আল্লামা মাহমুদুল হাসান: জাতির এক অনন্য রাহাবর

প্রকাশিত: ৬:০১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৩, ২০১৯

মাহমুদ আব্দুল্লাহ

আকাবীর আসলাফ ও ওলামায়ে দেওবন্দের প্রতিচ্ছবি আল্লামা মাহমুদুল হাসান মুসলিম উম্মাহর চেতনার এক বাতিঘর। মানুষের প্রতিটি কাজ ও আমল কীভাবে সুন্নত মোতাবেক হবে সে ফিকিরে অহনির্শ কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

হাকিমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত আশরাফ আলী থানভী রহ. ও মুহিউসসুন্নাহ শাহ আবরারুল হক রহ. এর দেখানো পথে সবরকম বিতর্ক ও সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে মজলিসে দাওয়াতুল হকের কাজ এগিয়ে নিয়ে চলছেন।

তিনি একজন খ্যাতিমান লেখক ও ইসলামী গবেষক। ইলম, হিকমাহ, তাকওয়া ও তাহারাতে পরিপূর্ণ দীনের মরদে মুজাহিদ। সমকালের নন্দিত পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি দেশ ও দেশের বাইরে মুসলিম উম্মাহর মাঝে সুন্নতের জ্ঞান প্রচারের কারণে “মুহিউসসুন্নাহ” উপাধীতে পরিচিত।

আল্লামা মাহমুদুল হাসান ৫ জুলাই ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ সদরের চরখড়িচা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মাস্টার গালীম উদ্দীন আহমাদ, মা ফাতিমা রমজানী।

শৈশবে তিনি গম্ভীর স্বভাবের ছিলেন। ভদ্র ও সৌজন্যতাবোধ ছিল তাঁর ভূষণ। সুশ্রী চেহারা আর উত্তম ব্যবহারে অতি সহজে যে কারও মন জয় করতে পারতেন। শৈশবে গ্রামের ছেলেদের সাথে বিভিন্ন খেলাধূলা করতেও পছন্দ করতেন তিনি।

কৈশরে মা-বাবা হারানো মেধাবী মাহমুদুল হাসানের পড়াশুনা হাতেখড়ি নিজ গ্রামে। এরপর ইবতেদায়ী থেকে শরহে বেকায়া পর্যন্ত পড়াশুনা করেন ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল উলুম বালিয়া, জামিয়া ইসলামিয়া ময়মনসিংহ ও জামিয়া ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জে। জালালাইন পড়েন জামিয়া কোরআনিয়া লালবাগ ঢাকায়। মেশকাত ও দাওরায়ে হাদীস শেষ করেছেন বিননূরী টাউন পাকিস্তান।

রমযান মাসে মাত্র ২৭ দিনে তিনি পবিত্র কুরআন হিফজ করেছেন। ওস্তাদের নির্দেশনায় সারাদিন ১ পারা করে মুখস্ত করতেন আর রাতে তারাবির নামাজে উস্তাদকে শুনাতেন। এছাড়াও তিনি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতকোত্তর চারটি ডিগ্রী যথা- তাখাসসুস ফিল ফিকহ, হাদীস, তাফসীর, ও আদব অর্জন করেছেন।

অত্যন্ত সুনামের সাথে শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি সরকারি মঞ্জুরীপ্রাপ্ত সিনিয়র মুহাদ্দিস হিসেবে জামিয়া ফারূকিয়া করাচী, পাকিস্তানে কর্মজীবনের সূচনা করেন।

বর্তমানে তিনি গুলশান সেন্ট্রাল আজাদ মসজিদ ও ঈদগাহ সোসাইটির খতীব। প্রিন্সিপ্যাল ও শায়খুল হাদীস, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া, যাত্রাবাড়ি, ঢাকা। ইমাম, ওয়াপদা কলোনী ঈদগাহ মাঠ, যাত্রাবাড়ি, ঢাকা। নিয়মিত তাফসীরকারক, গুলশান সেন্ট্রাল আজাদ মসজিদ ও ঈদগাহ সোসাইটি।

হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. কর্তৃক ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ইমাম, মুয়াজ্জিন ও আলেম-ওলামার অরাজনৈতিক ইসলাহী সংগঠন মজলিসে দা’ওয়াতুল হক বাংলাদেশের আমীর। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, ইসলামী গবেষণা সাময়িকী মাসিক আল-জামিয়া।

ব্যাংক, বীমা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নিখুঁত ইসলামী পদ্ধতির প্রবক্তা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আল্লামা মাহমুদুল হাসান ঢাকা-সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, উন্নয়ন ও পরিচালনার দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করে চলেছেন।

তিনি আল্লামা আনোয়ার শাহ্ কাশ্মীরী রহ. এর জানিশীন, যুগশ্রেষ্ঠ শায়খুল হাদীস আল্লামা সাইয়্যেদ ইউসুফ বিন্নূরী রহ. পাকিস্তান, আল্লামা শায়খ ইদরীস মিরাঠী রহ. পাকিস্তান, পাকিস্তানের মুফতীয়ে আজম আল্লামা শায়খ মুফতী ওয়ালী হাসান রহ., বিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা হেদায়াতুল্লাহ রহ., আল্লামা শায়খ ওমর সানকিতী রহ. মদীনা শরীফ ও আল্লামা শায়খ সলিমুল্লাহ খান রহ. প্রমুখ মনীষীদের থেকে হাদীসের সনদ লাভ করেছেন।

