রোজা রাখার স্বপ্নটা পুরণ হলো না সাফার

প্রকাশিত: ৬:১৩ অপরাহ্ণ, মে ১৭, ২০১৯

ইসমাঈল আযহার
পাবলিক ভয়েস

এক

রমজানের হাওয়া যখন লাগতে শুরু করেছে, সাত বছরের সাফা ঠিক করে রেখেছে, এবার সে সবগুলো রোজা রাখবে।

গত রমজানে সে রোজা রাখতো না। দাদা বলতো তোমার প্রতিদিন তিনটি করে রোজা হয়, আমাদের হয় একটা। ফজরের পর থেকে সকালের খাবার পর্যন্ত একটা, দুপুর পর্যন্ত একটা, আর দুপুরের খাবারের পর থেকে ইফতারি পর্যন্ত একটা।  সে তখন কিছুই বুঝত না, এখন অনেক কিছু বুঝে। দিনে একটা রোজা হয় তিনটা নয়। সাত বছরের মেয়েটি এখন নিজেকে যথেষ্ঠ বুদ্ধিমান ভাবতে শুরু করেছে।

দেখতে দেখতে রোজা এল। আম্মুকে খুব করে সাফা বলল, আম্মু আমি রোজ রাখবো, সাহরিতে ডাকবে কিন্তু। রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে আব্বুকেও বলল, আব্বু আমাকে ডাকবে কিন্তু, না হলে তোমার সাথে কথা বলব না।

রাতে সে অন্যদিনের চেয়ে একটু আগেই ঘুমুতে গেলো। আগে আগে না ঘুমালে যদি উঠতে না পারে। কিন্তু সাফার ঘুম আসছে না, খালি এপিঠ ওপিঠ করছে। সে তার স্বপ্ন পুরণের খুব কাছে চলে এসেছে।  একটা সময় নিজের অজান্তে সাফার চোখ বুজে গেল।

দুই

সাফা, সাফা। দু’বার ডাকতেই ধরমর করে উঠে বসলো সাফা। সাফার অনেক দিনের শখ রোজা রাখা। আগে যতবারই রোজা রাখার কথা বলেছে। সবাই বলত, তুমি তো ছোট। যখন তুমি বড় হবে তখন রেখো। আর তার দাদু বলতো ছোট মানুষের খেলেও রোজা হয়।

সাফা দ্রুত হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসলো। ঘুম ঘুম চোখে তেমন খেতে পারলো না। মোটেও খেতে ইচ্ছে করছিলো না, তবু জোর করে খেলো। না খেলে যদি রোজা রাখতে না দেয় তাই।

রোজা রেখে নামাজ না পড়লে রোজার কোনো দাম নেই, তাই সে আম্মুর সঙ্গে ফজর নামাজ পড়ে ঘুমুতে গেলো।  সারাদিন কোনোরকম কেটে গেলেও আছরের পরের সময়টা যেন কাটতে চাইছে না তার। সেকেন্ডের কাটা একবার ঘুরে আসতে খুব সময় নিচ্ছে। সাফার আম্মু সকালে খেলতে নিষেধ করে ছিলো তাকে। বারণ সত্ত্বেও সে খেলেছে, ভেবেছিলো তেমন কষ্ট হবে না। সূর্যটা যখন ক্ষয়ে ক্ষয়ে পড়ছে তখন আব্বুর চোখরাঙানি খেয়ে খেলা থামিয়ে শান্ত হয়েছে সে।

ইফতারির সময় কাছে আসছে। ক্রমে ক্রমে বাড়ছে সাফার তৃষ্ণা। একটু পানি খেতে খুব ইচ্ছে করছে তার। কয়েকবার টিউবওয়েল চেপে কুলি করেছে সে।  তৃষ্ণা মিটেনি। ইফাতারির এখনও প্রায় ঘন্টাখানেক সময় বাকি। সাফার আম্মু রান্নায় ব্যস্ত। সাফা দুবার রান্না ঘরে গেলো। তার আম্মু জিজ্ঞেস করলো, কষ্ট হচ্ছে রে মা।

সাফা মাথা নেড়ে না সূচক উত্তর দিলো। মাথা নেড়ে না বললেও তার যথেষ্ট কষ্ট হচ্ছে। এটা তার প্রথম রোজা তার ওপর দিন অনেক বড়। যেখানে বড়রাই রোজা রাখতে হিমশিম খায়, সেখানে সাফা তো ছোট্ট মেয়ে।

সাফা একবার ভাবলো, আব্বুকে বলি, রোজ রাখতে পারছি না। কিন্তু এটা বলতে তার খুব খারাপ লাগবে। কারণ আব্বু সবসময় বলে, আমার আম্মু অনেক শক্ত, আমার আম্মু এটা পাড়ে ওটা পাড়ে, একটা না একটা প্রশংসা তার মুখে লেগেই থাকে।

ইফতারির আর বেশি সময় নেই। কিছুক্ষণ পর আজান দিবে। সেই সাথে অবুঝ মেয়েটির রোজা রাখার স্বপ্নটি পূর্ণতা পাবে। জীবনের প্রথম রোজাটি সম্পূর্ণ হবে তার।

সাফা মায়ের কাছে গেলো, জিজ্ঞেস করলো, আম্মু একটু পানি খেলে কি রোজা ভাঙবে? একটু পানি খেলে রোজা নাও ভাঙতে পারে এমন ধারণা থকে সাফা প্রশ্নটি করেছে।

সাফার মা উত্তর দিলেন, হ্যা, একটু পানি খেলেও রোজা ভেঙে যাবে।

সাফা বলল, তাহলে গ্লাস ভরেই পানি খাই।

সাফার আম্মুর ইফতারি ও রান্নায় ব্যস্ত। ইফতারির সময় প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। সাফা ঘরে এলো, জগ থেকে মগ ভর্তি করলো, পানি  মুখে দিতে তার মোটেও ইচ্ছে করছে না । সাফা পানির ক্লাস ঠোঁটে ছোঁয়ালো, ঘটঘট করে পান করে ফেললো পানি। তার ঠিক একটু পরেই মুয়াজ্জিন আজান দিলো- আল্লাহু আকবার। ছোট্ট সাফার প্রচন্ড রাগ হলো মুয়াজ্জিনের ওপর। কেন সে একটু আগে আজান দিলো না!

লেখক- তরুণ আলেম, সাংবাদিক, গল্পকার

আইএ/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন