স্বীকৃতির শুকরানা ডুগডুগি (শেষ পর্ব)

প্রকাশিত: ৯:৪৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১, ২০১৮

(চার)

আমার কেন জানি মনে হয়েছে কওমি কর্তৃপক্ষ অধিকার এবং অনুদান শব্দ দুটোর পার্থক্য ভুলে গেছেন। স্বীকৃতি আমাদের অধিকার ছিল। আগের সরকারগুলো দেয়নি। শেখ হাসিনা দিয়েছেন। তিনি তাঁর কথা রেখেছেন। আমরা ধন্যবাদ জানিয়েছি। কওমি কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল তাঁকে অফিসিয়ালি কংগ্রাচুলেট করা। আনুষ্ঠানিকভাবে কৃতজ্ঞতা জানানো। সেটা হতে পারতো ছয় বোর্ডের ছয়জন প্রতিনিধির নেতৃত্বে একটি দল গণভবনে গিয়ে কৃতজ্ঞতাপত্র পেশ করার মাধ্যমে। হতে পারতো সংবাদ সম্মিলন করে জাতীয়ভাবে। হতে পারতো নিজস্ব স্টাইলে কওমি কনফারেন্স আয়োজন করে। আরো অনেকভাবেই হতে পারতো। কিন্তু কোনোভাবেই যা হওয়া কাম্য ছিল না, সেটিকেই বেছে নেওয়া হল। পাগড়ি বেঁধে এক রাকাত নামাজে সত্তর রাকাতের সওয়াব, কথা তো ঠিক, কিন্তু লুঙ্গি তো ঠিক রাখার দরকার ছিল। এভাবে ঘটা করে শুকরিয়ার নামে সংবর্ধনার আয়োজন করে কওমির ঐতিহ্যে সামনে তাঁরা যে প্রশ্নবোধক চিহ্নটি দাঁড় করিয়ে দিলেন, এর জবাব তো আগামী প্রজন্মকেই দিয়ে থাকতে হবে। তাও যদি সবকিছু সীমার মধ্যে থাকতো। কেউ কেউ কওমি নেতৃত্বের পরিচয়কে ব্যবহার করে যে পর্যায়ের তেলবাজি করলেন, এর খেশারত কীভাবে এবং কতদিনে দিয়ে শেষ হবে; কেউ কি বলতে পারবে?

 

অতি উৎসাহিরা সবসমই মাছ ধরে কিন্তু পানি ছুঁতে চায় না। তাঁরা তাদের গায়ে পানি লাগতে দেয় না। হাঁসের মতো। হেফাজতের আন্দোলনের সময় আমরা দেখছিলাম। তবে এবার ভালোভাবেই ধরাটা খেয়েছে। ৪ তারিখ লক্ষ জনতার সামনে তাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে গেছে। মানুষ বুঝতে পেরেছে তাদের ইনটেনশন। বিশেষত: কওমি প্রজন্মের কাছে তাদের মুখোশের ভেতরের চেহারা নগ্নভাবে বেরিয়ে এসেছে। দরকার ছিল।

এতদিন নভেম্বরের দুইটা দিন আলোচনায় থাকতো। ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে জেলের ভেতর হত্যা করার কারণে ৩ নভেম্বরকে স্মরণ করা হতো জাতীয়ভাবে। অবশ্য দিনটির রিমোট ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের হাতে। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে কেন্দ্রকরে সিপাহি-জনতার বিপ্লবের জন্য ৭ নভেম্বরকেও স্মরণ করা হতো বিশেষভাবে। এখন থেকে নভেম্বরের পালকে আরেকটি দিন আলাদা হবে। ৪ নভেম্বরও থাকবে আলোচনার টেবিলে। দিনটিও জায়গা করে নেবে ইতিহাসের পাতায়। আর এর রিমোট থাকবে কওমি নেতাদের হাতে। এটিও হবে একটি জাতীয় দিবস। কওম মানে জাতি। তবে চার নভেম্বরকে আগামী প্রজন্ম কীভাবে মূল্যায়ন করবে, এখনই বলা যাচ্ছে না।

(পাঁচ)

ভবিষ্যতের জন্য অনেকগুলো প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখে শেষ হল আলোচিত/সমালোচিত শুকরিয়া মাহফিলটি। উপমহাদেশের নন্দিত আলেম মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরি রাহমাতুল্লাহি আলাইহির সন্তান কওমি নেতা মাওলানা রুহুল আমিন শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ খেতাব দিয়েছেন। আমরা তাঁর বাবার সম্মানে কঠিন কিছু বলা থেকে বিরত থাকলেও প্রজন্ম সেটা পারছে না। তাঁরা মনে হয় নূহ আলাইহিস সালামের ছেলে বলে কেনানকে ছাড় দেওয়ার কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছে না। না পাওয়ারই কথা।

বিখ্যাত হেফাজত নেতা মুফতি ফয়জুল্লাহ। আমি বিখ্যাতই বললাম। যদিও ৪ তারিখের পর অনেকেই এখন ‘বি’র স্থলে ‘কু’ ব্যবহার করতে শুরু করেছেন এবং প্রকাশ্যেই। তিনি শেখ হাসিনার মধ্যে একজন মহিয়সী নারীর সন্ধান পেয়েছেন। মুফতি আমিনির সন্তান আবুল হাসনাত আমিনি শেখ হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় দেখতে চাওয়ার কথা বলেছেন। বেফাক মহাসচিব তো অনেক বড় অপবাদকেই আপন করে নিলেন। বাদবাকি তেল কমবেশি সবাই মেরেছেন। ভাগ্যিস, কেউ যে নেত্রীকে শুকরানা কদমবুছিটা করে ফেলেননি। করলেও করার কিছু ছিল না।

সবচে মারাত্মক যে ব্যাপারটি ঘটল সেখানে, সেটি হল প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব পরিষ্কার ভাষায় বললেন, শাপলায় কোনো হতাহতের ঘটনাই ঘটেনি। তিনি কওমি এবং হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্বের সামনে দাঁড়িয়েই কথাটি বললেন এবং কেউ প্রতিবাদ করলেন না। আলেম সমাজের এতো নতজানু চেহারা আমি জীবনেও দেখিনি। হেফাজত হেফাজত বলে মাইকে চিৎকার করে গলার রগ ছিড়ে ফেলা জাদরেল নেতারা সেখানে ছিলেন। কেউ কিছু বললেন না। এই লজ্জা আমরা কোথায় রাখব?

(ছয়)

কেতাবি যে কথা যেভাবেই বলা হোক না কেন, বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলো এবং হেফাজতে ইসলাম একই মুদ্রার দুটি পীঠ’ এটা অস্বীকার করার কি কোনো উপায় আছে? হেফাজত নেতৃবৃন্দই কি সমন্বিত কওমি শিক্ষাবোর্ডের নেতৃত্বে নয়? তাহলে একটির সাথে আরেকটির কোনোই সম্পর্ক নাই; একথা আমরা কীভাবে বিশ্বাস করি। আমি তো বরং আরেকটু বাড়িয়ে এভাবেই বলতে চাইব যে, হেফাজতে ইসলাম, কওমি শিক্ষাবোর্ড এবং বিভিন্ন ইসলামি রাজনৈতিক দল; সবগুলোই মিলেমিশে একাকার। কেউ বিশ্বাস করতে না চাইলে ৪ নভেম্বর ২০১৮ সেটার নগদ প্রমাণ। তা নাহলে কওমি মঞ্চ থেকে কীভাবে শেখ হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় দেখতে চাইবার দাবি ওঠে?

যদি বলা হয় এটা একজনের ব্যক্তিগত বক্তব্য ছিল, সবার নয়, তাহলে মানুষ সে কথা গ্রহণ করবে কেন? এমন হলে মঞ্চ থেকে সেটার ব্যাখ্যা আসতো। যদি বলা হয় কওমি শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান কাম আমিরে হেফাজতের বক্তব্যে পরিস্কার বলে দেওয়া হয়েছে হেফাজতের সাথে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক নেই, তাহলে বলব, এই লেবুটিকে আর চিপে তিতা না করাই ভালো। আল্লাহর এই সহজ সরল বান্দাটিকে এভাবে আর ব্যবহার না করাই ভালো। কারণ, উনার লিখিত বক্তব্য যারা লিখেছেন এবং পাঠ করেছেন, তারাই তো সেদিন মঞ্চে তেলবাজি করছিলেন।

(সাত)

সেদিন যারা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তেলতেলে বক্তৃতা করছিলেন, নেত্রীকে খুশি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করবার জন্যে, তারা সেদিন এতোটাই উতলা হয়ে ওঠেছিলেন যে, স্বয়ং আওয়ামিলিগওলারাই লজ্জায় পড়ে গিয়েছিল। তারাও ততোটা আশা করেনি। ৪ তারিখ রাতেই বাংলাদেশ ইসলামি ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মিসবাউর রহমান চৌধুরি টেলিভিশনে হেফাজত নেতা মুফতি ফয়জুল্লার সামনে বসে বলে ফেললেন, “যারা অকথ্য ভাষায় প্রধানমন্ত্রীকে নিন্দা করছেন, তারা আজ ইনডাইরেক্টলি এটার জন্য তওবাহ করলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কওমির জননী। তাহলে জননীর নিন্দা করার কারণে তো মনেপ্রাণেই তওবাহ করা উচিত। এবং আমার মনেহয় অনেকেই এখন অনুশোচনায় ভুগছেন। এ জন্য আজকে একটু বেশি বেশি বলছেন’। রাজনীতির অ্যানেস্তেসিয়া দেওয়া থাকায় সামনা সামনি এমন থাপ্পড়টা মুফতি ফয়জুল্লার গালে না লাগলেও আমাদের লেগেছে। এটা তো সবে মাত্র শুরু।

(আট)

শুরুতে আমাদের আকাবিরদের কিছু উদাহরণ টেনে রাখা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের স্থিতি এবং গতি কোন পরিণতির দিকে যাচ্ছে, কম্পেয়ার করতে পারা। আজকাল বড়দের বলদের শুনি, ‘অবস্থা ভাল না, সময় খারাপ, অনেক চাপে পড়ে অনেক কিছু করতে হচ্ছে’। আমি পায়ে ধরে অনুরোধ করতে চাই তাঁরা যেন এভাবে আর না বলেন। কারণ, তাঁরা যদি এভাবেই বলতে থাকেন এবং বলার মতোই চলতে থাকেন, তাহলে সেইদিন মনেহয় আর বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ কওমি ছেলেরা বলে বসতে পারে, ‘মাফ চাই, দোয়াও চাই। থাকুন আপনারা আপনাদের মতো। আমরা তাদের কাছেই ফিরে যাচ্ছি, সেই আকাবিরদের কাছে, যাদের কথা আপনারা বলেন’।

(নয়)

কওমি স্বীকৃতি আমাদের যুগান্তরের আশা প্রত্যাশা ছিল। শেখ হাসিনার মাধ্যমে সেটা বাস্তবায়িত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আমাদের বিন¤্র শ্রদ্ধা। কওমি প্রজন্ম হারানোর বেদনার সাথে এই প্রাপ্তির কথাও স্মরণ রাখবে। কওমি স্বীকৃতি আমাদের মৌলিক অধিকার ছিল। এটা কারো দয়ার দান ছিল না। কেউ সেটা দাবিও করেনি। তারপরেও যারা, একটিমাত্র টিকেট অথবা একটা কিছু সুবিধা আদায়ের জন্য দৃষ্টিকটু তেলবাজিটা করলেন, সেই আহলে ইলম পল্টিবাজদের প্রতি আমাদের বিনীত ধীক্কার।

(দশ)

আনন্দ বেদনার এই কাব্যিক সময়ে সান্ত¡নাও আছে। কওমি প্রজন্ম, যারা এতোদিন বিশ্বাস বিশ্বাসের কাঁচামাল ছিল, জাগতে শিখেছে। তাঁরা এখন সাদা এবং কালোর তফাত করতে শিখেছে। এখন তাঁরা কথা বলতেও শিখেছে। এই প্রথম তাঁরা বুঝতে পেরেছে চোখ-কান বন্ধ করে বড়দের আদেশ শুনেই ‘জি¦ আচ্ছা’ বলে যাওয়ার নাম আনুগত্য নয়। প্রকৃত আনুগত্য হচ্ছে কোনটা বড়দের কথা এবং কোনটা বড়দের নাম ভাঙানো কথা, সেটা খতিয়ে দেখা। তাঁরা বুঝতে শিখেছে বড়দের নাম ব্যবহার করে কেউ ধান্ধার ফন্দি করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলে বড়দেরকে চামচামুক্ত করার নাম প্রকৃত আনুগত্য। প্রজন্মের মাথা বিক্রি করে কেউ যদি তোয়াজের ডুগডুগি বাজাতে চায়, তাহলে তাদেরকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করার নাম প্রকৃত আনুগত্য। চেতনাটি বেঁচে থাকা দরকার।

সমাপ্ত

লেখক : বহু গ্রন্থপ্রণেতা ও বিশ্লেষক

প্রথম পর্ব পড়ুন

মন্তব্য করুন