অনৈক্য : আমাদের করণীয় কী? মুহিব খানের সাক্ষাৎকার (দ্বিতীয় পর্ব)

প্রকাশিত: ৭:০১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৩, ২০১৯

 প্রথম পর্বের পর

পাবলিক ভয়েস : এদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইস্যুর ওপর ভিত্তি করে বড় বড় ইসলামী জাগরণ তৈরি হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখা যায়নি। এমন কি অনেক সময় বিপর্যয়ও ঘটেছে। কী বলবেন?

মুহিব খান : জাগরণগুলো অরাজনৈতিকভাবে হয়েছে। দদীনের খাতিরে বা এ ধরণের কোনো চাহিদার ওপর ভিত্তি করে জাগরণ তৈরি হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায়, ঐ জাগরণটা সুসংগঠিত করা বা যাদের প্রতিপক্ষ ধরে জাগরণ তৈরি হয়েছিল, তাদের বিপক্ষে রাজনৈতিক শক্তি না থাকায় জাহরণটা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি এবং বিপদর্যয়ের কারণও। এক্ষেত্রে একটা মূলনীতি বলতে পারি- “কোনো অরাজনৈতিক নেতৃত্ব কোনো গণজাগরণকে দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়ার জন্য ধৈর্য অনুভব করেন না বা চালিয়ে নিতে পারেন না”। এজন্যই মূলত এই জাগরণগুলো ভালো কোনো পরিণতি পায় না।

পাবলিক ভয়েস : ইসলামী দলগুলো ক্ষমতায় গিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্যই তো রাজনীতি করে। তারা যদি ক্ষমতায় যেতেও পারে; এমন দক্ষ জনগোষ্ঠী কি তাদের আছে যে তারা রাষ্ট্রপরিচালনা করতে পারবে?

মুহিব খান : এ বিষয়ে আমি অনেকটা মধ্যপন্থা মনোভাব পোষণ করি। ওলামায়ে কেরাম মনে করেন বা যারা ইসলামী রাজনীতি করেন তারা মনে করেন, আমরা ক্ষমতায় গেলেই একেবারে “বিশুদ্ধ বাংলাদেশ” “সোনার বাংলাদেশ” গড়ে ফেলবো; বিষয়টা এমন নয়” এখানে অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা আছে এবং এটি খুব সহজও নয়। এ গেলো একদিক। আরেকটা দিক বলা যায়; যারা ভাবে ইসলামী রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ক্ষমতায় গেলে দুই দিনও টিকতে পারবে না বা কিছুই করতে পারবে না এটা অনেকটা ভাবাবেগ থেকে বলা বা আক্ষেপ থেকে বলা। যেমন একটা দেশ চালাতে কতজন লোক লাগে? সেই লোকগুলো ইসলামপন্থীদের মধ্যে থেকে বের করা সম্ভব! যেমন ধরেন ৬৪ জেলায় ৬৪ জন ডিসি লাগবে, এই ৬৪ জন যে আলেম থেকেই হতে হবে এমন নয়। বরং ৬৪ জন সৎ লোকই যথেষ্ট। এভাবেই বিষয়টা নিয়ে আমি একটা মধ্যপন্থা অবলম্বন করি।

আরও পড়ুন : ঐক্য : নেতৃত্ব দিবেন কে? মুহিব খানের সাক্ষাৎকার (প্রথম পর্ব)

পাবলিক ভয়েস : বর্তমান সময় দেখা যায় ওয়াজের ময়দানে বা বিভিন্ন লেখনীতে আপনিও শুনে থাকবেন বজ্রকন্ঠে ঐক্যের ডাক দেওয়া হয়, এই ডাক বা লেখনী কতটুকু ফলপ্রসূ হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

মুহিব খান : এক্ষেত্রে আমি বলবো গণবিপ্লবের ক্ষেত্রে লেখালেখি বক্তৃতা এসবের প্রয়োজন আছে, তবে তা বাহুল্যপূর্ণ হলে সঠিক নয়, কারণ এটা অনেকটা পরবর্তীতে হাস্যরসের সৃষ্টি করে। তবে লেখালেখিতে গণবিপ্লবের কথা বা গণবিপ্লবের রুপরেখা থাকতে হবে। কারণ বিপ্লবের ধারণা থেকে মূলত বিপ্লব শুরু হয়। বিপ্লবের একটা থিম আছে, সেটা হলো কিছু মানুষ বিপ্লবের কথা বলছে, বিপ্লব নিয়ে ভাবছে এটাও কিন্তু বিপ্লবের সূত্রপাত।

