সুন্দরবনের সৌন্দর্য্য

প্রকাশিত: ৮:২৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৮

সুন্দরবনে অসংখ্য প্রাণীর বসবাস রয়েছে। এখানে রয়েছে ৫ হাজার প্রজাতির সম্পূরক উদ্ভিদ, ১৯৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ১২৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫৭৯ প্রজাতির পাখি, ১২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ৩০ প্রজাতির চিংড়ি মাছ

 

বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি ‘সুন্দরবন’ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য প্রকৃতির এক অপরূপ দান। সবুজে ছাওয়া বনে পাখিদের কলকাকলিতে মুখর থাকে সারাক্ষণ। নাম না জানা হাজারো ফুলের সমারোহ ঘটে চিরসবুজ এ বনে। অসংখ্য নদীনালা ঘেরা বনটি আমাদের ঝড়ঝাপ্টা তো বটে, প্রাকৃতিক অনেক দুর্যোগ থেকেও রক্ষা করে। এখানকার জীববৈচিত্র্য এ বনকে দিয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য। বিস্তীর্ণ এ বনভূমি ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, রং-বেরঙের পাখি, চিত্রা হরিণ, কুমির ও সাপসহ নানা প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত এ বন। এছাড়াও বনটিতে বিখ্যাত সুন্দরী ও গোলপাতা গাছ পাওয়া যায়। বনের ভেতর মৌমাছির তৈরি মৌচাক থেকে প্রচুর মধু সংগ্রহ করা হয় প্রতিনিয়ত। এ বনকে ঘিরেই বহু মানুষের জীবন-জীবিকা চলছে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পেও সুন্দরবন এক অসাধারণ ভূমিকা রেখে চলেছে। নিম্নে সুন্দরবন সম্পর্কে কিছু তথ্য দেওয়া হলো।

নামকরণ : বাংলায় ‘সুন্দরবন’ এর আক্ষরিক অর্থ ‘সুন্দর জঙ্গল’ বা ‘সুন্দর বনভূমি’। সেখানে জন্মানো সুন্দরী গাছ থেকে সুন্দরবনের নামকরণ হয়ে থাকতে পারে বলে অনেকের ধারণা। অনেকে বলেন, এর নামকরণ হয়েছে ‘সমুদ্র বন’ (প্রাচীন আদিবাসী) থেকে। তবে সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় যে, সুন্দরী গাছ থেকেই সুন্দরবনের নামকরণ হয়েছে।

ভৌগোলিক গঠন : দুই প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ এবং ভারতের বিস্তৃত একালাজুড়ে সুন্দরবনের বিস্তার। বৃহত্তর অংশটি (৬২ শতাংশ) বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত। অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুন্দরবনের আয়তন বর্তমানের প্রায় দ্বিগুণ ছিল। বনের ওপর মানুষের ক্রমাগত চাপ ক্রমান্বয়ে এর আয়তন সংকুচিত করেছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে এর মোট ভূমির আয়তন ৪ হাজার ১৪৩ বর্গকিলোমিটার এবং নদী ও খালসহ বাকি জলধারার আয়তন ১ হাজার ৮৭৪ বর্গকিলোমিটার।

সুন্দরবনের উদ্ভিদ : সুন্দরবনের প্রধান বনজ বৈচিত্র্যের মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে সুন্দরী, গেওয়া, গরান এবং কেওড়া। ১৯০৩ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের হিসাব মতে, সর্বমোট ২৪৫টি শ্রেণি এবং ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে এখানে। একসময় সুন্দরবনে ফলদ বৃক্ষও প্রচুর ছিল। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় এ ফলদ বৃক্ষ কমে গেছে। বিশ্বে মোট ৪৮ প্রজাতির শ্বাসমূলীয় বৃক্ষ রয়েছে। যার ১৯ প্রজাতিই সুন্দরবনে দেখা যায়। এদের মধ্যে সবচেয়ে সেরা বা পরিণত বৃক্ষ হিসেবে সুন্দরীকে মনে করা হয়। সুন্দরবনের ১১ শতাংশ এলাকাজুড়েই রয়েছে এ সুন্দরীগাছ।

প্রাণিবৈচিত্র্য : সুন্দরবনে অসংখ্য প্রাণীর বসবাস রয়েছে। এখানে রয়েছে ৫ হাজার প্রজাতির সম্পূরক উদ্ভিদ, ১৯৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ১২৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫৭৯ প্রজাতির পাখি, ১২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ৩০ প্রজাতির চিংড়ি মাছ।

সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ। এর মধ্যে প্রতি বছর ১০ থেকে ১২ হাজার হরিণ শিকার করা হয়। আর নোনা পানির কুমির এখন শুধু সুন্দরবনেই দেখা যায়। বর্তমানে ১৫০ থেকে ২০০টি কুমির রয়েছে বনে। এ বন থেকে বছরে বনজীবীরা প্রায় দেড় হাজার টন কাঁকড়া সংগ্রহ করেন। তাছাড়া মোট চার প্রজাতির ৬ হাজার ডলফিনের দেখা পাওয়া যায় সুন্দরবনে। এর মধ্যে ইরাবতী প্রজাতির ডলফিন সবচেয়ে বেশি আছে সুন্দরবন এলাকায়।

