সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম: একজন নিরহংকারী শায়েখ

প্রকাশিত: ৪:২৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৯
বিশেষ মতামত
—মুহাম্মাদ আরিফ রব্বানী
ইমাম সাহেব ভুল করতেই পারে। মুক্তাদির উচিত লুকমা দেওয়া। মুক্তাদির লুকমা ইমাম সাহেব গ্রহণ না করলে তখন মুক্তাদির জন্য আবশ্যক হবে জামাত ছেড়ে দেওয়া। এটি ছোট ইমামের ক্ষেত্রেই হোক বা বড় ইমামের ক্ষেত্রে। কিন্তু ইমামের ভুলটাকে না ধরিয়ে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা কোনক্রমেই উচিৎ নয়। হাদিসে বলা আছে, ‘একজন মুমিন অপর মুমিনের আয়নাস্বরূপ।’ আয়নার সামনে দাঁড়ালে যেমন চেহারার খুঁটিনাটি সব ভেসে উঠে তদ্রূপ একজন মুমিনের সামনে অপর মুমিন দাঁড়ালেও যেন তার ভুলত্রুটি সব ভেসে উঠে। তখন মুমিনের জন্য করণীয় হল, সুন্দরভাবে উত্তমপন্থায় ভুলটা ধরিয়ে শুধরানোর ব্যবস্থা করা। একবার, দুবার নাহলে তিনবার ভুলের ব্যাপারে অবগত করানো। যারা ইমানদারিত্বের দাবি করে তাদের প্রাথমিক কাজ এটাই হবে।
কিন্তু আমরা এর ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত করি। সেটা হল, হাজারো ‘হক’ কথার মাঝে দুএকটি ‘বেহক’ কথা যদি ভুলক্রমেও এসে পড়ে তখন সেগুলো আসলেই বক্তার বক্তব্য কিনা সেটা বিবেচনায় না রেখেই ‘ট্রল’ জাতীয় একপ্রকার ভাইরাসে জড়িয়ে পড়ি। ট্রলটাকে ভাইরাস বললাম এজন্য, যারা এ রোগে আক্রান্ত হয় তারা কখনো স্বস্তিতে থাকতে পারে না। সারাক্ষণই চিন্তায় থাকে কীভাবে কার কোন বিষয়টা নিয়ে অনলাইন গরম রাখা যায়! অবশ্য বাংলাদেশেই এ রোগটা সর্বাধিক বেশি ছড়িয়েছে। এ রোগের কালো থাবা থেকে বাঁচতে পারেনি কতিপয় মাদরাসাপড়ুয়া ছাত্র-শিক্ষকরাও। তাইতো দেখা যায়, প্রতিপক্ষের একটু খুঁত পেলেই হুমড়ি খেয়ে পরে যায়। কীভাবে, কোন ভঙ্গিতে আক্রমণ করে ঝাল মেটানো যাবে তা নিয়েই ব্যস্থ থাকে তারা। কিন্তু মানবজাতি যে ‘ভুলের ঊর্ধ্বে নয়’ সেটা যেন স্বীকারই করতে চায় না অনেকে।
সৈয়দ মুফতি ‘ফয়জুল করিম’ হাফিজাহুল্লাহকে আমার ভালোবাসার অন্যতম একটি দিক হল, তিনি সত্য মেনে নিতে দ্বিধা করেন না। ভুলকে স্বীকার করতে কার্পণ্য করেন না। প্রকাশ্যে ভুল হলে প্রকাশ্যে ক্ষমা আর গোপনে ভুল হলে গোপনে ক্ষমা চাওয়ার মতো সৎ সাহস এ লোকটি মাঝে বিদ্যমান, আলহামদুলিল্লাহ। ভুল বা তাসামুহের পক্ষে অভিনব কোন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে তার ওপর অটল থাকার গোঁড়ামিভাব তাঁর মাঝে নেই বললেই চলে। যখনই বড়রা কোনো বিষয়ের প্রতি অবগত করিয়েছেন কিংবা নিজ থেকেই বুঝতে পেরেছেন তখনই নিঃশর্তভাবে সেটা থেকে ফিরে এসেছেন।
