প্রকৃত কাসেমী কারা?

প্রকাশিত: ৫:০৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৮, ২০১৯

মুহাম্মদ আরিফ রব্বানী

মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, আল-আজহার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা এবং দিল্লির জামেয়া রাহমানিয়া—এসব বিশ্বখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যারা লেখাপড়া করে আসেন বা কোনো বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন তারা নামের শেষে যথাক্রমে ‘মাদানী’, ‘আজহারী’, ‘নদবী’ ও ‘রাহমানী’-জাতীয় লকব (উপাধি) ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু ব্যতিক্রম দেখা যায় দেওবন্দ মাদরাসায় পড়ুয়া ছাত্রদের বেলায়। তারা দেওবন্দ পড়াশোনার পর নামের শেষে ‘দেওবন্দী’ না লাগিয়ে লাগায় ‘কাসেমী’।

দেওবন্দির জায়গায় ‘কাসেমী’ লাগানোতে দোষের কিছু নেই। কাসেমী নামের লোকটির প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করতে গিয়েই হয়তো এমনটি করা হয়। কারণ দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পেছনে যে ছয়জন মনীষার অবদান অনস্বীকার্য তাদের প্রধান হলেন ‘মাওলানা মুহাম্মাদ কাসেম নানুতুবি রহ.।’ যেহেতু দেওবন্দনামক এই বিশাল পাঠশালার রূপকার ছিলেন তিনি তাই তার দিকে নিসবত করেই নামের শেষে ’কাসেমী’ লাগানো হয়।

দেওবন্দপড়ুয়া ভাইয়েরা নিজেদের নামের শেষে ‘কাসেমী’ যুক্ত করে বুঝাতে চান, আমরা কাসেম নানতুবির ছাত্র, ভক্ত, অনুসারী, উত্তরসূরি ও কাসেমীত্বের ‘আমানত’ রক্ষাকারী। কাসেম নানুতুবি যেহেতু একটি চেতনা, একটি আদর্শ ও একটি বিপ্লব তাই আমরা যারা ‘কাসেমী’ আছি তারা সেই চেতনায় উজ্জীবিত হতে চাই, সেই আদর্শে আদর্শবান হতে চাই এবং সেই বিপ্লবী কাফেলার সঙ্গী হতে চাই।


অতএব কাসেমীত্বের দাবি হলো হযরত কাসেম নানুতুবির চিন্তাচেতনার বাস্তবায়ন ঘটানো। নানতুবির গুণগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের মাঝে প্রবেশ করানো। দেওবন্দ মাদরাসা যে উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয়েছে সেটা পূরণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। সাথে সাথে আদবকায়দা, আমল-আখলাক, চলাফেরা, কথাবার্তা, মুআমালাত, মুআশারাতসহ যাপিত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কাসেম নানতুবির যেসমস্ত ভালো দিক আছে সেগুলোর অনুসরণ করা। তাহলেই না কাসেমী লকবের যথার্থ মূল্যায়ন হবে। তবেই না আপনি প্রকৃত কাসেমীর দাবিদার হতে পারবেন। দেওবন্দ মাদরাসায় পড়লাম। নামের শেষে কাসেমী যুক্ত করে দিলাম। অথচ আমার মাঝে না আছে দেওবন্দিয়াত না আছে কাসেমীর আদর্শ? যে উগ্রতা নিয়ে দেওবন্দ গিয়েছি; দেওবন্দ পড়ার পরও যদি সেই উগ্রমেজাজই থেকে যায় তাহলে দেওবন্দ পড়ার স্বার্থকতা রইল কই? আমার কথার ভারসাম্য যদি ঠিক না থাকে, আমার লেখায় যদি তাসলিমা নাসরিনদের গন্ধ পাওয়া যায় তাহলে ’কাসেমী’ লকব লাগানোর কী দরকার?


দেওবন্দ হলো একটা ব্রান্ড। আর এই ব্রান্ডের লোগো হলো ‘কাসেমী’। আপনি এই লোগো ব্যবহার করবেন আবার আপনার মাঝে দেওবন্দিয়াত ও কাসেমীয়্যাত পয়দা করবেন না তাহলে আপনার দ্বারা ঐ ব্রান্ডের ক্ষতি ছাড়া দ্বিতীয় আর কী-ইবা হতে পারে?

মুফতি ফয়জুল করিম হাফিজাহুল্লাহ যথার্থই বলেছেন, ”রাসুলের দরসে বসলেই যেমন সাহাবি হওয়া যায় না তদ্রূপ দেওবন্দ পড়লেই কাসেমী হওয়া যায় না।” নিজের মাঝে দেওবন্দিয়াত এবং কাসেমীয়্যাত পয়দা করতে না পারলে আপনার মাঝে আর ঐ লোকদের মাঝে কোনো পার্থক্য থাকবে না; যারা নিজেদের ‘আশেকে রাসুল’ দাবি করে কিন্তু রাসুলের একটি সুন্নতও তাদের মাঝে ভালোভাবে নেই। তারাও যেমন রাসুলের আশেক দাবি করে ভণ্ডামি করে আপনারাও তেমন কাসেমীর উত্তরসূরি দাবি করে একপ্রকার ভণ্ডামি করে যাচ্ছেন।

মানুষ হিসেবে আপনার ভেতর আক্রোশ জন্মাতেই পারে। কারো প্রতি আপনি ক্ষুব্ধ হতেই পারেন। কাউকে আপনার ভালো নাও লাগতে পারে। কারো কথা আপনার অপছন্দ হতেই পারে। কারো কাজকর্ম আপনার দৃষ্টিতে সঠিক না হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তাই বলে আপনি তাকে পরাস্ত করার জন্য, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার জন্য, তার মানমর্যাদা হেয় করার জন্য এমন ভাষার আশ্রয় নিবেন যেগুলো সভ্যসমাজে কেউ বলতে ইতস্তবোধ করে। কেন আপনি অশালীন ভাষা ব্যবহার করবেন। আপনি যখন কাসেমী তখন আপনার গালিটাও হবে শালীন ভাষায়। সদাসর্বদা আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে যে, আমি কাসেমীত্ব পয়দা করতে না পারি, দেওবন্দিয়াত লালন করতে না পারি কিন্তু এমন কাজ করা যাবে না যার দ্বারা কাসেমীর অপমান হয়, দেওবন্দের বদনাম হয়।

মন্তব্য করুন