একজন অবমূল্যায়িত ‘আল মাহমুদ’

প্রকাশিত: ৩:২২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৯
—মুহাম্মাদ আরিফ রব্বানী
আমিসহ আমাদের একটা বদ অভ্যাস হলো, কেউ মরার  পর আমরা তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে যাই। তার যত কৃতিত্ব আছে সব কেমন যেন গর্ত খুড়ে বের করে আনি। আবেগ আর ভালোবাসা গদগদ করে উঠে আমাদের। কে কোন ভাষায় মৃত ব্যক্তির পক্ষে সাফায় গাইতে পারব এ নিয়ে শুরু করি প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে ফেসবুকে একেকজনের অনুভূতিমূলক পোস্ট দেখে মনে হয় এ লোকগুলো যেন মৃত ব্যক্তির হাজার বছরের পরিচিত। অথচ বাস্তবতা পুরাই উলটো। ভালোবাসা প্রদর্শনমূলক এই দিকগুলোকে আমি একেবারে খারাপ বলছি না।
যারা এমন অনুভূতি প্রকাশ করেন তাদের জন্য রইল আমার পক্ষ থেকে বাড়তি একটা ধন্যবাদ। তবে আমাদের ভালোবাসা, আবেগ, অনুভূতি আর প্রশংসাগুলো যদি জীবিত থাকাবস্থায় প্রকাশ করতে পারতাম তাহলে এখনকার চেয়ে দিগুণ ফায়দা হতো। প্রশংসিত ব্যক্তি তার কর্মের ওপর আরও উদ্যমী হয়ে উঠতো। কাজের গতি আরও বহুগুণে বেড়ে যেত। বিশেষ করে যারা লিখনীজগতে কাজ করে তাদের কাছে বন্ধুবান্ধব, বাবামা, ভাইবোন ও নিকটাত্মীয়দের একটু উৎসাহ বিশাল কিছু মনে হয়। এটি আমার ব্যক্তিগত অভিমত নয়, প্রতিটি লেখক এবং লেখকপ্রত্যাশীদের দিলের কথা। আজ কবি ‘আল-মাহমুদ’ আমাদের মাঝে আর নেই। তিনি তার সততা, বিশ্বস্ততা ও ইসলামপ্রিয়তার কারণে ইসলামি অঙ্গনে যুগযুগ বেঁচে থাকবেন। তার কবিতা আমাদের অনুপ্রেরণা যুগাবে।
তাকে ‘আইডল’ মনে করে অনেকেই তার পথ অনুসরণ করে চলবে। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আমরা যেভাবে তার প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছি একটু ভাবুনতো তার হায়াতকালে এর ছিটেফোঁটাও যদি দেখাতে পারতাম তাহলে তিনি কতটা অনুপ্রাণিত হতেন? কতটা উদ্যমী হয়ে উঠতেন? আমাদের ওপর কতটা ভরসা করতে পারতেন? মাঝে মাঝে আমার কাছে মনে হয়, আমরা ফেইসবুকজুড়ে এই যে প্রশংসা আর কৃতিত্ব বয়ান করে যাচ্ছি এটা স্রেফ মুখের বুলি মাত্র। দিল থেকে একদমই নয়! অনেকে তো দুএকটা লাইক কমেন্ট বেশি পাওয়ার আশায় সরাসরি মৃত ব্যক্তির সাথে কোন এককালে তোলা পিক আপলোড দিয়ে পোস্ট করে দেয়। যদি তাই-ই না হয় তাহলে মৃত ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসা দুএকদিন পরেই উবে যায় কেন? কেন তিনদিন পরেই ভুলে যায় তাকে। কেন খুঁজ নেই না মৃতের পরিবার কেমন আছে? কীভাবে কাটছে তাদের যাপিত জীবন? খোঁজখবর নেওয়ার সক্ষমতা যাদের একেবারেই নেই তাদের কথা বাদই দিলাম।
যাদের আছে তারাও তো কোন পদক্ষেপ নেন না। তাহলে তো বলতেই হয় এসব ভালোবাসা স্রেফ লোক দেখানো বৈ কিছু নয়। ইসলামি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সূতিকাগার সঙ্গীতসম্রাট মরহুম মাওলানা ‘আইনুদ্দিন আল আজাদ’ রহ. এর মৃত্যুতেও আমাদের এমন মায়াকান্না দেখা গেছে। হৃদয়ের সবটুকু অনুভূতি মিশিয়ে অন্তরজ্বালা প্রকাশ করেছি আমরা। কিন্তু আজ আইনুদ্দিনপ্রেমের দহনে দগ্ধ হওয়া ঐসব প্রেমিকেরা কই? কেউ কি আছেন যিনি বলতে পারবেন আইনুদ্দিন আল আজাদের পরিবারের বর্তমান হালত? কেউ কি আছেন যিনি আইনুদ্দিনের স্বপ্নময়ী সেই মাদরাসার অবস্থাদি জানাতে পারবেন? হয়তো কেউ এগিয়ে এসে বলবেন, ঐদিন না আমি তার মাদরাসায় গেলাম। খোঁজখবর নিয়ে এলাম। আমি বলব, ওটা শুধুমাত্র ফটোসেশনের জন্য গিয়েছিলেন। এছাড়া ভিন্ন কোন ফায়দা হয়নি আপনার দ্বারা। এ কথা শুধু আইনুদ্দিন আল আজাদের একার জন্য নয়। খুঁজলে এমন ডজনখানেক আইনুদ্দিন বেড়িয়ে আ
যাদের মৃত্যুতে আমাদের ভালোবাসা উথলিয়ে উঠেছিল কিন্তু দুদিন বাদেই সব উধাও হয়ে গেছে! আমার কথায় কী বুঝলেন? কারো মৃত্যুতে সহানুভূতি প্রকাশ করতে অনীহাভাব প্রকাশ করলাম। না ভাই, মোটেও এটা উদ্দেশ্য নয় আমার। আমি প্রথমত বুঝাতে চেয়েছি আমরা ‘দাঁত থাকতে দাঁতের কদর করতে জানি না।’ যত কদর করি সব মরার পর। যখন আমাদের কদরের কোনো ফায়দা হয় না। দ্বিতীয়ত বুঝাতে চেয়েছি, যে লোকগুলোর প্রতি আমাদের অঘাত ভালোবাসা থাকে তাদের মৃত্যুর পর সাধ্যমতো পরিবারের হালত বুঝতে চেষ্টা করা। কোনপ্রকার সাহায্য লাগবে কিনা সেটা জানা।
ইসলামের পথে যারা কাজ করে যাচ্ছেন তাদের মূল্যায়ন করা আমাদের একান্ত কর্তব্য। তাদের প্রতি ভালোবাসূলভ আচরণ করা আমাদের দায়িত্ব। তাদের কাজের গতি বাড়ানোর জন্য বেশি মাত্রাই উৎসাহ দেওয়া আমাদের উচিত। আজ কবি ‘আল মাহমুদ’ নেই। কিন্তু তার বিশ্বাস ও মতের সাথে মিলে—এমন আরেকজন কবি আমাদের মাঝে বিদ্যমান।
যাকে এতোমধ্যেই মুসলিম জাহানের ‘জাতীয় কবি’ হিশেবে বহির্বিশ্বে ভূষিত করেছে। যিনি আমাদের চেতনাকে শানিত করতে একেরপর এক কবিতা উপহার দিয়ে যাচ্ছেন। সেই চেতনার কবি হচ্ছেন আল্লামা ‘মুহিব খান’। আজ তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন বিধায় তাকে অনেকেই গুরুত্ব দিচ্ছি না। কিন্তু কাল সে হারিয়ে গেলে আমরাই আবার তার কৃতিত্ব নিয়ে গর্ব করবো। তার অবর্তমানে আমাদের সেই গর্বের কোন দাম নেই।
তাই আসুন এখন থেকেই কবি মুহিবখানসহ ইসলামি অঙ্গনে যারা নিঃস্বার্থ কাজ করে যাচ্ছেন, যারা ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ সেইসব লেখক, গায়ক, সংগঠক ও আলেমসহ সকলকে কদর করতে শিখি। যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে শিখি। তাহলে এদের দ্বারাই ইসলামের আরও বেশি উপকার হবে, ইনশাআল্লাহ। পরিশেষে আবারও বলছি, আসুন! দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দিতে শিখি। ছাত্র, জামিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলুম, ঢাকা।

মন্তব্য করুন