প্রশ্নপত্র ফাঁস স্বীকৃতির কুফল না দায়িত্বহীনতা?

প্রকাশিত: ৫:১৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৫, ২০১৯

প্রশ্নপত্র ফাঁস স্বীকৃতির কুফল: জুনাইদ আল হাবিব
স্বীকৃতির কুফল নয়, দায়িত্বহীনতা: জুবায়ের আহমদ আনসারী

সম্মিলিত কওমি শিক্ষাবোর্ডের প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়াকে স্বীকৃতির কুফল বলে মনে করেন মাওলানা জুনাইদ আল হাবিব। অন্যদিকে মাওলানা জুবায়ের আহমদ আনসারী ব্যাপারটিকে স্বীকৃতির কুফল বলতে রাজি নন। তাঁর ভাষায় এটি দায়িত্বের অবহেলাজনিত একটি দুর্ঘটনা। তবে স্বীকৃতি ইস্যুতে দু’জন পরষ্পর বিরোধী অবস্থানে থাকলেও এ ব্যাপারে দুজনেই একমত যে, ব্যাপারটি অনাকাঙ্খিত এবং দুঃখজনক। এর মাধ্যমে কওমি ঐতিহ্যের গায়ে একটি কলংকের দাগ লাগিয়ে দেওয়া হল। দায়ীদের চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানালেন তাঁরা।

আজ মধ্যরাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত বেফাস কিছু জিজ্ঞাসা নিয়ে কথা বলছিলাম বাংলাদেশের কওমি অঙ্গনের দুটি পরিচিত মুখ, দু’জন জনপ্রিয় বক্তা হাফিজ মাওলানা জুবায়ের আহমদ আনসারি এবং মাওলানা জুনাইদ আল হাবিব-এর সাথে। দু’জনের কাছেই আমার প্রথম জানতে চাওয়া ছিল প্রশ্নপত্র ফাঁস ব্যাপারটিকে তাঁরা কীভাবে দেখছেন। চলুন তাদের কথাগুলো তাদের ভাষাতেই শোনা যাক।

মাওলানা জুনাইদ আল হাবিব বললেনঃ ‘আমি দেশের বাইরে আছি বলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারটি কতটুকু সত্য, বিষয়টি আমার কাছে এখনো পুরোপুরি ক্লিয়ার না। সত্যি হলে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্থি হওয়া দরকার। সেইসাথে হাইয়াতুল উলিয়ার কর্তৃপক্ষকেও জবাবদিহি করা উচিত। আমি মনেকরি এটা সনদের স্বীকৃতি গ্রহণের কুফল; যদিও স্বীকৃতির জন্য একসময় আমরাই আন্দোলন করেছিলাম’। তিনি বলেন, ‘আগামীতে এই স্বীকৃতির প্রভাবে কওমি অঙ্গন থেকে ইলম উঠে যায় কিনা আমি সন্দিহান। একই সাথে সামনের দিনগুলোতে ছাত্ররাও পরীক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন অনৈতিক তৎপরতায় জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আমার ধারনা।

– আপনি প্রশ্নপত্র ফাস হওয়ার ব্যাপারটিকে স্বীকৃতির কুফল বললেন। তাহলে কি স্বীকৃতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল? যারা স্বীকৃতি আদায় বা গ্রহণের সাথে ছিলেন, তাঁরা ভুল করেছিলেন… পালটা প্রশ্ন করলে মাওলানা জু্নাইদ আল হাবিব বললেন, ‘আমি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। সময়ই বলে দেবে কী ঠিক ছিল আর কী ভুল’।

তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার জন্য পরিচিত মেধাবী রাজনীতিবিদ মাওলানা জুনাইদ আল হাবিব ব্যাপারটি নিয়ে কেন আর মন্তব্য করতে রাজি হলেন না_ যারা বুঝবার তাঁরা ঠিকই বুঝে ফেলেছেন। কেউ বুঝতে না পারলে আপনার না-বুঝলেও সমস্যা হবে না-ইনশাআল্লাহ।


একই প্রশ্নের জবাবে মাওলানা জুবায়ের আহমদ আনসারি মাওলানা জুনাইদ আল হাবিবের সাথে ভিন্নমত পোষণ করে বললেন, ‘আমি মনে করি না প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারটি স্বীকৃতির কুফল। কওমি সনদের স্বীকৃতির দাবিটি আমাদের অনেক দিনের পুরনো একটি দাবি ছিল। শাইখুল হাদিস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এই দাবিতে দিনের পর দিন রাস্তায় শুয়ে থেকেছেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা অবশ্যই দায়ীদের কঠোর বিচারে চাই। তবে এ জন্য স্বীকৃতি গ্রহণের ব্যাপারটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ঠিক হবে না। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের উলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে এবং তত্ত্বাবধানে এবং দারুল উলুম দেওবন্দের উসুলে হাশতেগানার আলোকে কওমির স্বকীয়তা বজায় রেখেই এই স্বীকৃতি গ্রহণ করা হয়েছে। বিগত সরকারগুলোর কাছেও আমাদের সেইম দাবি ছিল। তারা আমাদের দাবি মেনে নেয়নি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মেনে নিয়েছেন। এ জন্য আমরা তাঁকে ধন্যবাদও জানিয়েছি।


এ জন্যই কি আপনারা তাকে কওমি জননী খেতাব দিয়েছিলেন… জিজ্ঞেস করলে মাওলানা আনসারি বলেন, ‘আমরা কাউকে কোনো খেতাব দেই নাই। সেটি একজন ব্যক্তি তার নিজস্ব স্বার্থে বলে ফেলেছিলেন। এটার সাথে হাইয়াতুল উলিয়ার কোনো সম্পর্ক ছিল না।

কথার এই পর্যায়ে মাওলানা জুনাইদ আল হাবিব ইন্টারফেয়ার করে বললেন, ‘বিশেষ স্বার্থ মানে বুঝেন নাই? বেচারার এম্পি হওনের শখ হইছিল। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করণের লাইগ্যা এইসব করছে। আনসারিও সায় দিলেন। বললেন, কথা সত্য। দেখেন নাই ছাত্রদের কী গেঞ্জি পরাইয়া লইয়া আইছিল?
.
বাংলাদেশে অনেকগুলো কওমি বোর্ড রয়েছে, যেগুলো জীবনেও এক হতে পারেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে আমরা সেগুলোকে এক হতে দেখলাম। কী বলব, এতদিন এক হতে না-পারাকে উলামায়ে কেরামের ব্যর্থতা নাকি এক করতে পারাকে শেখ হাসিনার সফলতা?

প্রশ্নটি একটু বিব্রতকর ছিল। আমি জানতাম সরাসরি জবাব দেওয়া তাদের জন্য একটু মুশকিল। মাওলানা জুবায়ের আহমদ আনসারী প্রধানমন্ত্রীর সফলতা স্বীকার করলেও ব্যাপারটিকে উলামায়ে কেরামের ব্যর্থতা বলতে রাজি হলেন না। তিনি বললেন, ‘আসলে যে কোনো সরকারই যখন ক্ষমতা থাকে, তখন তারা আন্তরিক হয়ে কোনো উদ্যোগ নিলে এমন অনেক সমস্যারও সমাধান করা সম্ভব হয় যা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না। তবে একই প্রশ্নের জবাবে মাওলানা জুনাইদ আল হাবিব কিছুটা উত্তেজিত হয়েই বললেন, ‘ব্যাপারটি প্রধানমন্ত্রীর সফলতা নাকি কওমি উলামার ব্যর্থতা- বিষয়টিকে আমি এই দৃষ্টিকোন থেকে না দেখে বরং আলেম নামধারী কিছু উলামায়ে ছু’র সফলতা বলতে চাইব।

উলামায়ে ছু বলতে তিনি ঠিক কাদের মিন করলেন; এই প্রশ্নটি আমি আর তাঁকে করতে গেলাম না। আমি চাইলাম না রাগের বসে তিনি কারো নাম নিন আর বিব্রতকর একটা পরিবেশ তৈরি হোক।

পরিবেশটা একটু ভারি হয়ে গেছে। হালকা করা দরকার। স্বীকৃতির সাতকাহন থেকে ফিরে এলাম প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারে। বললাম, দায় কার? এই যে কওমির ইতিহাসকে কলঙ্খিত করাহল, এ জন্য দায়ী কে, সিস্টেম না দায়িত্বশীলগণ? দুজনেই বললেন, অবশ্যই বোর্ড দায় এড়াতে পারে না। বোর্ড কর্তৃপক্ষ পরিপূর্ণ তদারকি এবং যথাযথ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেনি। আগামীর জন্য সতর্ক হওয়া দরকার। যোগ্য এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দায়িত্বে বসানো দরকার।

 


বিভিন্ন মাদরাসায় হাদিস পড়াচ্ছেন- এমন অনেক মুহাদ্দিস সাহেবদেরও নতুন করে পরীক্ষা দিতে দেখা যাচ্ছে। ব্যাপারটিকে কীভাবে দেখছেন__ এমন প্রশ্নের জবাবে আনসারী বললেন, এটি বন্ধ হওয়া দরকার। এ জন্য দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষার জন্য বয়সের একটা সীমারেখা নির্ধারিত থাকা উচিত। প্রবেশপত্রে ছবির ব্যাপাররেও ভাবা যায়। তবে জুনাইদ আল হাবিব হালকা দ্বিমত জানালেন। তার কথা, অনেক বয়ষ্ক লোকও ফজিলত হাসিলের জন্য বিভিন্ন মাদরাসায় ভর্তি হয়। বয়সের সীমাবদ্ধতা থাকলে তাঁরা ইলমে দ্বীন থেকে মাহরুম হয়ে যাবে। সুতরাং ব্যাপারটিকে নিয়ে অন্যভাবে ভাবা দরকার। তবে অন্যভাবেটা কীভাবে- সেটা আর তিনি খোলাসা করে বলেননি।


 

হাইয়াতুল উলিয়া, হেফাজতে ইসলাম এবং তাবলিগ; তিনটা তিন কোয়ালিটির প্রতিষ্ঠান। হাইয়াতুল উলইয়া শিক্ষাবোর্ড। হেফাজত ধর্মীয় সামাজিক আন্দোলন। তাবলিগ নিরিহ-টাইপ দাওয়াতের মেহনত। আমরা সবগুলোকে একসাথে জড়িয়ে ফেলতে দেখি। কারো একটার সাথে দূরত্ব বা দ্বিমত তৈরি হলে তাকে বাকিগুলো থেকেও খারিজ করে দেওয়া হয়। কেন হয় এমন… জানতে চাইলে দুজনেই বললেন, এই সবগুলো সংগঠনই মূলত দারুল উলুম দেওবন্দ তথা কওমি আঙিনার সংগঠন এবং কওমি উলামার নেতৃত্বে বা তদারকিতে পরিচালিত। সুতরাং আলাদা করে দেখার অবকাশ নাই।

তাদের এই বক্তব্যের সাথে আমার দ্বিমত থাকলেও এবং পালটা যুক্তি দাঁড় করানোর সামান থাকলেও সেদিকে আর আগালাম না। থাকুক কিছু ব্যাপার পাঠকের জন্য, যার যার ভাবনার মতো করে।।

এই যে হাজার হাজার ছাত্র বিড়ম্ভনার শিকার হলো, অন্যের পাপের যারা শাস্থি পেলো, তাদের উদ্দেশ্যে আপনাদের কিছু বলার আছে? আপনারা কি তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে রাজি হবেন… জানতে চাইলে মাওলানা জুনাইদ আল হাবিব বললেন, ‘শুধু দুঃখ প্রকাশ কী, আরো কিছু বলার থাকলে সেটাও বলা দরকার। ছেলেগুলোকে গুটি কতেক স্বার্থান্বেষী নীতিহীন মানুষের অপকর্মের বলির পাঠা হতে হলো’। আনসারি বললেন, ‘অবশ্যই ছাত্রদের প্রতি আমি সহমর্মী। তাদেরকে বড়দের উপর আস্থা রেখে আদব ও ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলার আহবান জানাই।

রাত অনেক হয়েগেছে। দুজনের চোখ ঘুমে ঢুলু ঢুলু। কথা শেষ করা দরকার। বললাম, আচ্ছা একটা কথা বলি। মাঝেমধ্যে ছাত্রদের নসিহত করতে যেয়ে আপনাদের বলতে শুনি ‘এই কওমি মাদরাসার থেকেই এক সময় হুসাইন আহমদ মাদানি, আনওয়ার শাহ কাশমিরি, আশরাফ আলি থানবীর জন্ম হয়েছে…’, আচ্ছা, কখনো যদি মুখকাটা টাইপ কোনো ছাত্র বলে বসে, যে দারস থেকে মাদানি কাশমিরি থানবীর জন্ম হয়েছিল, সেই মসনদে তো বসা থাকতেন শায়খুল হিন্দ। আপনারা আমাদের জন্য শায়খুল হিন্দের ব্যবস্থা করুন, আমরা মাদানি হতে চেষ্টা করব- তখন?

জুনাইদ আল হাবিব বললেন, আপনার কথা সত্য। আমরা শায়খুল হিন্দ হতে পারিনি কিন্তু ছাত্রদের মাদানি হতে বলি। তবে এটাও সত্য যে, মাঝেমধ্যে এমন অনেক উস্তাদও আছেন যাদের ইলমি কাবিলিয়ত হয়ত ততটা ঊর্ধ্বে নয়, কিন্তু তাদের রূহানিয়্যাতের কারণে ছাত্ররা অনেক বড় হয়ে উঠে।

মাওলানা জুবায়ের আহমদ আনসারি একজন জনপ্রিয় মুফাসসিরে কোরআন। মাওলানা জুনাইদ আল হাবিব একজন জনপ্রিয় বক্তা। সম্প্রতি বাংলাদেশে সরকার কর্তৃক ওয়াজ নিয়ন্ত্রনের একটা আইন নিয়ে কথা হচ্ছে। ব্যাপারটি নিয়েও তাদের সাথে কথা বলবার ইচ্ছা ছিল। ফজরের আযান হয়ে গেছে। অন্যদিন কথা বলা যাবে। তারা তো আছেনই।

মন্তব্য করুন