেডে রাখার মতো সুস্থ। এই রোগীর সঙ্গে একজন মানুষ ছাড়া কেউ নেই। লোকটির সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছিলাম তাদের সংসারের কথা। ছেলেমেয়ে নেই। স্ত্রী বন্ধা। অনেক তদবির করেছে কিন্তু ফল পাননি। কোন এক ডাক্তারের অষূধ খেয়ে আজ মৃত্যুর সঙ্গে মোকাবেলা করতে হচ্ছে তাকে। জায়গা জমি যা ছিল বিক্রি করে এই হাসপাতালে উঠেছেন। সব বেচতে হয়েছে স্ত্রীর জন্য। তাতে লোকটির কোনো দুঃখ নেই। এখন তার প্রত্যাশা -স্ত্রী সুস্থ হলেই হয়। আর ছেলেমেয়ের দরকার নেই।লোকটি তার দুখের কথা বলছিলেন, আর কাঁদছিলেন। তার চোখে পানি দেখে আমার খাবার লাগছিল।

হাসপাতাল এক বিচিত্র জায়গা। কতো রকম মানুষ এখানে। দরিদ্র মানুষগুলোর নিকট থেকে হাসপাতালের আয়া থেকে শুরু করে সবাই টাকা হাতিয়ে নেয়। নিজ চোখে না দেখলে সেটা কোনোদিন বিশ্বাস করতে পারতাম না। সবখানে বখশিস দিতে দিতে হাঁপিয়ে ওঠেন অনেকেই। আমার কাছে চাইলে না করি না। যতটুুকু পারি ঝগড়া করে দিয়ে দি। অনেক মানুষই হাসপাতালের এমন কর্মকাণ্ডের শিকার হন। কিন্তু এই লোকটির মতো ‘উচিৎ শিক্ষা’ খুব কম মানুষ পেয়েছে।

৩. সে রাতে আর ঘুম হল না। বেলকোনিতে এসে দাঁড়ালাম। আকাশে অজস্র তারা। থালা ভর্তি চাঁদ। জোসনা ঝড়ে ঝড়ে পড়ছে। হাসপাতালের বারান্দা জুড়ে টিপ টিপ জ্বলছে আলো। বাতাস বইছে ফিসফিস করে। ইমার্জেন্সি বিভাগের সামনের বাতি জ্বলছিল এতোক্ষণ। বাতিটি অফ করে দেওয়া হয়েছে। রুমের সামনে একটি লাল বাতি জ্বলছে। লাল বাতিটি দেখেই বুকের ভেতর যেন কেমন করে উঠল। তাহলে মেয়েটি… নাহ এ হতে পারে না। হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে ইমার্জেন্সি বিভাগের সামনে দাঁড়ালাম। বসলাম রুমের সামনে রাখা খালি চেয়ারটিতে। কি সব ভাবতে ভাবতে হটাৎ চোখটা বুজে এল। আর ঠিক তখনই চোখের পাতায় ভেসে উঠল অন্ধকারের মতো নরম আর ক্ষতবিক্ষত ন্যাতানো একটি দেহ।

লেখক, তরুণ আলেম ও সাংবাদিক

আইএ/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন