একজুটি প্রাণের বিরল ভালোবাসা : ভালোবাসার শোকে ভালোবাসার মৃত্যু (ভিডিও)

প্রকাশিত: ১:৫৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৩০, ২০১৯

একজুটি প্রাণের বিরল ভালোবাসা : ভালোবাসার শোকে ভালোবাসার মৃত্যু

— ইবনে মুসা

একজোড়া বাজরিগরের বাচ্চা। ফুরফুরে আর চঞ্চল স্বভাবের বাচ্চা দুটি সবসময আমার বা আমার ঘরের সদস্যদের হাতে থাকতে ও খেতেই বেশি পছন্দ করত। ওরা হয়ত ওদেরকে আমাদের ফ্যামিলির সদস্য হিসেবেই ধরে নিয়েছিল__আমরাও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। ঘরের ছোট ছোট বাচ্চাদের খেলার সাথি ছিলো বাজরিগর দুটি।

একটু শুরু থেকে শুরু করি।
কবুতর বা পাখি— এসবের প্রতি ছোটবেলা থেকেই দুর্বল আমি। বিভিন্ন সময় দেশি-বিদেশি কবুতর পালনের চেষ্টাও করেছি, কিন্তু সঠিকভাবে পরিচর্যার অভাবে স্থায়ীত্ব হয়নি কখনও। দুইতিন মাস আগে এক শুভাকাঙ্ক্ষী দুইজোড়া দেশি কবুতরের বাচ্চা দেন আমাকে। আমি বাচ্চা দুইজোড়া না খেয়ে খাঁচায় রেখে ওদেরকে খাবার খাওয়াতে থাকি। পনেরদিনের মাথায় ওরা ওড়তে শুরু করে।

শখের চাহিদাটা আরও বেড়ে যায়। পরে দেশি-বিদেশি প্রায় বিশ প্রজাতির কবুতর ও পাখি সংগ্রহ করি আমি। আপাতত বলা যায় একটি মিনি খামার। কবুতরের মাঝে সিরাজী, হোমা, কিং, বেন, আমেরিকান লক্ষা, হেলমেট, রেসার, গ্রিবাজ-সহ আরও সাত-আট জাতের কবুতর আছে। পাখির মাঝে টিয়া, প্রিন্স, লাভবার্ড, কোকাটেল, ঘুগু, বাজরিগর, জাভা-সহ আরও কয়েক প্রজাতির বিদেশী পাখি সংগ্রহ করেছি। আছে খরগোশও।

পাখি যদি মানুষের পোষ মানে সে পাখি বেঈমানী করে না। পশু-পাখি কথা শোনে, মানুষ তা শোনে না। মানুষ বরাবরই নেমকহারাম টাইপের।

গল্পে চলে আসি— দুটি বাজরিগরের বাচ্চাকে হাতে করে খাওয়াতে খাওয়াতে ওরা হাতে খেতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। বাসায় ফিরে ওদের একবার না দেখলে ভালো লাগত না। মেয়েরা স্কুল-মাদারাসা থেকে ফিরে সবার আগে পাখির কাছে। পাখি নিয়ে দুষ্টুমী করতে করতে দিন পার করে দিত ওরা৷ অনেকসময় খাওয়া-দাওয়ারও হুশ থাকত না। পাখি ওড়লে ওরাও পেছনে পেছনে দৌঁড়াত! পুরো ঘরের মাঝে পাখি দুটিও দৌড়ে আর উড়ে উড়ে সময় কাটাত।

পাখি দুটির মাঝেও ছিল অসীম ভালোবাসা। একটি আরেকটিকে খাইয়ে দিত, খুনসুটি করত, আবার মাঝে মাঝে ঝগড়াও করত!

একদিন পুরুষ পাখিটি জানালার গ্রিলে গিয়ে বসে। শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে জানালার বাইরে চলে যায়। দাঁড়াবার মতো কোনো কিছু না পাওয়ায় উড়ে গিয়ে পরবর্তি বিল্ডিংয়ের সানসেডে দাঁড়ায়। বাজরিগর তেমন ওড়তে পারে না। ঘরের সবাই চিৎকার দিয়ে ওঠে। আমি একপলকে তাদিয়ে থাকি। ভাষা হারিয়ে ফেলি ওর চলে যাওয়া দেখে। পাখিটিও হয়ত ভাবেনি ও আমাদের সীমানার বাইরে চলে গেছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি কাকের হামলায় পাখিটির অস্তিত্ব মুহূর্তেই বিলীন! মনে হয়েছিল কী যেন হারালাম। আপনজন হারালে মনের অবস্থা যা হয়, পাখির ক্ষেত্রেও তার চেয়ে কম হয়নি।

মহিলা পাখিটি এখন একা৷ ঘরের চারিদিক খুঁজতে লাগল সঙ্গীকে। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিলো মহিলা পাখি। শুধু চিৎকার আর চিৎকার। খাঁচায় দিলে আরও বেশি চিৎকার করত। সঙ্গীসহ খাঁচায় থাকাকালীন কখনও এভাবে কাঁদেনি ও। এভাবে একদিন কেটে গেলো। কিছুই খেলো না পাখিটি। পরদিন ওকে হাতে নিয়ে ঘোরলাম ঘরের ভেতর। হাতে এলে চুপ করে বসে থাকত, তবে কিছু খাওয়াতে পারতাম না। রাত দশটা। খাঁচায় দিয়েছিলাম ঘুমুবে বলে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখি খাঁচায় নেই! কীভাবে বের হলো? খাঁচার দুই শিকের মাঝখান থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বের হয়েছিল। একটি পাখা ভেঙ্গে গিয়েছে।

আমি আবার খাঁচায় দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। পূণরায় অনেক চেষ্টা করে খাঁচার ফাঁকা দিয়ে একটি পাখা ঢুকালো, এরপর এক পা, এরপর মাথা, বাইরে বের হওয়ার পর অন্য পাখা খাঁচায় আটকে গেলো। এভাবেই আগেরবারও বের হওয়ায় একটি পাখা ভেঙ্গে যায়। আমি পেরেশান হয়ে পড়ি। এত কষ্ট অনুভব করেছি বুঝাতে পারব না। আবার হাতে নিলাম। এবারও পাখিটি ঠাণ্ডা ও শান্ত। একেবারে জড়োসড়ো হয়ে হাতের মধ্যে বসে রইল। পরে আমার বিছানায় বালিশের পাশে রাখতেই ঘুমিয়ে পড়ে৷ ফজরের পর কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করল। খাবার দিলাম। দুইদিন হয়ে গেলো তবুও খেলো না। কিছুক্ষণ পর পৃথিবী থেকেই বিদায় নিয়ে চলে গেলো। রেখে গেলো ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত। কখনও কখনও পশু-পাখি থেকেও শেখতে হয় মানুষকে।

ভিডিও লিঙ্ক : https://youtu.be/K3oWHEMB0wA

মন্তব্য করুন