পাবলিক ভয়েস : অনেকে মনে করেন ওলামায়ে কেরামদের মধ্যে “ঐক্য” শব্দ বলাটা ভুল। এখানে “একতা” শব্দটা আসতে পারে। কারণ “ঐক্য” সাধারনত বিচ্ছিন্ন অংশ বা ভিন্নমতের মধ্যে হতে পারে। এ বিষয়ে কিছু বলুন।

মুহিব খান : এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মসে করি না। এটা একটা ভাষাগত ব্যাখ্যা; “ঐক্য” “একতা” দুটোই বলা যেতে পারে। এটা ধরার মতো তেমন কিছু না। ঐক্য এবং একতা শব্দের অর্থ মূলত একই। যারা ঐক্য বলে তারাও যে উদ্দেশ্যে বলে, যারা একতা বলে তারাও একই উদ্দেশ্যে বলে। এখানে এটাকে আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই আসলে।

পাবলিক ভয়েস : বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী দেখেন?

মুহিব খান : যেভাবে চলে আসছে এখন পর্যন্ত; এভাবে “ইসলামী রাজনীতির ভবিষ্যৎ এখনকার চেয়ে ভালো মনে হয় না”। তবে এক্ষেত্রে ভয় পাই পরিস্থিতি আরও বিনষ্ট হওয়ার, ব্যর্থতা দীর্ঘতর হওয়ার! এবং মনে হয় সমস্যা আরও বাড়বে যদি এভাবেই চলতে থাকে। তবে যদি বিক্ষিপ্ত ইসলামী দলগুলো একটা আদর্শের মধ্যে আসতে পারে এবং এক কর্ম কাঠামোর মধ্যে এদের কাজ পরিচালিনা করতে পারে, তাহলে ভালো কিছু আশা করা যেতে পারে।

পাবলিক ভয়েস : সর্বশেষ প্রশ্ন, ইসলামী রাজনৈতিক নেতাকর্মী বা ইসলামী রাজনৈতিক দলের প্রতি কোনো সুপরামর্শ বা মতামত।

মুহিব খান : ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি প্রথম যে পরামর্শ থাকবে তা হলো – তারা যেন নিজেরা নিজেদেরকে প্রতিপক্ষ না বানায়। এদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত যেটা আগেও কয়েকবার বলেছি- “নীতিগতভাবে ইসলামী দলগুলো এক কাঠামোর মধ্যে চলে আসা এবং সবাই এক ঐক্যে না আসতে পারলেও অন্তত কার্যক্রম যাতে এক কাঠামোতে পরিচালিত হয় সেদিকে খেয়াল রাখা”
তৃতীয়ত এ দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক যে দলগুলো আছে তাদের সঙ্গে কোনোদিন কোনো জোট হবে না এটা কোনো রাজনৈতিক কথা হতে পারে না। ইসলামী দলগুলো এ কথা থেকে বের হতে হবে। আন্দোলনের প্রয়োজনে, নির্বাচনের ইস্যুতে বা বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের জন্য জোট করা লাগতে পারে। তবে এই জোটের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যে, কোনো ক্রমেই আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে জোট করা যাবে না। মোটকথা নিজেদের আত্মসম্মান, ব্যক্তিত্ব এসবের সুরক্ষা নিশ্চিত করে বৃহত্তর কোনো স্বার্থের দিকে তাঁকিয়ে কোনো দলের সাথে জোট করা যেতে পারে। তবে আত্মসম্মান বিকিয়ে সামান্য স্বার্থের জন্য জোট করার ফলাফল আমরা তো দেখতেই পাচ্ছি। মোটকথা : যদি ইসলামী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্মে চলেও আসে, তাহলেও প্রয়োজনের খাতিরে কোনো বৃহৎ দলের সঙ্গে রাজনৈতিক জোটে যাওয়া লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইসলাম ও মুসলমানের স্বার্থ বিবেচনা করে তবেই জোটে যেতে হবে। আপাতত ইসলামী দলগুলোর প্রতি আমার এই পরামর্শ থাকবে।

পাবলিক ভয়েস : আমাদেরকে মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

মুহিব খান : আপনাদেরকেও আমার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ এবং পাবলিক ভয়েস সংশ্লিষ্ট সবাই এবং পাবলিক ভয়েসের সকল পাঠকদের প্রতি আমার শুভকামনা রইল।

সমাপ্ত

মন্তব্য করুন