অশ্রু

প্রকাশিত: ১২:২৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৬, ২০১৮
আহমদ জারীর
মহিলাটা এখন হাউ মাউ করে কাঁদছে। পরনে পুরনো শাড়ি। যথেষ্ট গরীব যে তা দেখেই বুঝা যাচ্ছে। আর আমার সামনের বৃদ্ধ যেন রাগে ফুঁসছেন। এতোক্ষণে মুখ খুললেন।
-আয় দেখি, সামান্য আম চুরির জন্য ছোট বাচ্চাকে বেধে রাখে!
শফিক মিয়া এতোটা নীচ জানতাম না তো!” আমাকেও সাথে নিয়ে চললেন। আজ সকালে এসেছি বৃদ্ধের কাছে। পারিবারিক সামান্য কাজে। তিনি তার এলাকায় বেশ গন্যমান্য ব্যক্তি। এলাকায় কোনো বিচারিক কাজে সবার আগে তাঁকেই পাওয়া যায়।আসার পর থেকে বারান্দায় বসে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছি আর তখনই এই মহিলার আগমন।আর তখনই বৃদ্ধ ঘর থেকে বেরুলেন। মহিলা কান্নাভেজা কন্ঠে বলছে,”চাচাজান বাচান আমারে  মইরা গেলাম। বৃদ্ধের কপালে ইষৎ বিরক্তি আবেশ।
-কি হইছে সেইটা তো বলবি,না কি?
-চাচাজান,আমার ছেলেটায় আমচুরি করায় শফিক মিয়ায় তারে বাইন্ধা রাখছে।
-তো,রাখছে বাইন্ধা,তুই যা গেলে ছাইড়া দিবো।
-গেছি চাচা,কতো হাতে পায়ে ধইরা কান্দলাম।
-কি কয়?
-কয় হেরে নাকি ছাড়তো না।জীবনের লাগি বাইন্ধছে। কিছুক্ষণ বৃদ্ধ চুপ করে রইলেন। রইল পড়ে আমার কাজ।চুপচাপ দেখতে লাগলাম। এইটুকু বলে বৃদ্ধ বললেন-
“আয় দেখে আসি বেটারে”। ছুটছি এই গ্রামের একবৃদ্ধের সাথে আরেক বৃদ্ধের বাড়ির পানে। গ্রামের মেঠো পথ। পুরো পথ বৃদ্ধ বিড় বিড় করেই চলছেন। রাগে কথা বলতে গিয়ে মুখ গিয়ে থু থু বেরুচ্ছে -বেটা কোটি কোটি টাকার মালিক। আর পিচ্চি বাচ্চারে বাইন্ধা রাখে আম চুরি করায়।আর আমারে যাওয়া লাগে ছোটাইতে!! কয়লা ধুইলে যে ময়লা যায় না এইটা খাটি কথা। এইসব ছোটলোক এক লাফে ধনী হইলেও তাগোর ছোট লোকি যায় না… বুঝতেই পারছি রাগে তাঁর অবস্থা খারাপ।এসব এসব শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে কানে এক রকম তালা লাগিয়ে হাটছি। পৌছে তো আমার চোখ ছানাবড়া! বিশাল আলিশান বাড়ি।
আর এই বাড়ির মালিক আম চুরির দায়ে ছোট শিশুকে বেধে রাখে!!! আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে বাড়ির স্টাইলটা বিলাতি।সামনে বিরাট লন।দু’পাশে নানা জাতের ফুল গাছের সমাহার। এক পাশে ফল বাগান। লন পেরিয়ে দেখি প্রাসাদসম বাড়ির সামনেখানদানী চেয়ারে বসে আছেন এক বৃদ্ধ।তার সামনে একটা আট-দশ বছরের ছেলে বেধে রাখা।বুঝলাম ইনিই শফিক সাহেব।এই রাজপ্রাসাদসম বাড়ির মালিক। ছেলেটা কাঁদছে। আমার সাথের বৃদ্ধ চেঁচিয়ে ওঠলেন।
-কি ব্যাপার,শফিক সাব। এইগুলা কি শুনি… -কি আর শুনেন।
-সামান্য আমচুরির দায়ে এমন বাইন্ধা রাখেন?
-রাখি তো,দেখছেনই
-এরে কি ছাইড়া দিতেন না??
-নাহ, হেরে আমি জীবনে লিগা বান্ধছি।ছাড়োনের লিগা না। আমার সাথে বৃদ্ধের রাগ যে বাড়ছে তার চেহারা দেখেই বুঝছি। একটা বিস্ফোরণের অপেক্ষায় আছি।
-কি পাইছেন এই গুলা? ছোট বাচ্চারে আম চুরির লিগা সারা জীবন বাইন্ধা রাখবেন? এইটা মগের মুলুক না কি? আমরা কি মইরা গেছি না কি? একসাথে এতোটা কথা বলে দেখি বৃদ্ধ রীতিমতো হাফাতে শুরু করছেন। খানদানী চেয়ারে বসা শফিক মিয়াও এখন একটু নড়ে চড়ে বসলেন।তারও দেখি চোখ দুটো লাল। যেন আগুনের গোলা। বুঝলাম তিনিও যথেষ্ট রাগে ফুঁসছেন। বলা শুরু করলেন, “এই শুয়োরের বাচ্চা, আমার গ্রামে থাইকা চুরি করে। তাও আমার গাছের আম!! তারে আমি আর ছাড়ছি না। ধরছি তো ধরছিই। এই হারামজাদারে জীবনের জন্য ধরছি।
এর এই গ্রামে থাকা শেষ।এই হারামজাদারে শহরে আমার বাসায় নিয়া যামু। ওই খানে স্কুলের মাষ্টারের সাথে কথা হইছে।নিয়াই ওই খানে ডাইরেক্ট ভর্তি। কোনো কথা নাই। এখন আপনে কি,থানার অসিও ছোটাইতে পারবো না এরে।” আমি লক্ষ্য করলাম আমার পাশের বৃদ্ধের চেহারা যেন বদলে গেছে।
তার রাগের পারদটা যেন দপ করে পড়ে গেছে। চোখোদুটো মাটির দিকে। একটু আগেও যার চোখ দুটো আগুনের গোলার মতো ছিল। এখন সেটা ছলছল করছে। রাগে যার মুখ দিয়ে থু থু বেরুচ্ছিল, এখন তিনিই অতি চুপচাপ! আরো অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম আমাদের সাথের মহিলাটা এখনো কাঁদছেন, তবে আগে ছিল দুঃখের অশ্রু আর এখন কৃতজ্ঞতার অশ্রু।

মন্তব্য করুন