মাও. মামুনুল হকের ঐক্য আহ্বান; শেখ ফজলুল করীম মারুফের বিশ্লেষণ

প্রকাশিত: ১২:০১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৮, ২০১৯

শেখ ফজলুল করীম মারুফ

১ম বিষয় ইসলামী রাজনীতির সংজ্ঞা কী ?

আধুনিক রাষ্ট্রে জনমত সংগ্রহ করা এবং সেই জনমত নিয়ে নির্দিষ্ট পন্থা অবলম্বন করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার যে পথ-পরিক্রমা, তাকে রাজনীতি বলা হয়। এই পথ-পরিক্রমায় যারা নীতি হিসেবে সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ করে, তাদের রাজনীতি বামপন্থী রাজনীতি। আর যারা সেই পথ-পরিক্রমায় ইসলামকে অনুসরন করে এবং রাষ্ট্রপরিচালনায় ইসলামকে মুলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য নির্ধারন করে তাদের রাজনীতিকে ইসলামী রাজনীতি বলে।

কোনো রাজনীতি ইসলামী রাজনীতি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার জন্য নীতি একটি গুরুত্বপুর্ন বিষয়। যতক্ষণ কোনো দলের রাজনীতি ইসলামকে মান্য করে, ততক্ষন সেটা ইসলামী রাজনীতি। যখনই ইসলামী নীতি থেকে সরে যায় তখন আর সেটা ইসলামী রাজনীতি থাকে না।

দলের নাম ইসলামী হলে বা সেই দলের ও নেতাদের ইসলামী রাজনীতির অতীত ঐতিহ্য থাকলেই তাদের করা সকল রাজনীতি ইসলামী রাজনীতি হবে এটা বাধ্যতামুলক নয়।

২য় বিষয় হলো ঐক্য।

ইসলামী রাজনীতিতে ঐক্য মহাগুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ঐক্যের ভিত্তি, ঐক্যের লক্ষ্য এবং ঐক্যের মাধ্যমে অর্জিত শক্তির সুষ্ঠু ব্যবহারের নিশ্চয়তা বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে ঐক্যের প্রশ্নে এই বিষয়গুলো আরও বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই বিষয়গুলোর কোনো সমাধা বা রুপকল্প ঠিক না করেই অনেকে ঐক্য ঐক্য বলে মায়াকান্না শুরু করেন।

প্রথম কথা হলো, মুসলমান আর মুসলমানে কোনো ঐক্য হয় না। বরং মুসলমানরা সর্বদাই এক ও অভিন্ন। রাসুল স. এর হাদীস মতে মুসলমানরা এক দেহের মতো। দেহের এক অঙ্গের সাথে অন্য অঙ্গের “ঐক্য” প্রত্যাশা করা বোকামী।

হ্যা! দেহের কোনো অঙ্গ দুর্ঘটনাবশত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সেই অঙ্গকে পুণরায় দেহের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে ‘এক’ করে দেওয়া হয়। এখানে বিষয়টা ‘এক’ হয়ে যাওয়ার, ‘ঐক্য’ হওয়ার নয়।

ঐক্য হলো, মৌলিকত্বে ভিন্নতা বজায় রেখে কিছু বিষয় একমত হওয়া। সেজন্য ইসলামী রাজনীতিমনষ্কদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বানের মাঝেই একধরণের বিভেদের স্বীকৃতি আছে। সেজন্য আমরা ‘তথাকথিত’ ‘ঐক্য’ নিয়ে আর মায়াকান্না করি না। বরং সকল ইসলামমনষ্কদের ‘এক’ করার জন্য কাজ করি। বিগত নির্বাচনে দেশের অধিকাংশ ইসলামমনষ্কদের আল্লাহর রহমতে এক করে ফেলতে সক্ষম হয়েছি।

তারপরও যারা ‘ঐক্য’ নিয়ে আগ্রহী তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। বিশেষত মাওলানা মামুনুল হক দা.বা. এর প্রতি। ইসলামী রাজনীতি নিয়ে তার বক্তব্য ও বিশ্লেষণের সাথে যুক্তি-তত্ত্ব ও তথ্যের নিরিখে একমত না হতে পারলেও তাঁর বক্তব্যের মাঝে যে ইসলামী রাজনীতির জন্য ব্যথা-বেদনা ও আকুলতা প্রকাশ পায় তা শ্রদ্ধাজাগানিয়া।

তাঁর প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা রেখেই তাঁর সর্বশেষ বক্তব্যের ওপর আলোকপাত করতে চাই।

-তাঁর বক্তব্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতি তাঁর যে উপলব্ধি প্রকাশ পেয়েছে তা যথার্থ। কিন্তু শ্রদ্ধা রেখেই বলি, এটা অত্যন্ত বিলম্বিত উপলব্ধি। তাঁর ব্যক্তিগত এবং দলগত উভয় অর্থেই। ২০০১ এর নির্বাচনের আগে চারদলীয় ঐক্যজোট গঠনের আগেই এই উপলব্ধি যদি তাঁর দলের হতো তাহলে তাদের এতো দুরাবস্থা হতো না। তিক্ত হলেও সত্য, ২০০৮ এর নির্বাচনে খেলাফত মজলিস আওয়ামী লীগের সঙ্গে এবং ২০১৮ এর নির্বাচনের আগে আওয়ামী বলয়ের জাতীয় পার্টির সঙ্গে ঐক্য করেছে। বিনয়ের সাথেই বলি, এই উপলব্ধি ফেসবুকে বলার আগে তাঁর দলীয় ফোরামে বলা দরকার। দলীয় ফোরামে বোঝাতে ব্যর্থ হলে তাঁর মতো বিপ্লবী ব্যক্তিত্বের উচিৎ সেই দল ছেড়ে দেওয়া।

-তিনি বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির সুবিধার জন্য ‘দ্বৈরথ’ এর কথা বলেছেন এবং উদাহরণ হিসেবে রুশ-মার্কিন দ্বৈরথের কথা বলেছেন, সেই সময়ে দুর্বল মুসলিম দেশগুলো এই দুই দৈত্যের হানাহানিতে ভালো ছিলো। বিনয়ের সাথে বলি, এটা তথ্য সমর্থিত কথা নয়। আফগানিস্তান, বলকান ও ককেশাস অঞ্চলের ইতিহাস তার কথাকে ভুল বলবে।

তত্ত্বগত দিক থেকেও এটা শুদ্ধ কথা নয়। দুই শত্রুর হানাহানি সাময়িক স্বস্তি দিলেও নিজে দুর্বল থেকে সেই দুই শত্রুর অস্তিত্ব কামনা করতে পারি না। কারণ যে কোনো সময় দুই শত্রু পরস্পরের হানাহানি ভুলে আমাকে ছোবল মারতে পারে। বিশ্বের ইতিহাস সেটাই প্রমানিত করে।

-বিস্ময়ের ব্যপার হলো, মুহতারাম তাঁর বক্তব্যের শুরুতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরেছেন এবং তিনিই আবার এই দুই দলের দ্বৈরথ প্রত্যাশা করলেন। এবং দুই দৈত্যের হিংস্র দ্বৈরথের মাঝে তিনি ইসলামী রাজনীতির সুবিধা দেখলেন!

-শেষে তিনি ঐক্যের কথা বললেন এবং সেই ঐক্য হবে সুষ্ঠু ও নিরেপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য। তাঁর মতো একজন বিপ্লবীর কাছে এটা প্রত্যাশা করা যায় না। কেবল নির্বাচনকে সুষ্ঠু করার জন্য ঐক্যের আহবান তার মতো প্রজ্ঞাবানের কাছে আশা করা যায় না। তিনি ইসলামী বিপ্লবের জন্য ঐক্যের আহবান জানাবেন। হ্যা! সেই বিপ্লব বাস্তবায়নের কৌশল হিসেবে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্দোলন হতে পারে। কিন্তু কেবল নির্বাচনের জন্য বা রাজনীতি করার জন্য ঐক্যের আহবান প্রত্যাশিত নয়।

-তাঁর বক্তব্যে ‘ঐক্য’ এর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ছিল না। কিসের ভিত্তিতে ঐক্য, কোন নীতিতে ঐক্য তার নির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য ছিল না। আর এগুলো ছাড়া তো ঐক্যের কোনো অর্থই নেই। দেশে তো ‘ঐক্য’ কম হয়নি।

-ঐক্যজোট
-ঐক্য আন্দোলন
-মোর্চা

ইত্যাদি কতকত ঐক্য হলো। কিন্তু ঐক্যের নীতি, লক্ষ্য ও বিশ্বস্ততা ঠিক না থাকায় সকল ঐক্যই পরবর্তিতে অনৈক্যের কারণ হয়েছে। ইসলামী ঐক্যজোটের দফায় দফায় ভাঙ্গন এদেশে ঐক্য প্রচেষ্টা ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ইসলামী রাজনীতি করা এবং মানুষকে ইসলামী রাজনীতিতে এক করা কোনো আবেগী ছেলেখেলা নয়। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যা অর্জন তাকে আমরা বিবেচনা করছি বিপ্লবের চারটা স্তরের প্রথম স্তরের সুচনা পর্ব হিসেবে। তাতেই আমাদের সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করতে হয়েছে।

ফেসবুকে লেখালেখি, লাইভ এবং প্রস্তুত মাহফিলে জ্বালাময়ী বক্তব্য দেওয়া আর ইসলামী রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করা এক জিনিস নয়। ইসলামী আন্দোলনের হেভিওয়েট একজন প্রার্থী মুফতী সৈয়দ ফয়জুল করীম নির্বাচনের সময় বরিশাল-৫ আসনের প্রতিটা অলিগলি চষে বেড়িয়েছেন। হাতপাখার প্রার্থীরা দেশের প্রতিটা বাড়িতে গিয়ে দাওয়াত দিয়ে এসেছেন। তাতেই গণদাওয়াতের প্রাথমিক পর্যায় কেবল অর্জিত হয়েছে। সামনে গণসচেতনতা, গণদাবী, তারপরে গণবিপ্লব।

সামনে বহুপথ বাকি। প্রচুর নেতৃত্ব ও কর্মী দরকার।

ইসলামী বিপ্লব রক্ত, জীবন আর আত্মত্যাগের মাধ্যমেই অর্জিত হয়। তাই বলি, ঐক্য ঐক্য করে সময় নষ্ট করার কোনো দরকার নেই। সবাই ইসলামের জন্য এক হয়ে কাজ করি। যার যার জায়গা থেকে কাজ করি।

আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন।

লেখক : কেন্দ্রীয় সভাপতি, ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন 

মন্তব্য করুন