আত্মার পরিশুদ্ধতা পরকালীন কল্যাণের জন্য মুখ্য। যার আত্মা পরিশুদ্ধ নয় তার সব আমল বৃথা। আল্লামা মাহমুদুল হাসানের জাহেরী জ্ঞানের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক জ্ঞানের প্রতিও আছে প্রবল ঝোঁক। তিনি আধ্যাত্মিক বিষয়ে মুহিউসসুন্নাহ শাহ আবরারুল হক রহ. ভারত, শায়খ সাইয়্যেদ ইউসুফ হাশেম রেফায়ী দা.বা. কুয়েত, শায়খ সাইয়্যেদ মাহমূদ হাশেম রেফায়ী দা.বা. কুয়েত, শায়খ ইসহাক সিদ্দিকী দা.বা. নদওয়াতুল উলামা ভারত, শায়খ দৌলত আলী রহ. বালিয়া ময়মনসিংহ, শায়খুল হাদীস মাওলানা আব্দুল মান্নান কাশিয়ানী হুজুর রহ. গওহরডাঙ্গা ও শায়খুল হাদীস আল্লামা আহমদ শফী দা.বা. এর থেকে খেলাফত লাভ করেছেন। তিনি অদ্যবধি দেশ ও দেশের বাইরে ১৪২ আলেম-ওলামাকে মুজাযে বাইআত করেছেন।

আল্লামা মাহমুদুল হাসান বহুরৈখিক প্রতিভার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তিনি প্রায় অর্ধশত বই লিখেছেন। তাঁর রচিত ‘আর রদ্দুল জামিল’ আরব বিশ্বে সবচে’ সাড়া জাগানো একটি কিতাব।

২০০৯ সালে যখন মক্কা মোকাররমার ‘আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার’ এর প্রধান ড.আহমদ আল গামেদী কর্মস্থল ও শিক্ষালয়সহ সর্বত্র নারী-পুরুষ অবাধে মেলামেশার প্রকোপকে বৈধতা দেওয়ার প্রয়াস চালালো। তখন আর রদ্দুল জামিল প্রকাশের পর ইন্টারনেটের মাধ্যমে আরব বিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় তোলে। ড.গামেদী নিজ অভিমত প্রত্যাহার করেন। সারা বিশ্বের আলেমদের মাঝে ফিরে আসে এক স্বস্তির নিঃশ্বাস।

এছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু বই:
১. তাফসীরে বুরহানুল কুরআন (১-৪)
২. দাওয়াতুল হক আওর দাওয়াত ও তাবলীগ
৩. ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তা
৪.নবী পরিবারের প্রতি ভালোবাসা
৫. হয়াতে আবরার
৬. হায়াতে উসমানি
৭.আল বুরহানুল মুআইয়াদ
৮.তোহফায়ে আবরার
৯.তোহফায়ে সুন্নাহ
১০.আদর্শ মতবাদ
১১.মাওয়েজে হাসানাহ
১২.সিরাতে মুস্তাকিমের সন্ধানে ইত্যাদি।

কোরআন, হাদিস ও তাফসীরের জ্ঞানে গভীর পাণ্ডিত্যের পাশাপাশি আরবী ও উর্দু ভাষার কাব্যচর্চায় আল্লামা মাহমুদুল হাসানের দক্ষতা রয়েছে অন্যতম।

সারা বিশ্বের শীর্ষ ইসলামী ব্যক্তিত্ব আল্লামা মাহমুদুল হাসান ইসলাহে উম্মাতের অন্যতম একজন রাহাবর। বাংলাদেশের বাইরেও তাঁর রয়েছে প্রশংসনীয় অবস্থান। তিনি ভারত, পাকিস্তান, সৌদিআরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, কুয়েত-সহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চল এবং ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার ইসলাম প্রচারে বিভিন্ন সম্মেলন ও সেমিনারে বক্তব্য প্রদান এবং গবেষণামূলক সফর করেছেন।

আল্লামা মাহমূদুল হাসান দীনের বিভিন্ন অঙ্গনে দীর্ঘ দিনের সাধনা অবদানে দেশবাসীর নিকট বরেণ্য ও সমাদৃত। জাতীয় পর্যায়ের ওলামা-মাশায়েখ ও বুযুর্গানে দীনের নিকট তিনি বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত।

বাংলাদেশে গণমুখী দীনি দাওয়াতের বহুবিধ কর্মতৎপরতার পাশাপশি তাঁর সুন্নতী অনুশীলন, দরস-তাদরীস, মসজিদ-মাদরাসা, ওয়াজ-মাহফিলে তাঁর জ্ঞানগর্ভ ও অধ্যাত্মপূর্ণ বয়ান সমাজকে করেছে নির্মল আলোকিত।

তিনি ব্যক্তিজীবনে দুই ছেলে ও চার মেয়ের জনক। ছেলেরা হলেন, মাওলানা মায়মুন হাসান ও মাওলানা মাসরুর হাসান।

আল্লাহ তাআলা সমকালীন বিশ্বের নন্দিত পুরোধা ও মুসলিম উম্মাহর অনন্য রাহাবর আল্লামা মাহমূদুল হাসানের ছায়া আমাদের ওপর বহুদিন প্রসারিত করুন। আমীন।

লেখক:
ছাত্র, জামিয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়ি মাদরাসা, ঢাকা।

মন্তব্য করুন