তাবলীগ জামাতে চলমান সমস্যার মূল কারণ

প্রকাশিত: ৮:৩৮ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ৬, ২০১৮
পিকচার: এইচ,এম
মুফতী শামসুদ্দোহা আশরাফী
খতীব, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব
১৯২৬ সাল। তাবলীগ জামাতের প্রতিষ্ঠাকাল। কালিমা, নামাজ, ইলম ও জিকির, ইকরামুল মুসলিমীন, সহীহ নিয়ত, তাবলীগ, এ ছয়টি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করেই সূচনা লাভ করে তাবলীগ জামাত। বিগত প্রায় ১ শতাব্দীতে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে তাবলীগ। নিরব ঈমানী আন্দোলন হিসেবে স্থান করে নেয় মানুষের হৃদয়ে।
অগণিত মানুষ এ জামাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেকে আমূল পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়। মোহমুক্ত জামাতটি হঠাৎ সঙ্কটে পতিত হয়। তৈরী হয় তাবলীগ সংশ্লিষ্টদের মাঝে বিভক্ত। কিন্তু কেন এই বিভক্তি? এ নিয়ে ধুম্রজাল ছড়িয়ে পড়ে! সাধারণ মানুষ এখনও জানে না আসল সমস্যা কী। কেউ বলছে এটা দু’পক্ষের নেতৃত্ব দখলের দ্বন্দ্ব।
কেউ বলছে হেফাজতে ইসলামের আলেমদের দখলদারিত্বের কারণে এ সমস্যা। কেউ বলছে বিদেশী শক্তি তথা পাকিস্তানিদের ইন্ধন! আর কেউ বলছে এটা মাওলানা সা’দ সাহেবের আকীদাগত সমস্যা। লোকমুখে ছড়ানো কথাগুলোর মধ্যে শেষ কথাটিই সঠিক। চলমান সমস্যাটি আকীদাগত। যা সৃষ্টি হয়েছে একান্তই ভারতের মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর মাধ্যমে।
তিনি এ জামাতের শীর্ষ মুরুব্বিদের মধ্যে অন্যতম। তিনি তাবলীগের প্রতিষ্ঠাতা হজরত মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভী রহ. এর বংশধর। উল্লেখ্য ; গত দুই দশক ধরে এ জামাতের একক কোনো আমীরের নেতৃত্বে তাবলীগ জামাত পরিচালিত হয় না। বিভিন্ন দেশের শীর্ষ মুরুব্বীদের নিয়ে একটি শুরা আছে।
সেই শুরার মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে৷ মাওলানা সা’দ সাহেব তাদের মধ্যে একজন। তিনি গত কয়েকবছর যাবত এ জামাতের মূল ৬ উসুল তথা নীতিমালার বাহিরে এমন কিছু বয়ান বক্তৃতা দিতে থাকেন যা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা বিরোধী। ফলে উপমহাদেশের ইলমী মারকায খ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দে তাঁর এসব বয়ান, বক্তৃতা ও আকীদার ব্যাপারে জানতে চেয়ে প্রশ্ন করা হয়।
দারুল উলুম দেওবন্দ দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণার পর তাঁর এ বয়ান বক্তৃতা ও আকীদার ব্যাপারে সরাসরি ফাতওয়া জারি করে (০৫/০৩/১৪৩৮ হিজরী)। মাওলানা সা’দকে ভবিষ্যতে এ ধরনের বয়ান না করা এবং আগের বয়ান থেকে রুজু তথা ফিরে আসার আহ্বান জানান। মাওলানা সা’দ সাহেব দারুল উলুম দেওবন্দের এ ফাতওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টা চিঠি লিখেন।
শুরুর দিকে কিছুটা নমনীয় দেখালেও শেষ দিকে এসে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বসেন এবং বলেন আমার বয়ান বক্তৃতা দলীল নির্ভর। সময়ের অভাবে দেখাতে না পারলেও পরে দেখানো যাবে। দারুল উলুম দেওবন্দ মাওলানার এমন আত্মপক্ষ সমর্থনমূলকপত্র ও বক্তব্যের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করে এবং তাকে পুরোপুরিভাবে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানান।
এরপর বেশ কয়েকবার চিঠি আদানপ্রদান হলেও মাওলানা সা’দ সাহেব পুরোপুরি ফিরে আসেননি। ফলে ৩১/০১/২০১৮ তারিখে দেওবন্দ থেকে চুড়ান্ত চিঠি দেয়া হয়। তাতে মাওলানা সা’দ সাহেবের শুধু একটি বিষয়ে তথা মুসা আ. কে নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের ব্যাপারে আশ্বস্ততা প্রকাশ করলেও বাকী সমস্যাগুলোর ব্যাপারে পুর্বঅনাস্থাই বলবৎ রেখে দেওবন্দের ওয়েবসাইটে ফাতওয়া জারি করে৷
বিষয়টি বাংলাদেশ-সহ সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ওলামায়ে কেরাম কাকরাইল শুরার মুরুব্বীদেরকে এ বিষয়ে দারুল উলুম দেওবন্দের অবস্থান সঠিক জানিয়ে মাওলানা সা’দ সাহেব পুরোপুরি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত আমাদের দেশীয় তাবলীগের কোনো কাজে যুক্ত না করতে অনুরোধ জানান। কাকরাইলের প্রায় সব মুকীম সাথীরা তা মেনেও নেন।
কিন্তু কিছু লোক তথা ওয়াসিফুল ইসলাম, নাসিম, মোশাররফ, মাওলানা আশরাফ আলী-সহ কয়েকজন তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে আমাদের দেশে সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যায়। সমস্যার দ্বার উম্মুক্ত হয়।
আর এ সমস্যাই সবশেষে গত ১ ডিসেম্বর রক্তাক্ত ট্রাজেডি সৃষ্টি করে। যা পুরো জাতিকে শোকাহত করে। দুঃখজনক বিষয় হলো, মূল সমস্যার দিকে মনোযোগ না দিয়ে আমাদের দেশীয় মিডিয়া ও সা’দ সাহেবের ভক্তরা এটাকে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব হিসেবে চালিয়ে দিয়ে সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ যার বয়ান বক্তৃতা নিয়ে সমস্যা সেই মাওলানা সা’দ সাহেব ঠিক হয়ে গেলেই এক মুহুর্তে সব ঠিক হয়ে যায়।

মন্তব্য করুন