ইলম্-আমলের প্রশ্নে তিনি কতটা অগ্রসরমান সেদিকে আমি যাব না। কেননা তাঁর মাঝে কী আছে না আছে সেটা  তাঁর সাথে কিছুক্ষণ সময় দিলেই ঠাহর করতে পারবেন। দূর থেকে তো হাতিকেও মশা মনে হয়। যাজ্ঞে, আমি বলতে চাচ্ছি যে, যার লাখো অনুসারী রয়েছে সে ব্যক্তির এভাবে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে আসাটাই কি প্রমাণ করে না তিনি কতটা সত্যপ্রিয়, বিনয়ী ও  নিরহংকারী? ভ্রান্ত আকিদাবাদির জন্য যিনি ‘এটম বোম’ তিনি নিজেই কীভাবে ভ্রান্তচিন্তার অধিকারী হতে পারে? পদস্খলন তো মানুষেরই হবে। তাই বলে কোমড় বেধে ঝাপিয়ে পড়তে হবে তার বিরুদ্ধে—এটা কিসের ইসলাম? পিছন থেকে লুকমা না দিয়েই জামাত ছেড়ে দিবেন—এটা কোথায় পাইছেন?
এতবড় একটা হক জামাতের প্রতিনিধিত্ব যিনি করছেন তিনি সাহাবাবিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করবেন—এটাও কি বিশ্বাস করার মতো? আর যদিও বা করে সেটা কি এতো সহজেই প্রকাশ করে দিতেন? আমাদের উগ্র মনোভাব পরিহার করা উচিত। ছুতা পেলেই নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে ব্যক্তি আক্রোশ মেটানোর প্রবণতা বন্ধ করা উচিত। যারা-ই এপর্যন্ত বিভিন্নভাবে শাইখকে আক্রমণ করার চেষ্টা করেছেন তারা কি তাদের দেওয়া পোস্টগুলো ডিলিট করার সদিচ্ছা রাখেন? শাইখের ওয়াজাহাত-মূলক ভিডিও বার্তার পরেও যারা নিজেরা ওয়াজাহাত-মূলক পোস্ট করেননি তারা কি পূর্বের পোস্টগুলো আসলেই ভুল শোধরানোর জন্য করেছে বলে ধরা হবে? নাকি বলা হবে তারা আত্মপ্রবঞ্চনায় পড়ে কিংবা কারো মনোবাসনা পূরণের প্রয়াসে এমনটা করেছে?
আমার শাইখ কারো কানপড়াতে গলে যায় না। নিজস্ব বোধ-বিবেচনার ভিত্তিতে হককে বেঁচে নেন তিনি। আমি তাকে ভালোবাসি কারণ আল্লাহপাক তাঁকে ভালোবাসেন বলে। আমি তাকে মুহাব্বাত করি কারণ আমার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে মুহাব্বাত করেন বলে। যতদিন হক ও হক্কানিয়্যাতের ওপর তিনি অটল থাকবেন ততদিন আমার ভালোবাসা তাঁর প্রতি উৎসর্গিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
আমি আমার ব্যক্তিগত একটি পোস্ট-এ বলেছিলান, অতি দ্রুতই তিনি ওয়াজাহাত করবেন এবং ট্রলবাজদের তিরস্কারের পরিবর্তে প্রশংসা করবেন। আমার মনের তামান্না যেন বাস্তবরূপ লাভ করেছে। আমার শাইখ ওয়াজাহতও করেছেন এবং বিরুদ্ধাচরণকারীদের শুকরিয়াও জানিয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ।
পরিশেষে একটি কথা বলি, শাইখ ফয়জুল করিম সাহেব এমন মানুষ নন যিনি ভুল জানার পরেও তার ওপর অটল থাকবেন। সত্যগ্রহণে তিনি সদা তৎপর। আল্লাহপাক এমন লোকদের ছায়া আমাদের ওপর দীর্ঘায়িত করুন, আমিন।
ছাত্র, জামিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলুম, ঢাকা।

মন্তব্য করুন