মানবতা ডুকরে কাঁদে

প্রকাশিত: ৮:৩০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৮

রোদে পুড়ে দিন কাটে সেলিনার। শরীরজুড়ে তাই ঘামাচির ছড়াছড়ি। ফরমায়েশ খাটেন নিত্যদিন। দম ফেলার সময় নেই তার হাতে। একের পর এক ইট ভেঙে চলেন অবিরাম। রেলগেট সংলগ্ন জায়গায় পড়ে থাকে তার ভাঙা ইটের গুঁড়ার স্তূপ। দেখেই মনে হয়, কোথাও থেকে আমদানি করা এসব। পুরনো এ ইটগুলো ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জায়গা থেকে কুড়িয়ে আনা। এগুলো ভেঙেই সেলিনার মতো খেটে খাওয়া নারীদের পেট চলে। প্রতিদিনই এ জায়গায় দেখা যায় সেলিনা এবং তার দলকে। তবে আগের চেয়ে ইদানীং যেন সেলিনাকে বেশি কর্মব্যস্ত মনে হলো। কাছে গিয়ে জানতে পারি, সামনে মেয়ের পরীক্ষা। ‘সামনের বছর মাইয়ার জেএসসি হরীক্কা। ইস্কুলের ম্যাঠাম কইছে, ফরম ফিলাপে অনেক টেকা লাগবো। তাই আরামের ঘুম হারাম কইরা রাইত-দিন লাইগা আছি এইভাবে।’ গেঁয়ো ও মৃদুস্বরে এভাবেই জানান সেলিনা। আরও কয়েকজন নারীকে ইট ভাঙতে দেখতে পেলাম। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, তাদের কেউ রাতে রিকশার প্যাডেলে পা রাখেন, কেউ নগরীর বিভিন্ন স্কুলে আয়ার কাজ করেন, কেউবা আবার বাসা-বাড়িতে পার্টটাইমে বুয়ার কাজ করেন। বাড়তি আয়ের জন্য এখানে কাজ করেন। রেললাইন ধরে সোজা পশ্চিমে পা বাড়ালাম। দেখা গেল, উঠতি বয়সী বেশ ক’জন তরুণী। এদের কাজের ধরন একটু আলাদা। মধ্যবয়সী নারীরা যে ইটগুলো ভাঙেন, প্রধান সড়ক থেকে সেগুলো এনে দেওয়াই তাদের কাজ। প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় ওখানে ঘুরে ঘুরে কাটালাম। সেলিনার সঙ্গে শেষ দেখা করতে যখন এগিয়ে গেলাম, ঠিক তখন চোখ আটকে যায় একটি করুণ দৃশ্যে_ পা প্রায় কবরে, এমন বৃদ্ধবয়সী এক নারী রেললাইনের উত্তরপাড় থেকে দক্ষিণপাড়ের স্তূপে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ইটের খোয়া। খানিকটা সময় কাজ করে ঝিমিয়ে যেতে দেখা যায় তাকে। কিন্তু কাজে ফাঁকি দিতে পারলেন না একটু সময়ের জন্য। অমনি এক নারী পাশ থেকে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘কাজ করতে পাইরবা না তো এইহানে আইছো ক্যা! এইহানে কাম কইরা-ইতো খাইতে অইবো। এ্যামনে এ্যামনে গালে কেউ খাবার তুইল্যা দিবো না। বুঝলা? ঢঙ না কইরা ঝুড়ি লইয়া ওইপাড়ে যাও জলদি। নইলে টেকার মুখ দেখন লাগবো না।’একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পেটের তাড়নায় আবার লেগে যান কাজে। আগ্রহ জাগে তার সম্বন্ধে জানার। ‘কী আর কইমু! বুঝলা বাপ, আমার ভরা সংসার ছেলো। সবাই আমারে খুউব ভালা জানতো। সমস্যাডা শুরু অইলো ওইদিন থেইকা, যেদিন উনি কব্বরে গেলেন। দুই ছাওয়ালের সম্পত্তির দ্বন্দ্বে আমি হইলাম ঘরছাড়া।’ বলতে বলতে বৃদ্ধার সে কী কান্না! আকাশ ভারি হওয়ার উপক্রম। তবু তার সেই ছেলেদ্বয়ের হৃদয়ে হয়তো বা ক্ষণিকের জন্যও মায়ের কষ্টে রক্তক্ষরণ হয়নি। যার ফল জীবনের এই শেষ সময়েও বৃদ্ধার মাথায় একের পর এক ইটের ঝুড়ি। ‘মাইনষে কইতো_ আরে, এতো টেহা-পয়সা খরচা কইরা লেহাপড়া করাইয়া কী করবা! বড় অইয়া অরা তো তোমারে খাওয়াইবো না। শহরের বড়লোকের মাইয়া বিয়া কইরা তারে নিয়াই জীবন কাটাইবো। তোমার খোঁজও নিবো না। শ্যাষ পর্যন্ত তা-ই অইলো।’কষ্টে তার হৃদয় গুড়িয়ে যাচ্ছিল। মাথায় সান্ত্বনার হাত বুলিয়ে দু’চারটে বুলি আওড়ানোই আমার সামর্থ্য; তা-ই করলাম। হায়রে সমাজব্যবস্থা আর মানবতাবোধ আমাদের! একদল দু-মুঠো অন্নের খোঁজে এভাবে জীবনযাপন করবে; আরেক দল একের পর এক পাজেরো বদলে যানজট তৈরি করবে!

 

ফিচার সম্পাদক

পাবলিক ভয়েস টোয়েন্টিফোর ডটকম

মন্তব্য করুন