শ্বাসমূলীয় বন : পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নদী হিমালয় থেকে সৃষ্টি হয়ে বঙ্গোপসাগরে এসে মিশেছে। বঙ্গোপসাগরের মোহনার নোনা পানি আর এ তিন নদীর মিষ্টি পানি মিলেমিশে একাকার হয়েছে। পানির সঙ্গে আসা পলি জমে যে বদ্বীপের সৃষ্টি, তাতেই সুন্দরবন গড়ে উঠেছে। এ ধরনের বন উপকূলর স্থিতিশীলতা রক্ষা করে, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস-উত্তাল তরঙ্গ ও জোয়ারভাটায় ভাঙন প্রতিরোধ করে। ম্যানগ্রোভ বনের উদ্ভিদের শ্বাসমূলের কারণে তা মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর কাছে এক আকর্ষণীয় আশ্রয়। তারা খাবার এবং শিকারি প্রাণীদের কাছ থেকে আত্মরক্ষার জন্য এ ধরনের বনে আশ্রয় নেয়। ছোট মাছ, শামুক, কাঁকড়া, চিংড়ি ও পাখির আবাস হিসেবে ম্যানগ্রোভ বন অনন্য। কার্বন শোষণের মাধ্যমে এ ধরনের বন বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে সহায়ক। তাছাড়া এরা প্রবাল ও ঘাসজাতীয় উদ্ভিদের আবাসের মতো আশপাশের বাস্তুসংস্থানে পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে।

ভোঁদড় : এ স্তন্যপায়ী প্রাণীটি এখন শুধু সুন্দরবনেই দেখা যায়। এর সংখ্যা কত তার কোনো হিসাব নেই।

রয়েল বেঙ্গল টাইগার : সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিশ্ববিখ্যাত একটি প্রাণী। ২০০৪ সালের এক প্রতিবেদন মতে, সুন্দরবন প্রায় ৫০০ রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাঘের আবাসস্থল, যা বাঘের একক বৃহত্তম অংশ। কিন্তু এ বাঘের সংখ্যা দিনকে-দিন আশঙ্কাজনক হারে কমে আসছে। ২০১১ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে সুন্দরবনে মোট বাঘের সংখ্যা প্রায় ৩০০। এদের সংরক্ষণের জন্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কমিটি নানা ধরনের কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও হ্রাসের হার বৃদ্ধিই পাচ্ছে দিন দিন।

মৎস্য সম্পদ : সুন্দরবনের সামগ্রিক মাছের ওপর পূর্বাপর কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়নি। ফলে মাছের বর্তমান অবস্থা, বিলুপ্ত মাছ, বিলুপ্তপ্রায় মাছের ওপর উপাত্তনির্ভর তথ্য পাওয়া যায় না। শুধু মানুষ যেসব মাছ খায় এবং যেসব মাছ রপ্তানি উপযোগী, সেসব মাছ চিহ্নিত করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, সুন্দরবনে শিরদাঁড়াওয়ালা মাছ রয়েছে প্রায় ৩০০ প্রজাতির।

আশির দশকে চিংড়ির পোনা ধরা শুরু হওয়ার পর মাছের প্রাচুর্য হঠাৎ কমে যায়। একসময় স্থানীয় জনসাধারণের প্রাণিজ প্রোটিন ৮০ শতাংশ মেটাত মাছ। এখন মাছ খাওয়ার সৌভাগ্য এলাকার খুব কম লোকের ভাগ্যে জোটে। সুন্দরবনে কালা হাঙর, ইলশা কামট, ঠুঁঁটি কামট, কানুয়া কামট পাওয়া যায়। আগে এদের খালিশপুর এলাকা পর্যন্ত পাওয়া যেত, এখন অনেক দক্ষিণে সরে গেছে। পশ্চিম সুন্দরবনে এদের উৎপাত বেশি। এরা সংখ্যায় অনেক কমে গেছে, বিশেষ করে কালা হাঙর প্রায় দেখাই যায় না। এছাড়াও অনেক ধরনের মাছ আছে, যাদের মধ্যে অধিকাংশই বিলুপ্তিপ্রায় অবস্থায়।

দুঃখজনক কথা হলো, আমাদের চির ঐতিহ্যের নিদর্শন সুন্দরবন আজ নানা কারণে তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। অথচ এ বনকে রক্ষা করতে না পারলে জলবায়ুর পরিবর্তনসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁঁকিতে থাকা বাংলাদেশকে আরও দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হবে। উজানে বাঁধ দেওয়ার ফলে সুন্দরবনে স্বাদুপানির অভাব, নদী-খাল মরে যাওয়ায় প্রতিবেশের অধঃপাত, জলোচ্ছ্বাসে বনের ভেতরে নোনাপানি প্রবেশ, বৃক্ষনিধনের ফলে আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া, অতিরিক্ত পর্যটকের আনাগোনা, শব্দদূষণ, বিসদৃশ রঙিন ও চকচকে অবকাঠামো এবং উজানের বর্জ্যও কম দায়ী নয়। এজন্য সুন্দরবন রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

মন্তব্য করুন