সন্ধে নামে কাশ্মী মে

প্রকাশিত: ৮:২৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৮

..আজ ভ্রমনের দ্বিতীয় দিন। শুয়ে আছি বরফে আবৃত এক জান্নাতের টুকরো রাজপ্রাসাদে। রিমঝিম করে তুষার পড়ছে আমার চারিপাশে। পাইন গাছের সবুজ পাপড়িগুলোর উপর জমাট হতে বসেছে একগাদা বরফ। আমি দরোজার ওপাশে, বিছানায় শুয়ে এদিকওদিক হচ্ছি বারবার। মাথায় কিলবিল করছে আমার, অনেক শব্দমালা। মন চাচ্ছে বাক্যের ফুলঝুরি আর সরলশান্ত শব্দের গাঁথুনির স্নিগ্ধতা দিয়ে মোহনিয় করে দিই পুরো পৃষ্ঠাটাকে। কিন্তু না; ভুরি ভুরি বিচিত্র আর যন্ত্রনাদগ্ধ অনুভূতি এবং আকাশস্পর্শী স্বপ্নের এভাবে মুহূর্তেই ইতি টানবো না। এসব ভাবতে ভাবতেই দোস্ত মারুফ ডাক দিলো। কিরে উঠবি না, বাইসারাম যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। চোখ মেলেই দেখি দরোজার সামনে গাড়ি রেডি। জিজ্ঞেস করলাম, এই গাড়িতে করেই যাবো নাকি? ওপাশ থেকে সাজ্জাদের বললো, আরে নাহ। ওখানে গাড়িতে করে আবার যাবা ক্যামনে। ঘোড়াতে চড়ে যেতে হবে। পাশ থেকে নাঈমের হাসিটা চরম লাগছিলো। ঘোড়াতে করে? এতো টাকা কই পাবো। বাইসারান (মিনি সুইজারল্যান্ড) ঘোড়াতে করে যেতে হলে পারপিস সবাইকে গুণতে হবে হাজার রুপি করে। দাদা রাশেদ; খুব চঞ্চল টাইপের। যার চঞ্চলাতা আমাদের ভ্রমনকে আরো দিগুণ আনন্দিত করছিলো সবসময়। বললো, আসছি এন্টারটেইনমেন্ট’র জন্য, পায়ে হেঁটেই যাবো। তাছাড়া বরফে হাটবো আর গপ্পোবাজি করবো সেটাওতো কম না। হুম, মারুফের এক ধমকেই সবাই বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। DSLR হাতে আসলাম ভাই খুব মজার মানুষ। অনবরত ক্লিক করতেই আছে। সঠিক পোজে ক্লিক হচ্ছে কি না, সেটা দেখার সময় নেই। আমরা পুরো কাফেলা এগুতে থাকলাম, স্বপ্নপুরির দিকে। দশ ফিটের রাস্তা পুরো ছ’ফিট গিলে ফেলছে বরফে। এভাবে মিনিট দশেক হাঁটার পর নজরে পড়লো

 

বরফে মোড়ানো পর্বতশৃঙ্গ এবং পাইন গাছের সবুজ ভ্যালিগুলো। দেখতে খুবই মনোরম। আগ থেকেই জানতাম, কাশ্মীরের পেহেলগাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, জলবায়ু, ক্যাম্পিংসহ বলিউডের মুভি দৃশ্যের শুটিংয়ের জন্য বিখ্যাত। আর এজন্যই বোধয় এখানে পর্যটকদের এতো ভীড়। তাছাড়া কাশ্মীর ভূস্বর্গ বলে কথা! যেখানে যেয়ে স্বয়ং মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর নাকি বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে যদি কোথাও স্বর্গ থাকে, তবে তা এখানেই আছে, এখানেই আছে এবং এখানেই আছে।’ এমন জায়গায় কে না যেতে চায়? আমাদের এ ভ্রমনেরও সবচেয়ে আকর্ষনীয় গন্তব্য ছিলো- পেহেলগাম। যেখানে একসাথে আছে- লিডার নদী, পেহেলগাম ভ্যালি, বেতাব ভ্যালি, আরু ভ্যালি, চন্দনওয়ারী, পেহেলগাম ভিউপয়েন্ট, মিনি সুইজারল্যান্ড খ্যাত বাইসারান, ধাবিয়ান, কাশ্মীর ভ্যালী ভিউপয়েন্ট, কানিমার্গ, ওয়াটারফল, তুলিয়ান ভ্যালী, মামলেশ্বর মন্দির, কোলাহাই হিমবাহ ইত্যাদি। প্রত্যেকটা স্থাপনায় ঘোড়া এবং পায়ে হেঁটে উভয়ভাবেই যাওয়া যায়। অবশ্যই এ ক্ষেত্রে গোড়ায় চড়লে একটু কষ্ট কম ও এডভেঞ্চার হয়। আমরা পায়ে হেটেই সামনে এগুতে থাকলাম। একে তো ঠাণ্ডা আবার বৃষ্টির বরফ গলা পানি জমে পাহাড়ের মাটি ও পাথুরে রাস্তায় কাদা তৈরী হয়ে পাহাড়ে আরোহন অসম্ভব হয়ে পড়ছে সবার। কনকনে শীতে সবাই হা হু করছে। এছাড়া পুরো পর্বত বেয়ে উপরে উঠতে ছিলো চরম ভয়ও। প্রতিটা পদে পদে ছিলো ভয়ের সাথে রোমাঞ্চকর এ্যাডভাঞ্চার; যা সারা জীবন মনে রাখার মত একটি জার্নি। সৃষ্টিকর্তার পরিচয় তার অপরূপ সৃষ্টিতে সেটা দেখতে হলে কাশ্মীর আপনাকে যেতেই হবে। আমরা পায়ে হাটলেও দল দল আরো বিদেশি পর্যটক ঘোড়াতে করে চূড়ায় যাছেন। আল্লাহ পাক এই পশুটিকে যে অসাধারণ ক্ষমতা প্রদান করেছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাদাকালো বিদেশি পর্যটকরা ঘোড়াতে করে এগুচ্ছে। আমরা বরফ ঠেলে পায়ে হেঁটে। ক্ষিধেয় তখন পেট আমাদের শাঁ শাঁ করছে। বাঙালি আমরা; ভুল করিনি। সাথে নিয়ে যাই কলা-রুটি। কিছুদূর যেতে না যেতেই দোস্ত হেলাল তার পুরো গা এলিয়ে দিলো বরফে। কথা একটাই তার, আর এক কদমও সামনে আগাবো না। কিছু খেতে দে আমায়। কি আর করা। সবাই এই ঠনঠনে বরফে গোলবেধে বসে পড়লাম লান্স করতে। আশপাশ’র সব পর্যটক আমাদের এমন ভাবসাব দেখে অবাক। আজীব তো! এরা কি তাইলে খেতে এসেছে। এদের খানা দেখে মনে হচ্ছে, কোনো অভিজাত রেস্টুরেন্টে বসে আছে। পিনপতন নীরবতা। চোখ রাঙিয়ে কলা আর ব্রেড মুখে দিচ্ছে। যাকগে, সামান্য লান্স করে একঢুগ পানি গিলে আবার উঠে দাঁড়ালাম আমরা। এখনো কিলোমিটার দু’য়েক বাকি। এদিকে মোবাইলে ডাটার টানাপোড়ন। কেউ ফেসবুকেও ঢুকতে পারছে না। ইচ্ছে থাকলেও কেউ লাইভেও আসতে পারছে না। আমাদের পেছনে ছিলো দুই চায়না ফ্রেন্ড। সম্ভবত তাদের সম্পর্ক বয়ফ্রেন্ড-গালফ্রেন্ড। তখনোও এটা জানতাম না। সামনে দু’চারকদম এগুতেই কথার ফাঁকেফাঁকে অমনটাই বুঝলাম। লোক দু’টো হিন্দি বিলকুল বুঝে না। তাই কারো সাথে বেশ গপ্পবাজি করতে পারছে না। কাশ্মীর গেলে হিন্দি জানাটা বেশ ভালো। কাশ্মীর বেড়ালে বুঝে আসে হিন্দি ভাষার কি ফজিলত। সবার সাথে শুরুতে ধাপ্পাবাজিটা আমিই বেশ নিয়েছিলাম। বলছিলাম- আরে যতো কিলোমিটার হোক না ক্যান আমি হেঁটেই পার হবো। এবার সর্বপ্রথম আমিই ত হয়ে গেলাম। পা আমার আর আগাচ্ছে না। কেডস ভেদ করে পায়ের মোজা অবধি আমার পানিতে ভিজে আছে। পুরো পা একদম ফ্রিজ হয়ে আছে। আমার অমন অবস্থা দেখে চায়না বন্ধুগুলো বেশ মজা নিচ্ছিলো। বোধয় মনে মনে বলছিলো- অনেক তো ভাব নিছিলা, এবার ঠেলা শামলাও। না এবার কষ্ট চাপা দিয়ে ফের উঠে দাঁড়ালাম আমি। আর মাত্র এক কিলোমিটার দূর মিনি সুইজারল্যান্ড; সেটা ভাবতে ভাবতে সে অবধি শেষতক পৌঁছেই গেলাম। হাজার হাজার পর্যটক। সবার অবস্থাই নাজুক। সবুজের মহীরুহ মিনি সুইজারল্যান্ড পুরোটা এখন বরফে সাদা। ভেলী গাছের পাতায় পাতায় জমে গাদাগাদা বরফ। পৌঁছে আমি প্রথমেই সোজা চলে গেলাম তাবু করে সাজিয়ে বসা চাউমিন দোকানে। ভারতে নোডলুসকে ওরা চাউমিন বলে। ভাল্লাগছিলো, চাউমিনের মূল্যটা মোটামুটি সাশ্রয়ী ছিলো। চার বন্ধু মিলে কোনোরকম তিনটে চাউমিন ভাগাভাগি করে ক্ষিধেটা কিছুটা নিবারণ করলাম। কিন্তু তখনো পা আমার পুরাই অবশ। ভ্রমনের স্বাদটা যেনো চলনেই শেষ হয়ে গেলো। আমি আর উঠে দাঁড়াতে পারলাম না। সবাই যে যার মতো সেলফি উঠাচ্ছে। স্কাউটিং করছে। বরফ মাখামাখি করছে। আমি নীরব দর্শক সেজে শুধু দেখছিই ওসব। এক বিদেশি বন্ধু বললো- ইদর আইয়ে। আওর আপকি মোজা তুড়াছা গরম করলি জিয়ে’ ভাবলাম, তাইতো, সেটাই করা যায়। শেষ অবধি মিনিট দিশেক আগুনে পা’টা রেখে বন্ধুদের পিড়াপীড়িতে দাঁড়ালাম। এবং আশপাশ কিছুটা ঘুরাঘুরি করে মিনি সুইজারল্যান্ড’র কিছুটা স্বাদ নিলাম। হুম। সত্যিই অসাধারণ স্পট। দেখলে তবে ফিরতে মন চায় না। কিন্তু বেলা এখন চারটে। আবার আমাদের হেঁটে হেঁটে নামতে হবে। আর কতক্ষণ? যাবার পালা। সে হিশেবে আগেভাগেই আবার যাত্রা শুরু করলাম। আমাদের ফেরা রুটিন ছিলো- আসতে আসতে সুন্দর সব লোকেশনে পিকচার উঠানো। শুরু হলো DSLRএর ক্লিক। সাথে বন্ধুদের দুষ্টুমি আর বরফ দিয়া একে অপরকে ডিল মারা। না এবার বেশ কষ্ট অনুভূত হলো না। দুষ্টুমি করতে করতে কোনসময় যে নিচে চলে এলাম, টেরই পেলাম না।

আলহামদুলিল্লাহ্‌! প্যাহেলগামের এই ভ্রমনটা বেশ ভালো লাগছিলো। চতুর্দিকে মুয়াজ্জিনের আজান। হোটেলে ফিরে আমাদেত নামাজ পড়তে হবে। এবং ডিনার করে দ্রুত শুয়ে পড়তে হবে। কাল আমরা যাবো শ্রীনগর এবং গোলমার্গ…

 

নাজমুল ইসলাম কাসিমী

সহ-সম্পাদক, পাবলিক ভয়েস  টোয়েন্টিফোর ডটকম

মন্তব্য করুন