ঐক্য : নেতৃত্ব দিবেন কে? মুহিব খানের সাক্ষাৎকার (প্রথম পর্ব)

প্রকাশিত: ৭:০০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২১, ২০১৯

জাগ্রত কবি মুহিব খানের সাক্ষাৎকার (প্রথম পর্ব)

‘ঐক্য-প্রচেষ্টা’ হট ইস্যু এখন! সবাই ঐক্য চায়। ইসলামিক অনৈসলামিক দল সবাই-ই ঐক্য প্রত্যাশী। ঐক্য নিয়ে কী ভাবছেন নজরুল ফররুখের প্রতিচ্ছবি, জাগ্রত কবি মুহিব খান।

সামসময়িক এসব বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন এবং মতামত দিয়েছেন পাবলিক ভয়েসকে।
দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব :

পাবলিক ভয়েস : আসসালামু আলাইকুম ও রহমাতুল্লাহ
মুহিব খান : ওয়ালাইকুমুচ্ছালাম ও রহমাতুল্লাহ।

পাবলিক ভয়েস : আশা করি ভালো আছেন।
মুহিব খান: জ্বি ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ!

পাবলিক ভয়েস : তরুণদের প্রতিনিধিত্বশীল একজন হিসেবে আপনি সামসময়িক ঐক্য আহবানকে কোন দৃষ্টিতে দেখছেন, সে বিষয়ে আপনার মতামত কী জানতে চাই।

মুহিব খান : অবশ্যই! আপনি প্রশ্ন করতে পারেন। আমার জানা মতে আমি উত্তর দেবো ইনশাআল্লাহ।

পাবলিক ভয়েস : এই যে আমাদের অনেক ওলামায়ে কেরাম এবং ইসলামিক রাজনৈতিক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের মাঝে ঐক্যের একটা সূর বাজছে, বিশেষ করে নির্বাচনের পর যেন সবাই একটা ঐক্য চাচ্ছেন, ঐক্যের কথা বলছেন। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

মুহিব খান : (আমি একটু শুরু থেকেই শুরু করি) বাংলাদেশে একটি বৃহত্তর ইসলামী শক্তির ঐক্য স্বাধীনতার পর থেকেই প্রয়োজন ছিল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের জালিমদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জণগনের যে যুদ্ধ এই যুদ্ধটাকে ইসলামবিরোধীরা সারা দুনিয়ার কাছে, দেশবাসীর কাছে, প্রজন্মের কাছে ইসলামকে অস্বীকার করা বা ইসলাম কে অগ্রাহ্য করার যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে! যেটা ‘সুস্পষ্ট মিথ্যা; আদৌ সত্য নয়’ এবং তখন থেকেই ইসলাম এবং ইসলামী শক্তির ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা, জাতির আবেগ অনুভূতি ও তাদের চরিত্র বুঝে নেওয়া দরকার ছিল। সেই মোতাবেক কাজ করে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় লড়াই করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা জরুরি ছিল, কিন্তু সেটা হয়ে ওঠেনি। এই না হওয়ায় যে অনিবার্য ফল হওয়ার কথা সেটা এখন পর্যন্ত আমরা পাচ্ছি।

পাবলিক ভয়েস : এই মুহুর্তে ঐক্য আহ্বান করলেও বহু বছর ধরেই এই জটিলতা ইসলামী দলগুলো জিইয়ে রেখেছে! পরস্পরে ঐক্য হতে পারেনি। ঐক্য হলেও তা টেকেনি। এর কারণ কী এবং এর প্রতিকার কী বলে আপনি মনে করেন?

মুহিব খান : বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশ। এছাড়াও বাংলাদেশে রয়েছে ইসলামের মজবুত শেকড়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বাংলাদেশে এখন ৯৩% মুসলমান। এরপরও ইসলামী দলগুলো মুসলিম জাগরণ সৃষ্টি করতে পারেনি। তারা পরস্পর ঐক্য হতে পারেনি এটা তো চরম ব্যর্থতা। এর ফলাফল আমরা এখনও ভোগ করছি। তবে এই যে ঐক্য আহ্বানের কথা বলছেন, সেটা এতদিন পর এসে অনুভব করাটাও বিরাট ব্যাপার। এখন যেহেতু অনুভব হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে তাই এ বিষয়ে ভাবনা চিন্তা শুরু করা উচিত। তবে এখনও আমি নিশ্চিত না এই আহ্বানের কারণ কী।

ইসলামী শক্তিগুলো বেশ আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। নির্বাচনে যখন আশাহত হলো, এর পরপরই হয়ত একটা গতি আসছে, একটা আবেগ আসছে!

তবে আমি এখনও জানি না তারা বিশ্বাস থেকে ঐক্য উপলব্ধি করছেন নাকি হঠাৎ আশাহত হওয়ায় অল্প সময়ের জন্য তাদের মনে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। যদি এমন হয় তাহলে তো আর বলে লাভ নেই।তবে যদি সত্যিকার অর্থেই ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এবং ঐক্যপ্রক্রিয়া এগোয়, তখন সবচেয়ে বড় কথা হবে ‘কে কাকে ছাড় দেবে’। আমি মনি করি ছাড় দেওয়ার মানসিকতাই ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারবে।

পাবলিক ভয়েস : ধরেন কোনোভাবে ইসলামী শক্তিগুলো ঐক্য হয়েই গেলো! তাহলে এরপরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে কী ভাবেন আপনি?

মুহিব খান : এখানে ঐক্যবদ্ধ হওয়াটা বিরাট কঠিন কাজ এবং এটা জটিলতায় ভরপুর, তবে যদি ঐক্য হয়, তাহলে তো মাত্র পথচলা শুরু হবে। এরপরের প্রক্রিয়া হবে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কতদিন থাকতে পারবে এবং তাদের কার্যক্রমও বা কী হবে তা দেখার। এছাড়া দলগুলোর কর্মী-সমর্থকদের বোঝাপড়ার একটা বিষয় থাকবে। তারপর শুরু হবে মূল কাজ।

পাবলিক ভয়েস : ইসলামী দলগুলোর ব্যাপারে একটা অভিযোগ রয়েছে, তারা গণমানুষের হয়ে কাজ করে না এবং গণমানুষের প্রয়োজন অপ্রয়োজন নিয়ে তারা ভাবে না। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী? গণমানুষের সম্পৃক্ততা ছাড়া কী এই দলগুলো কিছু করতে পারবে বলে মনে করেন?

মুহিব খান : এক কথায় “এটা কখনোই সম্ভব না” গণমানুষের সম্পৃক্ততা ছাড়া কোনো দলই তেমন কিছু করতে পারবে না। করতে পারে না। এমনকি গণমানুষের সেবা করার জন্য, গণমানুষের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য “নির্বাচনে দাঁড়ানো বা নির্বাচনে দাঁড়িয়ে আমাকে ভোট দিন” এটা বলারও প্রয়োজনীয়তা দেখি না।

দ্বিতীয়ত : যেটা আগেই বলতে চেয়েছিলাম সেটা হলো,ঐক্য হয়ে একটা শক্তি তৈরি করা মূল ব্যাপার। এর আগে সব দল একত্র হয়ে যদি শক্তি সঞ্চয় করতে পারে, তাহলে জণগনের সমর্থন আদায় করে ক্ষমতায় যেতে না পারলেও নিজেদেরকে একটা চাঁপ প্রয়োগকারী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত করতে পারবে। এবং সেটাও একটা বিরাট ব্যাপার হবে! তখন যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তাদেরকে একটা চাঁপ অনুভব করবে এবং তাদের কারনে ক্ষমতাসীনরা অন্তত ইসলাম ইস্যূতে হলেও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চিন্তা করবে। এরকম একটা চাপ প্রয়োগকারী শক্তি হিসেবে যদি ইসলামী শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারে, এটাই বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে অনেক বড় ব্যাপার হবে বলে আমি মনে করি।

পাবলিক ভয়েস : বাংলাদেশে এর আগেও এমন ঐক্যের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে- ১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে ৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচন উত্তর-পূর্ব সময়েও দেখা গেছে। প্রশ্ন হলো, নির্বাচনের সময় এলেই ঐক্য আহ্বান শুরু হয়, আবার কখনও কখনও ঐক্যের প্লাটফর্ম তৈরি হতে হতেও ভেঙ্গে পড়ে, এমনকি অনেক দল প্রচলিত গণতান্ত্রিক দলের সঙ্গে ঐক্য করে, তবুও ওলামায়ে কেরাম এক হন না! এ বিষয়ে কী বলবেন?

মুহিব খান : এক্ষেত্রে আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ঐক্যটা কোন বিষয়ে এবং কোন প্রক্রিয়ায় হবে। যদি রাজনৈতিক ঐক্য হয় তখন এককথা, আর যদি ধর্মীয় ঐক্য হয় তাহলে অন্যকথা।
রাজনৈতিক ঐক্য হলে সেই ঐক্যের নেতৃত্ব যিনি দিবেন, তিনি অবশ্যই রাজনীতিবিদ হতে হবে। রাজনৈতিক ঐক্য রাজনীতিবীদ ছাড়া হতে পারে না। তাতে তার বয়স কিংবা জ্ঞান তার যেমনই হোক। আর যদি ঐক্য প্রক্রিয়া দীনি কারণে হয় এবং তা দ্বারা লক্ষ্য হয় দীনের যেকোনো প্রয়োজনকে কাজে লাগানো, দেশে দীন বিষয়ক যেকোনো সিদ্ধান্তে এক থাকা, তাহলে সে ঐক্যের নেতৃত্ব হতে হবে দেশের আলেম এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় কোনো মুরুব্বীর নেতৃত্বে। এখানে ঐক্যের হিসাবটা রাজনৈতিক বিবেচনায় হবে না। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অগ্রসর হতে মুরব্বী বিবেচনায় নেতৃত্ব নির্বাচন করা সফলতা আনবে না।

পরবর্তী পর্বের জন্য পাবলিক ভয়েসের সঙ্গে থাকুন।

মন্তব্য করুন