নির্বাচনী আমেজের নতুন ভার্সন- ঐ মার্কা আছে! ঐ ধর ধর! পিটা!

প্রকাশিত: ৬:১৩ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১২, ২০১৮

নির্বাচন একটি প্রতিশ্রুতিশীল মাধ্যম। নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়। প্রতিদ্বন্দীরাও প্রতিশ্রুতি দিতে ভালোবাসে। নির্বাচন এলে ভোটাররা নেতাদের থেকে প্রতিশ্রুতি শোনতে চায়। কোন নেতা কী প্রতিশ্রুতি দেয় সেদিকে তাকিয়ে থাকে তারা। প্রতিশ্রুতির পর চায়ের কাপে ঝড় ওঠে তা নিয়ে। চুলচেরা বিশ্লেষণ হয় প্রতিশ্রুতির প্রতিটি শব্দের। বিশ্লেষকের আসনে থাকে সাধারণ দিনমজুর ও কিষাণ-শ্রমিক। মূলত তাদের বিশ্লেষণটাই আসল বিশ্লেষণ।

মাঠে-ঘাটে তাদের অবাধ বিচরণ থাকায় একজন রাজনৈতিক নেতার চেয়েও সামাজিক বাস্তবতা তারা বেশি উপলব্ধি করে। বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই ঈদানন্দ। মিছিল মিটিং ও জনসভায় বিভিন্ন রঙের পোশাক পড়ে পছন্দের মার্কা নিয়ে নৃত্য করতো একদল স্পেশাল ভোটার। পছন্দের মার্কা শুধু কাগজেই নয়, বিভিন্ন জিনিস দিয়ে বিশাল বিশাল মার্কা তৈরী করে মিছিলের সামনে সামনে শ্লোগান তোলা ‘ঐ মার্কা আছে!’র মজাই ছিল অন্যরকম।

বিভিন্ন ছন্দের তালে মিছিল দিয়ে এলাকার মা-বোনদের কাছে ভোট চাইতো কর্মিরা। বৃদ্ধ জোয়ান এমনকি শিশুরাও শামিল থাকতো এ আনন্দে। সন্ধার পর প্রার্থির নির্বাচনী অফিসে রঙ চা আর শুকনো মুড়ির আয়োজন এখন প্রায় অতীত বললেই চলে। দুই প্রার্থির মিছিল মুখোমুখী হলে নিজ দায়িত্বে রাস্তা পরিবর্তন করে নিতো প্রার্থী ও কর্মিরা। শেষ প্রচারণার দিন প্রত্যেক প্রার্থির বিশাল শোডাউন করা ছিল নির্বাচনের আসল কৃতিত্ব। ভোটাররা ঐ দিনটির জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষায় থাকতো। বুকে ব্যাচ লাগিয়ে নির্দিধায় ভোটকেন্দ্রে ঘুরে বেড়াতো। আইডি কার্ড ছিল না। তবুও জাল ভোট হওয়া দুষ্কর ছিল। বেশিরভাগ জাল ভোট ধরা পড়ে যেত। নির্বাচন নামক ঈদ বাংলাদেশ থেকে ২০০৮ -এ হারিয়ে গেছে। মঈনুদ্দীন-ফখরুদ্দীন সরকার সে আনন্দে পানি ঢেলে গেছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে জানি না। ব্যতিক্রম কিছু ঘটতে যাচ্ছে বলে মনে হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচারণার শুরুতেই আরম্ভ হয়েছে হামলা ভাঙচুর আর ধরপাকড়। মানুষের মাঝে নির্বাচনী আমেজ নেই। কৃষকের কাছে নির্বাচন সম্পর্কে জানতে চাইলে বলে ‘আমাদের নির্বাচন দরকার নেই, দুমুঠো খেয়ে বাঁচতে পারলেই হয়!’ আগের মতো নেতাদের প্রতিশ্রুতি শোনার জন্য অপেক্ষা করে না ভোটাররা।

নেতাদের বিশ্বাসও করতে চায় না তারা। নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই দেশব্যাপী ভাঙচুর হামলা সংঘর্ষ ও গ্রেফতারের অভিযোগ এসেছে। ভোটকেন্দ্রিক সহিংসতায় আওয়ামী লীগ-বিএনপির সংঘর্ষে নোয়াখালীতে যুবলীগের এক নেতা ও ফরিদপুরে ইউসুফ আল মামুন নামে আরেকজন নিহত হয়েছে।

ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়িবহরে হামলা, নোয়াখালীর কবিরহাটে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের পথসভা পণ্ড, নরসিংদীতে বিএনপির ড. আবদুল মঈন খানের গাড়িবহরে হামলা, ঢাকায়-৪ আসনে জাতীয় পার্টির সৈয়দ আবু হোসেন বাবলার প্রচারণা মিছিলে ককটেল হামলা, নোয়াখালী-৪ সুবর্ণচরে হাতপাখার নির্বাচনী অফিস ভাঙচুর করে তালা লাগিয়ে দেওয়া, বিভিন্নস্থানে হাতপাখার প্রচারণায় বাধা, কর্মীদের হুমকি ও পোস্টার ছেঁড়ার অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জে হাতপাখার পোস্টারের ওপর অন্য প্রার্থির পোস্টার লাগানোর অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী কাজী মনিরুজ্জামানের নির্বাচনী প্রচারণায় আক্রমণ, প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে হামলা-সংঘর্ষ, ঝিনাইদহ-১, নড়াইল-২ ও চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা, সংঘর্ষ ও পাল্টা আক্রমণে বিভিন্ন স্থানে দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে শতাধিক।

ঢাকায় বিএনপির ৬১ নেতাকর্মী আটক করা হয়েছে।। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ-বিএনপি ও পুলিশের ত্রিমুখী ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কী বুঝলেন! আগে নির্বাচনী প্রচারণায় বলা হতো- ‘ঐ মার্কা আছে!’ আর এখন বলে ‘ঐ ধর ধর! পিটা!’ নির্বাচনী হাওয়া খুব উপভোগ্য (!) বলার মতো উপায় আছে? সরকার দলের নেতাকর্মী যদি সংযত না হয় তাহলে সরকারই বিপদে পড়বে। এভাবে অধিকারে বাধা এলে মানুষের সমর্থন ঘুরে যায়। নির্বাচনের আগে এসব হামলা সরকার নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার শামিল।

সরকারের উচিত, সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রচারণা সুষ্ঠুভাবে করতে দেওয়া। পুলিশকে দলীয় কাজে ব্যবহার না করা। একতরফা নীতির শেষফল চরম বেদনাদায়ক; সরকার যদি সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয় তাহলে চরম খেসারত দিতে হতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে তার দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করা সময়ের দাবি। নাহয় যেকোনো সময় হামলা ও গ্রেফতারনীতি সরকারের জন্য বুমেরাং হওয়ার আশঙ্কা আছে।

মন্তব্য করুন