ঝড় বৃষ্টির গল্প

প্রকাশিত: ৬:০৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৯, ২০১৯

আব্দুল্লাহ আফফান

সবে মাত্র বৈশাখ শুরু হয়েছে। তাতেই সে তার তাণ্ডব দেখাতে ব্যস্ত। কখনো ঘরের চাল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কখনো বা বড় বড় ডাল এনে চালে ফেলছে। এতে তার মন ভড়ে না। তাই ঝড়ের সাথে শিলাবৃষ্টিও হয়।

আজও প্রচন্ড ঝড় হচ্ছে। বড় সুপারি গাছগুলো বাতাসের সাথে সাথে নুইয়ে পড়ছে, বাতাস কমতেই সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কড়াইয়ের মোটা ডালগুলো যেকোন সময় ভেঙ্গে কারো চালে পড়তে পারে। এ সময় ধানে শিস আসে। শিল পড়ে ধান নষ্ট হবার আশঙ্কা তারা সব সময়ই থাকে। ঝড়ের শুরুতে যে যেখানে পেরেছে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। মহিলারা উঠোন থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্র ঘরে এনে দরজা, জানালা ভাল করে বন্ধ করে বসেছে।

ঝড়ের পাশাপাশি প্রচণ্ড শিলাবৃষ্টি হচ্ছে। শিলা বৃষ্টি হলে সাধারণত শিশুরা আনন্দে শিল কুড়োয়, শিল পড়া দেখে। আজ সে সুযোগ নেই। বড় বড় শিল পড়ছে, সবচেয়ে ছোটটা রাবারের বলের সমান। এর একটা মাথায় পড়লে হাসপাতালে যাওয়া ছাড়া গতি থাকবে না। এমন শিল পড়ে টিনের চাল পর্যন্ত ছিদ্র হয়ে যায়। ফসলের তো যাচ্ছেতাই অবস্থা। এ নিয়ে বড়দের মনে চিন্তার ছাপ। মনে মনে আফসোস করছে এবারের ফসল বুঝি ঘরে তোলা হবে না।

ছোটদের চিন্তা না থাকলেও খুব একটা সুখে নেই তারা। বৃষ্টিতে লুটোপুটি করতে পারছে না। শিল কুড়াতে পারছে না। অন্যের গাছতলায় গিয়ে আম কুড়াতে পারছে না। তার বদলে হাড়ি-পাতিল, মগ-বাটি নিয়ে দৌড়া-দৌড়ি করতে হচ্ছে। টিনের চালের যেসব জায়গা শিল পড়ে ছিদ্র হয়ে পানি পড়ছে; সেখানেই পাত্র দিচ্ছে। পাত্র ভরে যাবার সাথে তা খালি করে আবার জায়গা মতো রাখা হচ্ছে।

বৃষ্টির পানি থেকে ঘর শুকনা রাখার মহান দায়িত্বটা তারা পেয়েছে। তাই কাজটা তারা আনন্দের সঙ্গেই করছে। বড়রা হম্বিতম্বি করে বলছে, এই খানে কি করতাছোস। ওই খানে যা। কোথায় পানি পড়ে দ্যাখ। এক খানে বইয়া থাকলে হইব।

উঠোনের সামনের আম গাছের মুকুল দেখে উঠতি বয়সি মেয়েরা বলেছিল, এবার মনে হয় ম্যালা আম আইব। এতো আম ক্যমনে শেষ করবা বুবু? আমরারে দেওন লাগবো কিন্তু।

তাহেরার বয়স বেশি না, চুলেও পাক ধরেনি। তার পরেও ছোট ছেলে-মেয়েরা তাকে বুবু বলে ডাকে।

তাহেরা এক গাল হেসে বলেছিল, খাইছ, খাইছ। আম তো তোরাই খাবি।

আনন্দে ভরে ওঠতো তাহেরার বুক । এক মেয়ে আর স্বামী নিয়ে তাহেরার সংসার। কাঁচা বাজারের বাড়তি খরচ বাঁচানোর জন্য বাড়ির পেছনে একেক সময়ে একেক জিনিস লাগায়। কখনো সিম, কখনো বেগুন, কখনো বা করলা, মরিচ। এতে বাড়তি আয় না হলেও নিজেদের প্রয়োজন কিছুটা মিটে।

উঠোনের এক কোনে আম গাছ লাগিয়েছিল। বেশ কয়েক বছর আম আসেনি । এবার আমের ভারে ডাল নুইয়ে পড়েছিল। কিন্তু আজকের ঝড়, আর শিলা বৃষ্টিতে আমগুলো ওঠোনে ছড়িয়ে আছে। যেগুলো গাছে এখনো রয়ে গেছে সেগুলোর মধ্যে কিছু শিল পড়ে ফেটে গেছে।

তাহেরা সেগুলোই দেখছে। বৃষ্টিতে ভিজে কয়েক ঝুঁড়ি আম নিয়ে এসেছে। এখনো অনেক আম রয়ে গেছে। সেগুলো আনার অপেক্ষায় আছে।

মা, আমগুলা কি করবা।

কি আর করমু, সবাইরে দিয়া দিমু।

দিয়া দিবা।

ক্যান তুই কি করবি, এতো আম দিয়া।

আচার বানাইয়া বইয়ামে পুরায় রাখমু।

এতো আম ছুলতে ছুলতে তোর হাত ছুইল্লা যাইব। আচার বানাবো কইলেই বানান হইয়া গেলো নাকি? কত মসলা লাগে তার হিসাব আছে। বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণ নাই বেক্কল মাইয়া আছে আচার বানান লইয়া।

আল্লায় জানে আমার বেগুন গাছগুলা আস্তা আছে নি।

তাহেরার মেয়ে সুফিয়া বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে। তাহেরা মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলল, চুপ কইরা দারায় না থাইক্কা আল্লা খোদার নাম নিতে তো পারছ। বৃষ্টি-বাদলে এমন করতে নাই। কওন যায় না কখন আল্লার গজব নামে।

লেখক: গল্পকার, সাংবাদিক

আইএ/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন